সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বৃহত্তর স্বার্থ ও মুসলমানদের ঐক্যের ভিত্তি

(পূর্বকথা : এই লেখার শিরোনাম হতে পারতো : "অমুকের মুখোশ উন্মোচন" কিংবা "শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব" অথবা "সিরিয়ার আসাদ-বিরোধীদের সমর্থন দেবো কি ?" কিন্তু তা না করে সেই পুরনো শিরোনামটাই দিলাম, যেটা টেবিলের সামনে কয়েক সপ্তাহ যাবৎ ঝুলছিলো। পরীক্ষা সামনে, কিন্তু হঠাৎই এই বিষয়ে লেখাটা জরুরী হয়ে পড়েছে।)

ভণিতা না করে আসল কথায় আসি। সেদিন "ফেসবুকে সুপরিচিত" একজন ইসলামপন্থী লেখক অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করে একটি লিঙ্ক শেয়ার দিলেন। সামহোয়্যারইনব্লগের একটি লেখা, শিরোনাম হলো "শিয়া মতবাদ : ইসলামের নামে ভয়ংকর বিশ্বাস ও মুনাফেকির বৃত্তান্ত।"
বিভক্তির বিষয় উপস্থাপন করাটা বৃহত্তর স্বার্থে ভালো হবে না, এই মূল বক্তব্যের একটি বড়সড় কমেন্ট পোস্ট করলাম। কিছুক্ষণ পরে লেখক আমার কমেন্টটা মুছে দিলেন। কমেন্ট মোছার কাজ নাস্তিক-শাহবাগিরা করে থাকে; সেই কাজ ইসলামপন্থী লেখককে করতে দেখে বিস্মিত হলাম। সেদিনই আবার একই বিষয়ে গুগল প্লাসে ইসলাম বিষয়ক কমিউনিটির একটি পোস্টে আমার মন্তব্যের প্রতি-উত্তরের জবাব দিতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, আমাকে ব্যান করা হয়েছে। তাই আলাদাভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করা এখন কর্তব্য।

একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু করি। পেঙ্গুইনস অব মাদাগাস্কার এর একটি মুভির দৃশ্য। জঙ্গলে ঘুরতে আসা একদল ট্যুরিস্টের জীপটি পেঙ্গুইনরা হাইজ্যাক করলে সবাই চিন্তিত হয়ে বিভিন্ন উপায় প্রস্তাব করতে থাকে। দলনেতা বুড়িটি হঠাৎই সবাইকে ছেড়ে গভীর জঙ্গলের দিকে যেতে শুরু করলো। তখন একজন নিষেধ করে বললো, আমাদের সবার একসাথে থাকা দরকার। "We need to stay together" -- তার বাক্যটা যতক্ষণে শেষ হয়, ততক্ষণে আর সবাই বুড়িকে অনুসরণ করে চলে গিয়েছে। আর ঐক্যের ডাক দেয়া লোকটি-ই সবচে' একা হয়ে পড়ে আছে। এখন আমি "বৃহত্তর স্বার্থ ও মুসলমানদের ঐক্যের ভিত্তি" নিয়ে লিখতে বসেছি, শেষে না আবার শিয়া-সুন্নি নিয়ে লিখে আমিই একা পড়ে যাই !

বর্তমানে ইসলাম নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তিদের মাঝে burning issue হলো সিরিয়ার প্রতি শিয়া অধ্যুষিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সমর্থন এবং তার বিপরীতে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রতি আমেরিকা, ইসরাইল ও তার বন্ধুদের প্রকাশ্য সমর্থন। সেইসাথে সউদি আরব, তুরস্ক, এই দেশগুলোও। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে : ইরান মুসলমানদের সাথে মুনাফেকি করছে, শিয়ারা কাফির, ইত্যাদি। কারো বা মতামত এর বিপরীত। আর কেউ কেউ দোদুল্যমান অবস্থায় আছে : ইরান কেনো এই কাজটি করছে ? বাশার আল আসাদ তো তার দেশের মুসলমানদের মারছে, সে তো স্বৈরশাসক, তার প্রতি ইসলামী রাষ্ট্র সমর্থন-সহযোগীতা দেয় কিভাবে ? কিন্তু এদিকে আবার সিরিয়ার বিদ্রোহীরা আমেরিকা-ইসরাইল ও তাদের বন্ধুদের সাহায্য গ্রহণ করছে। তাহলে তারা ইসলামের পক্ষে হয় কী করে ? ইত্যাদি। আমি সরাসরি কাউকে সিরিয়ার ইস্যুতে সমাধান দিয়ে দিচ্ছি না, কিংবা শত শত বছরের আলোচিত বহুল বিতর্কিত শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বেরও সমাধান করছি না। আমি কিছু তথ্য উপস্থাপন করবো; সিদ্ধান্ত নেবার কাজটি আপনাদের। যাহোক, ভূমিকা আর বড় করবো না। তবে প্রাসঙ্গিক আরেকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় মনে করছি।

