সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাঁশেরকেল্লা, ফেইক ছবি আর তথ্য-প্রমাণের দৌড়

পেইজ : বাঁশেরকেল্লা। লাইক সংখ্যা : আড়াই লাখ। পাঠকগোষ্ঠী : ইসলামপন্থী, সরকারবিরোধী, শাহবাগ-বিরোধী।
পেইজ : শাহবাগে সাইবার যুদ্ধ। লাইক সংখ্যা : এক লাখ। পাঠকগোষ্ঠী : উপরের বিপরীত।

বাঁশেরকেল্লা পেইজ কেনো ৫ই মে'র গণহত্যার নামে কয়েকটা ফেইক ছবি পাবলিশ করলো, তাই নিয়ে গালিগালাজ করে দেশ উদ্ধার করছে তারা। অথচ সেই একই বাঁশেরকেল্লায় প্রকাশিত গণহত্যার অন্যান্য ছবি যেনো তারা দেখতেই পায় না !

দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, আমার দেশ পত্রিকা -- বর্তমান সরকার ইসলামপন্থী মিডিয়াগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সঠিক তথ্য জানার জন্য তাই প্রায়ই বাঁশেরকেল্লা পেইজে ঢোকা হয়। অথেনটিক নিউজ পাবলিশ করার ক্ষেত্রে তাদের চেষ্টার ত্রুটি নাই। এবং না জেনে ভুল নিউজ / ছবি পাবলিশ করার পর সেটার প্রমাণ পেলে বা বুঝতে পারলে তাদেরকে পোস্ট রিমুভ করতে দেখেছি। ৫ই মে'র গণহত্যার পর শাহবাগীদের পেইজে তাদের বক্তব্য/গালিগালাজগুলো দেখলাম, পড়লাম। প্রাসঙ্গিক কিছু কথা এখানে লিখে রেখে যাই :

প্রসঙ্গ : ভেরিফাইড সোর্স

বাঁশেরকেল্লা পেইজ কোনো নিউজ পাবলিশ করলে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে - সোর্স দেখান। অর্থাৎ, স্বয়ং বাঁশেরকেল্লা পেইজ নিউজ সোর্স নয়। কিন্তু বাঁশেরকেল্লা যদি সোর্স হিসেবে আমার দেশ পত্রিকাকে দেখিয়ে দেয়, তখন ইসলামপন্থীরা সন্তুষ্ট। অথবা যদি প্রথম আলোকে দেখিয়ে দেয়, তখন শাহবাগীদের মুখ বন্ধ। প্রশ্ন হচ্ছে, সোর্স কতটুকু ভেরিফাইড ? প্রথম আলো যে নিউজ পাবলিশ করলো কিংবা আমার দেশ, সেটা আসলেই সত্য কি ? আমি প্রথম আলোর কোনো নিউজকেই বিশ্বাস করি না, যদিনা অন্য কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে ভেরিফাই করা যায়। আবার, আমার দেশ এর নিউজকে ডিফল্টভাবে বিশ্বাস করি, যদি না অসত্য হবার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই আস্থা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। তিনবার ব্যান হবার পরও বাঁশেরকেল্লা পেইজের আড়াই লাখ লাইক এর পিছনে এটা একটা কারণ -- মানুষ এর উপর আস্থা রাখে। Deliberately মিথ্যা নিউজ পাবলিশ করলে এই আস্থা তারা অর্জন করতে পারতো না।

একটা পত্রিকা যখন নিউজ পাবলিশ করে, তখন তারা বিভিন্ন সংবাদদাতার উপর ভিত্তি করে। আমি নিজে দেখেছি যে বাস্তব ঘটনা ঘটেছে এক রকম, কিন্তু জেলা সংবাদদাতা রিপোর্টে লিখেছে একটু বেশি। ৪-৬ রাউন্ড গুলি হয়ে গিয়েছে ৮ রাউন্ড। এখানে যে সত্য বিকৃত হয়ে গেলো, মূল পত্রিকা অফিস কিন্তু তা জানলো না। এবং আস্থার ভিত্তিতেই পত্রিকার অসংখ্য পাঠক বিকৃত তথ্য জানলো। এমনটা প্রথম আলোর ক্ষেত্রেও হতে পারে, হতে পারে আমার দেশ পত্রিকার ক্ষেত্রেও। কোনো পাঠকই পত্রিকার রিপোর্ট পড়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে নিজে অনুসন্ধান করে আসে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আস্থা রাখে, এবং বিশ্বাস করে। কোনো ভিডিওচিত্র না থাকা সত্ত্বেও আমার দেশ এর রিপোর্ট অনুযায়ী আমি বিশ্বাস করে নিয়েছি যে মাহমুদুর রহমানে ১৭ মিনিটের অভিযানে কমান্ডো স্টাইলে গ্রেফতার করা হয়েছে। আবার, কেবলমাত্র প্রথম আলো পত্রিকার উপর আস্থা থাকার কারণে "জামাত-শিবির কর্তৃক ২০ হাজার গাছ নিধন" এর রিপোর্টটিকেও অনেকে সত্য বলে মেনে নেয়, অথচ তারা ২০ হাজার গাছ নিধনের ভিডিও দেখেনি, এবং ভিডিওতে যারা গাছ কাটছে তাদের গায়ে যেহেতু শিবির লেখা ছিলো না, সুতরাং তাদের চেহারা দেখে সেই চেহারা সার্চ করে শিবিরে তালিকার সাথে মিলিয়েও দেখেনি, তবুও বিশ্বাস করছে এবং প্রচার করে বেড়াচ্ছে। (প্রশ্ন : এই আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তি কী হওয়া উচিত ? এটা নিয়ে শেষে লিখবো)
বাঁশেরকেল্লা পেইজে ফ্যানরা যেসব নিউজ / লেখা পোস্ট করে, মাঝে মাঝে সেগুলোও তারা নির্বাচন করে পোস্ট করে দেয়। এক্ষেত্রে ঐ ফ্যানকে খুঁজে বের করে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়। যখন নিচে দেখি "ফ্যান পোস্ট", তখন সেটার বিশ্বাসযোগ্যতার লেভেল, আর পেইজের অ্যাডমিনের করা পোস্টের বিশ্বাসযোগ্যতার লেভেল সমান নয়।

আবার, রিপোর্টার হয়তো সৎভাবেই রিপোর্ট করেছে, কিন্তু সে সঠিক তথ্য পায় নাই। এমনটা ঘটেছে যে দুই বন্ধু, একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং একজন বিএনপি; পরস্পর বান্ধবী (বা অন্য কিছু) নিয়ে ঝগড়া করেছে, এবং লীগার ছেলেটি তার নিজের বন্ধুকে খুন করেছে। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনই সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। রিপোর্টার গেলো, আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলো। লোকজন আসল কারণ জানতো না, তবে তারা বললো যে একজন লীগ করতো, এবং আরেকজন বিএনপি করতো। ব্যস, ওমনি ঢাকায় রিপোর্ট চলে গেলো : ওমুক এলাকায় লীগকর্মীর হাতে বিএনপির কর্মী খুন। পরদিন নিউজ পাবলিশও হয়ে গেলো !

প্রশ্ন হলো, শাহবাগীরাই কদ্দুর সত্যতা যাচাই করে, আর ইসলামপন্থীরাই বা কদ্দুর করে ? (বেশিরভাগই আবেগের বশে মোটামুটি চোখ বন্ধ করে পোস্ট শেয়ার করে।) (আরেকটা প্রশ্ন রেখে যাই : যারা "যুদ্ধাপরাধীদের" ফাঁসি দাবী করছে, তারাই বা কদ্দুর ভেরিফাই করেছে, আর যারা তাদেরকে নির্দোষ বলছে, তারাই বা কদ্দুর ভেরিফাই করেছে ?)