দীর্ঘদিন ব্লগোস্ফিয়ারে থাকার কারণে সমমনা ব্লগারদের কারো কারো সাথে পরিচয় আছে, কিংবা হয়েছিলো। আমার প্রিয় একজন ব্লগারের সাথে দীর্ঘদিন বিরতির পর চ্যাটিং হচ্ছিলো গত কয়েকদিন যাবৎ। তো, কিভাবে যেনো হঠাৎই ইরানের কথা চলে এলো, আর পরপর কয়েকটা বাক্যে উনি বললেন : "আমি ইরানকে ভালোবাসতাম। খোমেনিকে ভালোবাসতাম। কিন্তু এখন ঘৃণা করি। সিরিয়ার আসাদকে ইরান সমর্থন দেয়ার পর থেকে আমি ইরানকে ঘৃণা করি। ইরানকে যারা সমর্থন দেয়, তাদেরকেও ঘৃণা করি। ঘৃণার চেইন।" চ্যাট হিস্ট্রি সেইভ না করলেও কথাটা আমার খুব মনে আছে। আমি শুধু বলেছিলাম, "আমি বুঝি না, যেই সিরিয়ার বিদ্রোহীদেরকে আমেরিকা-ইসরাইল প্রকাশ্যে সমর্থন-সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের দেশের মুসলমানেরা কী করে সেই বিদ্রোহীদেরকে সমর্থন জানায় !"
উত্তরে উনি লিখলেন : "বাহ, তোমার ইসলামিক জ্ঞান দেখে ভালো লাগলো। জাযাকাল্লাহ খাইর। আমি একটু উঠব। আল্লাহ হাফেজ।"
আমি ভেবেছিলাম সেদিনই উনার সাথে আমার কথা বলা শেষ। যাহোক, তার উদারতায় পরে আবার তার সাথে কথা হয়েছিলো, কিন্তু সে ভিন্ন গল্প।

সামহোয়্যারইনব্লগের সেই পোস্ট, গুগল প্লাসে যেই কমিউনিটিতে ব্যানড হলাম, সেখানের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও, এছাড়াও বিভিন্নভাবে শিয়া বিরোধী যেসব বক্তব্য জেনেছি, সেগুলো পয়েন্ট আকারে দিলাম।

১. শিয়া সম্প্রদায় মুসলমান, তবে তাদের মাঝে ভ্রান্তি আছে।
২. শিয়া সম্প্রদায় মুনাফিক, তারা মুসলমানদের ক্ষতি করছে।
৩. শিয়া সম্প্রদায় কাফির, সুতরাং মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করা যাবে না, এই কথা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
৪. শিয়া সম্প্রদায় মুশরিক, তারা আলী (রা.) কে স্রষ্টা মনে করে।
৫. শিয়া সম্প্রদায় মুসলমান নয়, তারা মুহাম্মাদ (সা.) কে শেষ নবী মানে না। তারা আলী (রা.) কে নবী এবং শেষ নবী মানে।
৬. তারা মনে করে ধর্মের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা জায়েজ।
৭. তারা সুন্নি মুসলমান এবং তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করাকে হালাল এবং কর্তব্য মনে করে।
৮. শিয়াদের নিজস্ব (গোপন) ধর্ম আছে, তারা সেটা পালন করে।
৯. তারা ইরাকে পনরো লাখ ও সিরিয়ায় এক লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছে।
১০. শিয়ারা দুনিয়ার বুকে ধ্বংস হয়ে যাবে (এবং আশার বাণী এই যে west অতি সত্ত্বর ইরানকে ধ্বংস করবে)।
১১. শিয়ারা নিজ মুখে কুফরী কথাবার্তা বলে থাকে (তাদের চ্যাট সাইটগুলোই দেখুন না !)।
১২. তারা আয়েশা (রা.) কে অ্যাবিউজ করে কথা বলে (এবং আয়েশা (রা.) কে অ্যাবিউজ করা হলো প্রকাশ্য কুফর)।
১৩. শিয়ারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও গণহত্যা চালাচ্ছে (যা এমনকি ইহুদী-খ্রিষ্টানদেরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে)।
১৪. শতাব্দীর পর শতাব্দী ইরানীরা প্রকাশ্যে বা গোপনে কাফির-মুশরিক-ইহুদী-নাসারাদের সাহায্য সহযোগীতা করেছে।
১৫. তারা অসংখ্যা জাল হাদিস তৈরী করেছে এবং প্রচার করেছে (এবং গাদিরে খুম নিয়ে তাদের তৈরী বিকৃত হাদিস হলো শিয়া মতবাদের মূল ভিত্তি)।
১৬. বারো ইমাম সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস হলো প্রকাশ্য শিরক ও কুফর।
১৭. তারা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী এর খোমেনিজম এ বিশ্বাস করে (এবং মনে করে যে ইমামগণ সকল ভুলের উর্ধ্বে এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল বিষয়ের জ্ঞান তাদের আছে)।
১৮. তারা কোরআনকে বিকৃত করেছে। কোরআনের নামে তারা ১১৪টি সূরার পর আরো দুটি সূরা প্রচার করে। তবে তা তাদের নিজেদের ভিতরে একান্তই গোপনে (আত-তাকিয়াহ নামক গোপন বিশ্বাসের কারণে)।
১৯. তারা সবসময় মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে হাত মিলিয়েছে, এবং এখনও তা বিদ্যমান আছে। ইরানের উপর আজকে বাহ্যিকভাবে আর্থিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, অথচ তাদের সামান্য ক্ষতিও হয়নি (অথচ ইরাক বা আফগানিস্তানের উপর এমন অবরোধে সে দেশগুলোর কেমন দশা হয়েছিলো তা কারো অজানা নয়)।
২০. শিয়াদের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছে অসংখ্য শিরক ও বিদআত (আশুরা, মিলাদ-মাহফিল, আখেরী চাহার সোম্বা, ইত্যাদি বিদআত তাদের মাধ্যমে এসেছে)।
২১. তারা কেউ কেউ দিনে দুই বার বা তিনবার সালাত আদায় করে। কেউবা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত একত্রে আদায় করে। তারা নামাজে হাত বাঁধে না এবং মেঝেতে সেজদা না দিয়ে কারবালা বা নাজাফের এক টুকরা মাটিতে সেজদা করে।
২২. এই ইরানিরাই হলো হাদিসে বর্ণিত সেই দাজ্জাল।