প্রসঙ্গ : পক্ষপাতদুষ্ট মানবতা / বাকস্বাধীনতা / অধিকার

বিষয়গুলোকে পাশাপাশি লিখলে বুঝতে সুবিধা হবে। আমাদের সংবিধান কোরআনের আইন মেনে চলে না। কিন্তু বাংলাদেশী হিসেবে থাকতে হলে এই সংবিধানকে মেনে নিতে হবে। আবার, মুসলমান হিসেবে থাকতে হলে কোরআনের আইন মেনে চলতে হবে। এই দুটি সাংঘর্ষিক বিষয়ের সমাধানের চেষ্টা ক'জন করে ? একজন মুসলমানকে অবশ্যই আর সবকিছুর চেয়ে ইসলামকে প্রাধান্য দিতে হবে। যাহোক, সাম্প্রতিক শাহবাগ ইস্যু, ৫ই মে'র গণহত্যা, আস্তিক-নাস্তিক, ইত্যাদি বিভিন্ন ইস্যুতে কতগুলো জিনিস পাশাপাশি তুলে ধরছি। কোরআনের দৃষ্টিতে এবং বাংলাদেশের সংবিধানের দৃষ্টিতেও বিচার করুন :

১. শাহবাগ তিন মাস অবরুদ্ধ করে রেখে গণজাগরণ মঞ্চের গান-বাজনা চললো। এতে হাসপাতালগামীদের অসুবিধা হলো না।
কিন্তু -- হেফাজতে ইসলামকে ২৪ ঘন্টাও মতিঝিলে অবস্থান করতে দেয়া হলো না। কারণ এতে ব্যবসায়ের অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। (এমনকি আইন করে মতিঝিলে সভা-সমাবেশ বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে)।
২. শাহবাগীদের সরকার তিন-চার স্তরের পুলিশী নিরাপত্তা দিলো।
কিন্তু -- হেফাজতে ইসলামের কর্মীদেরকে হাজার হাজার পুলিশ-RAB-বিজিবি দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হলো।
৩. শাহবাগে চব্বিশ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিরিয়ানি, ভ্রাম্যমান টয়লেটের সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিন্তু -- গণহত্যা চালানোর জন্য রাতেই মতিঝিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হলো।
৪. শাহবাগের নাচ-গান-বেলুন উত্তোলন দিন-রাত ২৪ ঘন্টা লাইভ দেখিয়েছে এটিএন, চ্যানেল আই, সময় টিভি, একাত্তর টিভিসহ আরো অসংখ্য টিভি।
কিন্তু -- মতিঝিলের লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ লাইভ দেখাতে এই টিভিগুলোকে দেখা গেলো না।
কিন্তু পুলিশের "হেফাজত খেদানো নাটক" ভিডিও করার সময় গভীর রাতে এই টিভিগুলো সেখানে উপস্থিত।
এবং দিগন্ত ও ইসলামিক টিভিকে গভীর রাতে নির্বাহী আদেশে বন্ধ করে দেয়া হলো।
৫. "অপারেশান ফ্লাস শাপলা চত্বরে" কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, দাবী সরকারের।
কিন্তু -- ফেসবুকে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক লাশের ছবি প্রকাশ পেয়েছে, এবং লাশের সংখ্যা ৩ নাকি ৩ হাজার, তাই নিয়ে শাহবাগীরা তর্ক করছে।
৬. শাহবাগীদের বক্তব্য : ২৫০০ মানুষ মারা গিয়েছে বললেই হলো ? সাভারে কয়েকশ' মানুষ মারা গেলো, তাদের আত্মীয় স্বজনরা এসে কান্নাকাটি করলো, নিখোঁজদের ছবি দেখালো মিডিয়ায়, তাহলে এই হেফাজত কর্মীদেরও তেমন করার কথা। কই, কেউ তো আসে নাই ? ২৫০০ লোক মারা হয়েছে, ট্রাকে করে গুম করা হয়েছে, প্রমান কোথায় ? ভিডিও কই ?
তাহলে -- ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষকে শহীদ করা হয়েছে, তার প্রমাণ কই ? ভিডিও কই ? ৩০ লক্ষ কেনো, ৩০ হাজার কিংবা ৩ হাজারের নাম, এলাকার নাম, আত্মীয়-স্বজনের নাম, ছবি - ইত্যাদি প্রোফাইল কই ? এইটার জন্য ভিডিও প্রমাণ না চাইলে ঐটার জন্যও চাওয়া উচিত না।
৭. একজন মানুষ বিশ্বজিতকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে, সেজন্য মানবতার বাণী মুখে লেগেই থাকলো।
কিন্তু -- জামাত-শিবিরের ১৫০+ মানুষকে হত্যা করা হলো, এমনকি গায়ে ঠেকিয়ে গুলি করার দৃশ্য পর্যন্ত দেখা গেলো, ২৮শে অক্টোবর ২০০৬ এ লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ খুন করার ভিডিও পর্যন্ত এরা দেখলো, কিন্তু তখন মানবতার বুলি নাই। নিহত হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের লাশের ছবি দেখেও মানবতার বাণী নাই।