এবং আরো অনেক, অনেক কিছু। উপরের ২২ টা পয়েন্টের যুক্তিখণ্ডন করে আমি এখন ২২ দুগুনে কমপক্ষে ৪৪ টি পয়েন্ট উপস্থাপন করতে পারি, not necessary যে তাদের সবগুলোকেই সত্য হতে হবে। আপনারা শুধু বসে বসে পড়ে যাবেন আর বিনোদনের মত যুক্তি-পাল্টা-যুক্তির উপস্থাপনা দেখবেন। বিতর্ক দেখতে কার না ভালো লাগে ! সেইসাথে নিজে জ্ঞান-গবেষণা না করেই যদি নিজের মতের পক্ষে আর অন্যজনের বিপক্ষে অনেকগুলো যুক্তি শিখে নেয়া যায়, তাহলে আর কী লাগে !

যাহোক, সেই পোস্ট/কমেন্টগুলোর উত্তরে যা বলেছিলাম, তার পুনরাবৃত্তি করছি। আশা করি কেবল বিতর্ক উপভোগ না করে শেষের কথাগুলোও পড়বেন। যে মানুষটির ঐকান্তিক ইচ্ছা হলো আমেরিকার হাতে ইরান ধ্বংস হবে, তার মন্তব্যের উত্তরে মোটামুটি এগুলো বলেছিলাম (বিষয়গুলো মোটামুটিভাবে সিরিয়া ইস্যুতেও প্রযোজ্য):

১. অমুসলিমদের (অর্থাৎ শিয়া) বিরুদ্ধে আপনার (তথাকথিত) যুদ্ধে আপনি ইসলামবিরোধী শক্তির সাহায্য পেতে চান ?  How come a Muslim take help from anti-Islamic forces in the cause of Islam ?
২. ইসলামের যুদ্ধ আইনে সিভিলিয়ানদের হত্যা করা নিষিদ্ধ। আমেরিকা, ইসরাইল ও তাদের বন্ধুরা ইরানে আক্রমণ করলে তারা কি সিভিলিয়ান নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুদের হত্যা করবে না ?
৩. ইসলামি আইনসমূহ কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যই প্রযোজ্য। প্রথমত, অমুসলিম কিংবা মুনাফিকদের হত্যা করাটা ইসলামের কাজ নয়, বরং মুসলমানের দায়িত্ব হলো সকলের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। তারপরও, যদি এটাই ইসলামি আইন হতো যে গণহারে কাফির-মুনাফিকদের হত্যা করতে হবে, সেক্ষেত্রেও সেই আইন ইসলামী শাসনের অধীন ভূখণ্ডের বাইরে প্রয়োগ করা যাবে না। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে, আমেরিকা যদি ইরানে আক্রমণ করে, তবে --
প্রথমত আমেরিকা ইসলামি রাষ্ট্র নয় যে কাফির-মুনাফিককে হত্যা করা তাদের দায়িত্ব (যদি ইসলামি আইন তেমনই হয়ে থাকতো), আর যদিওবা আমেরিকা ইসলামি রাষ্ট্র হতো, তারা নিজ ভূখণ্ডের বাইরে সেই আইন প্রয়োগ করতে পারবে না।
৪. কোরআন মানুষকে শিয়া-সুন্নি কিংবা অন্য কোনো গোত্রে বিভক্ত করে নাই, সুতরাং আমি নিজেকে মুসলমান হিসেবে ঘোষণা করি, শিয়া কিংবা সুন্নি হিসেবে নয়।
৫. ইরানের সংবিধান কিংবা জনগণ, কেউ-ই ঘোষণা করে না যে আলী (রা.)-ই হলে God; বরং প্রতিদিন আযানে তারা লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বলে ঘোষণা করে।
৬. প্রথমত, ইরানের জনগণ বলে না যে আলী (রা.)-ই হলেন God। আর যদি কিছু মানুষ এমনটা বলেও থাকে (সে শিয়া, সুন্নি কিংবা অন্য যেকোনো গোত্র থেকেই হোক না কেনো), তবুও ইসলাম তাদেরকে হত্যা করতে অনুমতি দেয় না। খ্রিষ্টানরা বলে থাকে যে ঈসা (আ.)-ই হলেন God, কিন্তু তাই বলে ইসলাম আমাদের এই অনুমতি দেয় না যে এই কারণে আমরা খ্রিষ্টানদের হত্যা করতে পারবো।
৭. আপনি যদি (আপনার মতে) বিশুদ্ধ মুসলিম ছাড়া আর সবাইকে হত্যা করেন, তাহলে কার কাছে আপনি ইসলামের দাওয়াত দেবেন, আর কাকে সংশোধন করবেন ?
৮. কেউ যদি বলে যে আলী (রা.) হলেন God, তবে আমি তার সাথে God এর কনসেপ্ট নিয়ে আলোচনা করতে রাজি আছি। কিন্তু আমি তাকে হত্যা করতে চাই না।
৯. আশা করি বিভিন্ন রেফারেন্স হিসেবে কোরআনকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং সেখান থেকে যুক্তি প্রদান করবেন।

আর "ফেসবুকে সুপরিচিত" ইসলামপন্থী ব্যক্তিটির পোস্টে যা বলেছিলাম, তার সাথে আরো কিছু বক্তব্য যুক্ত করে সামহোয়্যারইনব্লগের সেই পোস্টটিরও জবাব দিয়ে যাই :

ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে এজাতীয় বিভক্তির বিষয় প্রচার না করাই ভালো। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি মুসলমান হবার প্রাথমিক শর্ত পূরণ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে মুসলমান হিসেবে গণ্য করা কর্তব্য; এমনকি যদি সে কেবল মুখে মুসলমান আর অন্তরে মুনাফিক হয়, তবুও।

ইরানকে আমেরিকার বন্ধু ভাবতে হলে যথেষ্ট কল্পনাবিলাসী হতে হয় বৈকি !

মুসলিম বিশ্বে বৃটিশ গুপ্তচর হ্যামফারের স্মৃতিকথায় ব্রিটেনের ইসলামবিরোধী মহাপরিকল্পনার যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ইরানকে বৃটেন-আমেরিকা-ইসরাঈলের বন্ধু মনে করলে গোটা দুনিয়ার সকল কিছুকেই বৃহৎ কন্সপিরেসি থিয়োরীর অংশ মনে করতে হবে। হ্যামফারের স্মৃতিকথা থেকে কিছু বিষয় হলো :

১. ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিষ্টান মিশনারী পাঠিয়েছিল, যা এখনও টিকে আছে। এছাড়াও ইহুদী, যরথুস্ত্রী ও হিন্দুদের মধ্য থেকে বন্ধু তৈরী করে ইসলামের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোও তাদের মহাপরিকল্পনার অংশ ছিলো, এবং এখনও তা বজায় আছে।
২. ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করা তাদের মহাপরিকল্পনার অংশ ছিলো, যার আংশিক সফলতা তারা লাভ করেছে ইসলামের নামে বিভিন্ন বিকৃত ধর্ম ও মাযহাব তৈরী করে। ভারত উপমহাদেশে কাদিয়ানী ধর্ম, ইরানে বাহাই ধর্ম, আরব উপদ্বীপে ওহাবী মতবাদ, এগুলোর মাধ্যমে তারা শুরু করেছিলো ইসলাম বিকৃতির মহাযজ্ঞ।
৩. মুসলমানদের ভাষা বদলে দেয়া, আন্তর্জাতিক ভাষাকে ফার্সী হতে অন্য কোনো ভাষায় পরিবর্তন, এবং মুসলমানের সন্তান যেনো আরবী শিক্ষা করতে না পারে, তার ব্যবস্থা তারা করেছিলো।
৪. আরবী-ফার্সি-তুর্কি ভাষায় দক্ষ বৃটিশ গুপ্তচর হ্যামফার ১৭১০ সালে মুসলমান সেজে ইস্তাম্বুলে গমন করেন এবং সেখানে আরবী-ফার্সি ইত্যাদি ভাষায় ইসলামের উপর কোরআনসহ প্রচুর অধ্যয়ন করেন শুধুমাত্র ইসলামকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যে। অবশেষে বৃটিশ পরিকল্পনায় তার মাধ্যমে আবদুল ওয়াহাব নজদীর প্রতিষ্ঠিত ওহাবী মতবাদের প্রবর্তন হয়, যারা তাদের নিজেদের ব্যতীত শিয়া এবং সুন্নিদেরকে কাফির বলে গন্য করত। (খেয়াল রাখুন, আমাদের দেশে অনেকে এখন শিয়াদেরকে কাফির বলে আখ্যা দিচ্ছে।)
৫. সেসময় সউদি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হয় বৃটিশ মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে যা আমাদের অনেকেরই অজানা। সেই সউদি রাজবংশই আজ মক্কা-মদিনার জিম্মাদার, এবং তারা সৌদি আরবকে নিয়ন্ত্রণ করে। (খেয়াল রাখুন, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সহায়তা দিচ্ছে সউদি আরব, এবং কিছুদিন আগে প্রকাশ পেয়েছে যে তারা ইয়েমেনে ২০১১-১২ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় আমেরিকাকে প্রচুর যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে। আরো নোট রাখুন, উইকিলিকস যখন প্রথম আলোড়ন তুললো, তখন প্রকাশ পেয়েছিলো সউদী সরকারের পক্ষ থেকে আমেরিকা সরকারে কাছে পাঠানো এই তারবার্তাটি : "সাপের (ইরানের) মাথা কেটে ফেলাই ভালো।" স্মরণ করুন, আমেরিকা-ইরানের অনুরূপ কোনো তারবার্তা প্রকাশ পেয়েছিলো কি ?)
৬. সেসময় (১৭০০ সালের দিকে) ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ছিলো না, বরং সেখানে অনিসলামী অত্যাচারী শাহ এর রাজতন্ত্র চালু ছিলো। সেসময়ের ইরানের শাহকে (আমার মন্তব্য : এবং সর্বশেষ শাহ পর্যন্ত) নারী দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়েছিলো, যেটা কিনা তাদের পরিকল্পনা ও আদেশগুলোতে বলা ছিলো : "প্রয়োজনে নারীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে এবং দেশের স্বার্থে সমকামিতার মত নিষিদ্ধ কাজও করা যাবে।" তৎকালীন শাহ এর সাথে (আমার মন্তব্য : এবং সর্বশেষ শাহ পর্যন্ত) তাদের চুক্তি ছিলো, কিন্তু তবুও তারা ভীত ছিলো। এবং তারা শিয়া মুসলমানদের ধার্মিক দৃঢ়তার ব্যাপারে সবচে' বেশি ভীত ছিলো। (হ্যামফারে স্মৃতিকথা পড়ুন, এবং নোট রাখুন, এটা মোটামুটি তিনশত বছর আগের কথা)
৮. হ্যামফারের ভাষায় :
"আমরা মুসলিম জ্ঞানী-গুণী, মনীষী ও আলেমগণের কারণে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। কারণ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমগণ এবং ইরাক ও ইরানের আলেমগণ আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাসিলের পথে বিরাট বাধা ছিলেন। কারণ তারা আধুনিক জীবনধারা সম্পর্কে সামান্যতম খবরও রাখতেন না এবং কোরআন তাদের জন্য যে বেহেশতের অঙ্গীকার করেছে, তারা তাকেই তাদের লক্ষ্যস্থলে পরিণত করেছে এবং তা থেকে একচুল নড়তেও প্রস্তুত না।" (লক্ষ্য করুন, শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল মুসলিম মুজতাহিদের সম্পর্কে তারা এমন চিন্তা পোষণ করত, যদিও তারা ইরানের শাহকে কব্জা করেছিলো এবং অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করেছিলো।)
"অন্যদিকে জনগণও তাদের অনুসারী ছিলো। এমনকি শাহ পর্যন্ত বিড়ালের সামনে ইঁদুরের ন্যায় তাদেরকে ভয় করত।"
৯. (হ্যামফারে স্মৃতিকথায় উঠে আসা বৃটিশ মহাপরিকল্পনার সাথে বর্তমান বিশ্বের তুলনা করে একটি লেখা ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা আছে, তবে --) সুন্নি মুসলমানদের তুলনায় শিয়াদের তারা নিজেদের জন্য বেশি হুমকি মনে করত, এমনকি শিয়া-সুন্নি যে বিভেদের বিষয়গুলো ছিলো, শুধুমাত্র সেই বিভেদের বিষয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানদেরকে দুর্বল করার উপর তারা আস্থা রাখতে পারছিলো না।
১০. হ্যামফার : "একবার আমি উপনিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্যের বিষয় তুলে ধরলাম। বললাম, "মুসলমানরা যদি তাদের এ অনৈক্যের পরিণাম বুঝতে পারতো তাহলে এ বিরোধ পরিহার করতো এবং ঐক্যের দিকে ফিরতো।" এতে সেই কর্মকর্তা ভীষন রাগতঃস্বরে আমাকে বললেন : "তোমার দায়িত্ব হচ্ছে মুসলমানদের কৃষ্টিকে ভেঙে ফেলা এবং তাদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করা, তাদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করা নয়।" "
১১. হ্যামফারের স্মৃতিকথা থেকে উল্লেখ শুরু করলে আলাদা একটা ব্লগ হয়ে যাবে, তাই এখানেই থামলাম। তবে ইরান (এবং একইসাথে শিয়া), ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস, ইত্যাদি সম্পর্কে দুয়েকটা বিষয় বলবো।
ইরানের সর্বশেষ রাজা রেজা শাহ পাহলভী ছিলেন অত্যন্ত অত্যাচারী (খেয়াল রাখুন, এই শাহদের সাথেই বৃটিশ সরকারের যোগসাজশ ছিলো, কিন্তু আলেমদের সাথে নয়। আলেমদের ব্যাপারে তারা ভীত ছিলো)। ত্রিশ বছর আগের ইরান আর এই ইরান এক ছিলো না। প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রডাক্ট ইমপোর্ট করতো তারা, ডাক্তার-এঞ্জিনিয়ার - কিছুই ছিলো না। সেসময়ে বাংলাদেশ থেকেও অনেকে ইরানে গিয়েছিলেন, বিশেষতঃ ডাক্তার ফ্যামিলিগুলোতে খুঁজলে পাবেন। ত্রিশ বছর পর বর্তমান ইরানের কথা সবারই জানা। তারা এখন ড্রোন বিমান তৈরী করছে, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বসিয়েছে। এই বিপ্লব হয়েছিলো ইরানের আলেমদের দ্বারা। বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন, কোনো মীরজাফর বা মুনাফিকই তার অপকর্মের বিনিময়ে সাদামাটা জীবন গ্রহণ করে না। তাদের কাছে দুনিয়ার জীবনটাই প্রধান, এবং সেজন্যে অবশ্যই তারা বিলাসী জীবন যাপন করবে। যাহোক, ইরানের এই আলেমদের উপর তৎকালীন শাহ প্রচণ্ড অত্যাচার-নির্যাতন চালায়, জীবন্ত অবস্থায় গায়ের চামড়া তুলে ফেলা, লবণ হ্রদে ডুবিয়ে মারা, মিছিলে ব্রাশ ফায়ার করা -- এগুলো কিছু উদাহরণ।
১২. ইরানে বিপ্লব হবার সময়েই সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের নেতৃত্বে একদল ছাত্র গিয়ে আমেরিকান দুতাবাস ঘেরাও করে। সাথে সাথে দূতাবাসের কর্মচারীরা নিজেদের সমস্ত ডকুমেন্টস পুড়িয়ে দিতে শুরু করে। তারপরও অনেক ডকুমেন্ট উদ্ধার করা হয়। দুতাবাসের কর্মচারীদের উদ্ধার করার জন্য আমেরিকা কমান্ডো হেলিকপ্টার পাঠায়, যা তাবাস মরুভূমিতে মরু ঝড়ের কবলে পড়ে ধ্বংস হয় (যেটাকে ইরানিরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য বলে থাকে)। পরবর্তীতে সেই উদ্ধারকৃত ডকুমেন্টস "মার্কিন ষড়যন্ত্রের দলীল" শিরোনামে ইরানি মিডিয়া থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়। (নোট করুন, আমাদের দেশে আমেরিকান এম্ব্যাসি, অ্যাম্ব্যাসাডর, ভারতীয় হাইকমিশন, হাইকমিশনার -- এদের activities, span and scope অনেকেরই জানা আছে নিশ্চয়।)
১৩. আহমাদিনেজাদের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হবার সময় যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিলো, সেটার কথা মনে আছে ? তখন রাস্তায় কিছু টি-শার্ট-জিন্স পরা মেয়ে এবং ছেলেরা মিছিল করেছিলো। তারা সবাই ছিলো ইন্টারনেট ইউজার এলিট ক্লাসের সদস্য। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি করলে একটা মেয়ে মারা যায়, যা নিয়ে সেইসময়ে অনেক ইসলামপন্থী তেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, যেমন প্রতিক্রিয়া এখন সিরিয়া ইস্যুতে অনেকে দেখাচ্ছিলেন। (ভালোভাবে না জেনেই আহমাদিনেজাদ ও ইরানকে ভালোবাসা, আবার প্রকৃত বিষয় না জেনেই তাদেরকে ঘৃণা করা।)
১৪. গত বছরেই সম্ভবত ইরানের সীমান্তে আমেরিকান ড্রোন আটক করলো ইরান।
১৫. ইরানের উপর কয়েক দফা অবরোধ আরোপ করেছে আমেরিকা। (ইরানের মুদ্রাস্ফীতি প্রচুর)
১৬. ইরানের সাথে ইরাকের দীর্ঘ প্রক্সি যুদ্ধের (আমেরিকার হয়ে) ইতিহাস খেয়াল আছে ?