৮. ছাত্রী সংস্থার ২১ জন মেয়েকে পুলিশ গ্রেফতার করলো, একজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলো, আদালতে তাকে লিফট না দিয়ে সিঁড়ি দিয়েই হাঁটিয়ে তোলা হলো। নারী অধিকার কর্মীরা নিশ্চুপ।
কিন্তু -- লংমার্চ শেষে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা ফেরার পথে এক নারী সাংবাদিক আক্রান্ত হলে (যদিও হেফাজতের হাতে হয় নাই) তাই নিয়ে হেফাজতের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নারী অধিকারের বুলিতে মুখে ফেনা উঠে গেলো।
(তবে বিএনপির মহিলা নেত্রীকে গাড়ি থেকে ফেলে দিলে তখন কিছু হয় না, এবং কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি যখন এক মহিলা সাংবাদিকের হাত মুচড়ে দেন, তখনও নারী অধিকার লঙ্ঘিত হয় না।)
৯. কোরআনের আইন বাস্তবায়ন করতে ১৩ দফা উত্থাপন করেছে হেফাজতে ইসলাম, কিন্তু এতে নাকি দেশ পিছিয়ে যাবে, এটা নাকি বর্বরদের আইন, ইত্যাদি।
কিন্তু -- সেই কোরআন যখন মতিঝিলে পুড়লো (যদিও হেফাজত কর্মীরা পুড়িয়েছে এমন প্রমাণ নাই), তখন প্রথম আলোসহ শাহবাগীদের কোরআনের জন্য দরদ উথলে উঠলো।
১০. ১৫০+ মানুষকে হত্যা করা হলো ফেব্রুয়ারি-মার্চে, তা নিয়ে সিরিজ অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করলো আমার দেশ।
তবে -- "২০ হাজার গাছ নিধন করেছে জামাত শিবির" এই রিপোর্ট পাবলিশ করলো প্রথম আলো। (গাছাধিকারকর্মী।)
১১. হেফাজতে ইসলাম ইট-পাটকেল ছুঁড়েছে পুলিশের দিকে, এটা হলো "তাণ্ডব"।
কিন্তু -- টিয়ার সেল, রাবার বুলেট, সিসার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান, পিপার স্প্রে, রায়টকার, ইত্যাদি দিয়ে পুলিশ হেফাজত কর্মীদের "আদর" করেছে।
১২. আগুন জ্বালানো, গাড়ি-ভাঙচুর, গাছ-নিধন, কোরআন পোড়ানো (!) এগুলো কোন ধরণের ইসলাম ?
কিন্তু -- নাস্তিক রাজীব হায়দারকে শহীদ ঘোষণা করা, শাহবাগে তার জানাজা পড়া, এগুলো খাঁটি (শাহবাগি) ইসলাম।
১৩. যুবলীগ নেতা শহীদ মিনার ভাঙচুর করলে হয় পাগল।
তবে -- মুসলমানরা সিলেটে মূর্তি স্থাপনের বিরোধীতা করলে হয় স্বাধীনতাবিরোধী, প্রগতিবিরোধী, ইত্যাদি।
১৪. সোনার বাংলাদেশ ব্লগ, ফেসবুক পেইজ বাঁশেরকেল্লা, আমার দেশ পত্রিকা, ইত্যাদি বন্ধ করলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হয় না।
কিন্তু -- নাস্তিক ব্লগ বন্ধ করলে সেটা হয় মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ।
১৫. ইসলামপন্থী লেখালেখি করার জন্য ফারাবিকে গ্রেফতার করলে বাকস্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ হয় না। সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করলে ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যহত হয় না। সংবিধান তাদেরকে এসব অধিকার দেয় নাই।
কিন্তু -- আল্লাহ-রাসূলকে নিয়ে কটুক্তি করার কারণে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত নাস্তিক ব্লগারকে গ্রেফতার করা হলে Muzzle Me Not, ব্লগিং আমাদের অধিকার, ইত্যাদি ফেইসবুক ব্যানার দিতে হয়, প্রেস কনফারেন্স করতে হয়, বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের উল্লেখ হয়।

..................................
(তালিকা আমি কিছুটা করলাম, বাকিটা (unlimited) আপনারা করেন, মূল ব্লগে যোগ করে দেবো।)
..................................