পাঠকের উদ্দেশ্যে : উপরে আমি যা বললাম, তা থেকে ইরান ও শিয়াদের সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা আপনার ব্যাপার। ("থামুন ! সিরিয়া ইস্যু ক্লিয়ার না হওয়ার আগে ইরান ও শিয়াদের সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না !" তবে --) সিদ্ধান্ত নেবার আগে একবার চিন্তা করে দেখুন, প্রথমে শিয়া বিরোধী যে ব্ক্তব্যগুলো পয়েন্ট আকারে দিলাম, তার-ই বা সত্যাসত্য বিচার করবেন কিভাবে, আর আমি শিয়া ও ইরান সম্পর্কে যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করলাম, সেগুলো যে সত্য, তা-ই বা বুঝবেন কিভাবে ? সেগুলো ভেরিফাই করেই কি সিদ্ধান্ত নেবেন, নাকি আগে শিয়া ও ইরান সম্পর্কে যে (অন্ধ) ঘৃণা ছিলো, সেটার পরিবর্তে মনকে এখন তাদের প্রতি (অন্ধ) ভালোবাসায় পূর্ণ করবেন ? কেবল "ফেসবুকে সুপরিচিত" ইসলামপন্থী লেখকের উপর আস্থা আছে বলেই কি আপনি মুসলমানদের একটা বৃহৎ গোষ্ঠীকে কাফির আখ্যা দেবেন ? নাকি বিপরীতে অখ্যাত এই আমার উপর আস্থা আছে বলেই যাচাই-বাছাই না করে তাদেরকে খাঁটি মুসলমান ঘোষণা করবেন ? অন্ধ বিশ্বাস তো সর্বদাই ঠুনকো। তা সে সত্যের পক্ষেই হোক কি মিথ্যার পক্ষেই হোক।