যাহোক, মানুষের আস্থা কিসের ভিত্তিতে হওয়া উচিত ? যারা "যুদ্ধাপরাধীদের" ফাঁসি দাবী করছে, তারাই বা কদ্দুর ভেরিফাই করেছে, আর যারা তাদেরকে নির্দোষ বলছে, তারাই বা কদ্দুর ভেরিফাই করেছে ? বেশিরভাগই তো আস্থার উপর ভিত্তি করে কথা বলছে। এত যে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ এর পক্ষে বা বিপক্ষে, ক'জনের ঐসময় জন্ম হয়েছিলো, আর ক'জনের কাছে সত্যিকারের তথ্য-প্রমাণ আছে ? শুধু আস্থার উপর ভিত্তি করেই একজনের ফাঁসি চাওয়া কি উচিত ? তবে সেই আস্থার ভিত্তি কী হওয়া উচিত ?

প্রসঙ্গ : আস্থার ভিত্তি

আর সমস্ত বিষয় বাদ দিয়ে আস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত তাক্বওয়া এবং পরহেজগারী। যে ব্যক্তি যত বেশি দ্বীনদার, তাঁর উপর আস্থা তত বেশি হওয়া উচিত।
একজন প্রতারক যখন নিজেও জানে যে সে নিজে প্রতারক এবং তার বন্ধুটিও প্রতারক, তখন সে হয়তো "চোরে চোরে মাসতুতো ভাই" এই হিসাবে আস্থা রাখে বন্ধুর উপর, কিন্তু বন্ধু সুযোগ পেলে "চোরের উপর বাটপারি" করতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রথম আলো পত্রিকার নিউজকে বিশ্বাস করি না, unless আমি অন্য সূত্রে ভেরিফাই করতে পারছি। কারণ আমি জানি যে তারা সত্যকে বিকৃত করে এবং মিথ্যা লেখে। আবার, আমি আমার দেশ পত্রিকার সকল নিউজই বিশ্বাস করি / আস্থা রাখি, unless নিউজ পড়ে আমার কাছে কোনো গরমিল পরিদৃষ্ট হয়, এবং তখন আমি সেটাকে বিভিন্ন সূত্রে ভেরিফাই করি।

বাবা-মা'র উপর সবার-ই আস্থা থাকে। বর্তমান বাংলাদেশের ২০-২৫ বছর বয়সী সকল তরুণ-তরুণীর কথা বিবেচনা করি। এদের মাঝে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়া মেয়েটি হয়তো বাবা-মা'র এই কথায় আস্থা রাখবে না : "তুমি তোমার বন্ধুকে নিয়েই বাড়ি আসো, চিন্তা কোরো না, বিয়ে দিয়ে দেবো।" মেয়েটি হয়তো ভাববে, বাবা-মা মিথ্যা বলছে, সে বাড়ি গেলেই তাকে ঘরে আটকে রাখবে। কিন্তু এই বাবা মা-ই যখন "সাঈদী অসংখ্য খুন-ধর্ষন করেছে" একথা বলে, সেই মেয়েই কিন্তু এই বাবার-মা'র উপরেই আস্থা রাখে। বাংলাদেশের ২০-২৫ বছর বয়সী সকল তরুণ তরুণী এইভাবে বাবা-মা কিংবা আরো কিছু আস্থাভাজন ব্যক্তির উপর আস্থার ভিত্তিতে দুইভাগে ভাগ হয়েছে (মোটামুটিভাবে)। একভাগ বলছে যে সাঈদী যুদ্ধাপরাধী, আরেকভাগ অস্বীকার করছে, আরেকভাগ বলছে তারা নিশ্চিত না (এদের সংখ্যা খুবই কম)।