সমস্যা হলো, আমরা বেশিরভাগই পূর্ব-নির্ধারিত মাইন্ডসেট নিয়ে এসে বিতর্ক দেখতে চাই, যেভাবে করে দেখি ক্রিকেট খেলা। ইসলামের ব্যাপারগুলো তো ঐরকম না।

সিরিয়া ইস্যুতে আমার বলার বিষয় খুব কম, কারণ আমি নিজেই তেমন কিছু জানি না। কেবল অল্প কিছু তথ্য উল্লেখ করবো।

১. বিবিসি একবার ছবি প্রকাশ করেছিলো এই ক্যাপশনে যে বাশার আল আসাদ শত শত শিশুকে হত্যা করেছে। পরে আবিষ্কার হলো সেটা ইরাক যুদ্ধের ছবি। ছবির ফোটোগ্রাফার যখন ব্যক্তিগত ব্লগে সেটা ক্লেইম করলেন, তখন প্রথম আলোর গুরু বিবিসি সেটাকে নিরবে সরিয়ে নিলো।
২. বাশার আল আসাদ নিশ্চিতভাবেই ইসলামপন্থী ব্যক্তি নন এবং সিরিয়ায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। বরং দীর্ঘদিন যাবৎ ক্ষমতা দখল করে আছেন।
৩. বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে যে গ্রুপগুলো যুদ্ধ করছে দুই বছর যাবৎ, তাদের মাঝে কেবল একটি গ্রুপ খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছে, যদিও তারা সেই খিলাফাহ এর সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও উপস্থাপন করেনি। এই গ্রুপসহ আসাদ বিরোধী সকল গ্রুপই সহায়তা নিয়ে আসছে ইসলামবিরোধী শক্তির কাছ থেকে, অর্থাৎ, আমেরিকা, ইসরাইল এবং তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো থেকে। এই পোস্টের শুরুর দিকে লিখেছিলাম, How come a Muslim take help from anti-Islamic forces in the cause of Islam ? ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই যদি এই বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে সেই একই প্রশ্নটা আবার রেখে গেলাম।
৪. ইসরাইল ও আমেরিকা ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু। তাদেরকে সহায়তা করছে সউদি আরব, তুরস্ক এবং আরো কিছু আরব দেশ। এখন তাদের সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করবেন কি ? নাকি আগের মতই (অন্ধ) আবেগে সউদি ভূমিতে জন্মালে বেহেশত নিশ্চিত -- এজাতীয় বিশ্বাসে থাকবেন ? (সেইসাথে হ্যামফারের ডায়রি থেকে খেয়াল করুন বর্তমান সউদি রাজবংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।)