যেখানে একজনের জীবন-মরণ প্রশ্ন, সেখানে এমন আস্থার উপর ভিত্তি করে একা কথাকে বিশ্বাস করা উচিত না (unless আস্থা গড়ে উঠেছে ব্যক্তির পরহেজগারী দেখে)। সেখানে শতভাগ তথ্য-প্রমাণ নিজের কথা হাজির করা উচিত। (বেশিরভাগ) সিরিয়াস অ্যাকিউজেশানের ক্ষেত্রে (আস্থার উপর ভিত্তি না করে কেবল তথ্য-প্রমাণ, কিংবা পরহেজগার ব্যক্তির উপর আস্থা এবং --) তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই একটি বিষয়কে বিশ্বাস করা উচিত এবং সত্য বলে প্রচার করা উচিত।

এখন, এতক্ষণ যা বললাম, তা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এর সাথে যে কেউ-ই দ্বিমত হতে পারে। কেউ হয়তো বলবে : আমি (অন্ধভাবে) আমার বাবার কথাই বিশ্বাস করবো। (আমি একজনকে বলতে শুনেছিলাম : আমার বাবা আর শেখ মুজিবের নামে আমি কোনো কথা শুনতে রাজি না।) কিংবা, আমি প্রথম আলোর কথাই বিশ্বাস করবো। সে যাকগে।

তাহলে, এমন সব আলোচনার ক্ষেত্রে, আলোচনার একটি কমন গ্রাউন্ড থাকা দরকার, যার উপর আলোচকদের সবার-ই আস্থা আছে। মুসলমান মাত্রেই কোরআনের উপর এইভাবে আস্থা রাখে। সুতরাং, এটা একটা কমন গ্রাউন্ড হতে পারে। আমরা পরস্পরের বক্তব্য / তথ্য-প্রমাণ / আস্থার ভিত্তির যোগ্যতাকে সেই কমন গ্রাউন্ডের সাথে তুলনা করে দেখতে পারি।

কোরআন কিন্তু বলেছে সিরিয়াস অ্যাকিউজেশানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ হাজির করতে, এবং innocent until proven guilty এই নীতি প্রদান করেছে। এবং "আমি শুনেছি" -- অর্থাৎ, শোনা কথার উপর ভিত্তি করে কথা না বলতে এবং সেই শোনা কথা প্রচার করে না বেড়াতে। (চাইলে রেফারেন্স দেবো।)

...........................................
শেষকথা : ৫ই মে, ২০১৩তে বিনা বিচারে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সংখ্যা ২৫ হোক আর ২৫ শত হোক, গণহত্যা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য আলেম এবং কোরআনের হাফেজকে। কোনো মুসলমান এই গণহত্যার পক্ষ নিতে পারে না।

নূরে আলম
মে ৯, ২০১৩।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগ এবং আহমেদ দিদাতের ইরান অভিজ্ঞতা

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।)
আহমেদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫) এর নাম হয়তো অনেকের অজানা থাকবে। তবে ডা. জাকির নায়েকের নাম নিশ্চয়ই অজানা নয়। ডা. জাকির নায়েকের বর্তমান কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা হলেন আহমেদ দিদাত। আহমেদ দিদাত, যিনি কিনা ডা. জাকির নায়েকের নাম দিয়েছিলেন "দিদাত প্লাস" – পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়ানো এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেকচার দেয়া ছিলো তাঁর কাজ। যাহোক, ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ইসলামী ইরানের জন্ম হয়। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ভিজিট করেন আহমেদ দিদাত, সাক্ষাৎ করেন ইমাম খোমেইনীর সাথে এবং নিজদেশে ফিরে এসে ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তাঁর অনুভূতি তুলে ধরেন। আহমেদ দিদাতের নানা বিষয়ে বক্তব্য ও চিন্তাভাবনা বাংলা ভাষায় কিছু না কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু শিয়া-সুন্নি ঐক্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর চমৎকার বক্তব্যের অনুবাদ কোথাও না পেয়ে সবার সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই অনুবাদ করে ফেললাম। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। মূল অডিও কোথাও কোথাও শুনতে বা বুঝতে অসুবিধা হয়। কোথাওবা অডিও নিঃশব…