শেষকথা : আর বেশি কিছু বলবো না। এবার সিরিয়া ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্ত আদৌ নেবেন কিনা, এবং সেই সূত্রে ইরান ও শিয়াদের সম্পর্কে নিজের মতামতকে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিচার করবেন কিনা, তা আপনাদের বিবেচনা। একটা ব্যাপার হলো, রাজনীতি অনেক জটিল বিষয়। আর সারা পৃথিবীর সব মানুষ এবং দেশও এত সহজ সমীকরণে চলে না যে "আমি শতভাগ খাঁটি ইসলামপন্থী" আর "আমি শতভাগ খাঁটি ইসলামবিরোধী"। এই বাংলাদেশে বসেই আমরা ইসলামবিরোধী যেসব কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছি, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলো সেই তথ্য "মিডিয়ার" কল্যাণে (!) কিভাবে পাচ্ছে, তা জানা আছে ? (প্রাসঙ্গিক : হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত ব্যবচ্ছেদ করেছিলাম আমার ব্লগে।) এই দেশে বসেই এখনও অনেক মানুষ ৫ই মে'র গণহত্যা সম্পর্কে বেখবর,  এবং এখনও অনেকে নিজেকে মুসলমান দাবী করছে, আবার মুসলমান হওয়ার সাথে আওয়ামী লীগ ও শাহবাগকে সমর্থনের মাঝে কোনো সাংঘর্ষিক কিছু দেখছে না। সিরিয়া সম্পর্কে প্রকৃত সত্য আমরা কতটুকু জানি ? আর সিরিয়া-ইরান-সউদি-মিশর-আমেরিকা-ইসরাইল-ব্রিটেন-রাশিয়া-তুরস্ক মিলে যে জটিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমীকরণ সেখানে চলছে, তার কতটা আমরা জানি ? আমি কেবল এতটুকু বলতে পারবো যে সেখানকার সমীকরণ বাংলা ছবির "নিষ্পাপ নায়ক" আর "পাপী ভিলেন" এর মত এত সহজ না। বরং বিশ্বের সবচে' বড় রাজনৈতিক সমীকরণ সেখানে খেলা করে চলছে।

আর ইসলাম প্রসঙ্গে বলবো, ইসলাম হলো একটা প্রকাণ্ড বৃক্ষের মত। আমরা তার ডালপালা-শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করছি এবং তাই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে আছি। অথচ আমাদেরকে শুরু করতে হবে গোড়া থেকে। অবস্থা যেনো এমন না হয় যে মুসলমানের বাচ্চা ছিলাম তাই না জেনেই মুসলমান, আবার সেই ইসলামকে ত্যাগ করে নাস্তিক হলাম তা-ও না জেনেই। আমরা অনেকেই জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মে এমনভাবে অন্ধ বিশ্বাস সহকারে আঁকড়ে ধরেছি যে, তার মাঝে যুক্তির কোনোই স্থান নেই, গোটা বিষয়টাই dogmatic belief।

শিয়া-সুন্নি নিয়ে তুমুল বিতর্ককারী ব্যক্তিদেরকে এই মৌলিক প্রশ্নটি করুন : Does God exist ? হ্যাঁ, আমাদেরকে শুরু করতে হবে ওখান থেকেই। আমার এই কথাটাকে খুবই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যেই আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান আছে। ইসলামের ইস্যুতে খেলার মত করে বিতর্ক উপভোগের অভ্যাস বাদ দিয়ে আলোচনা ও জ্ঞানার্জনের দিকে ঝুঁকতে হবে। আর শুরু করতে হবে গোড়া থেকে, আগা থেকে নয়। অসংখ্যা "আগাবাদী" মুসলমান ইসলাম থেকে ঝরে গিয়েছে এই মূল প্রশ্নে : Does God exist ?

আবারো বলছি, আমার কথাটাকে খুবই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, কিন্তু এর মাঝেই আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান ছড়িয়ে আছে।

আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।


নূরে আলম
জুন ১৮, ২০১৩।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…