সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঘেটুপুত্র কমলা : হুমায়ুন আহমেদের শেষ কর্ম



হাওরে পানি এলে তিন মাস জমিদারের কোনো কাজ থাকে না। এই কর্মহীন সময়ে আমোদ ফূর্তি করার জন্য জমিদার সাহেব ঘেটুগানের দল ভাড়া করে আনে। ঘেটুগানের দলে কমবয়েসী সুন্দর ছেলে থাকে। এই ছেলে মেয়ে সেজে নাচ-গান করে এবং জমিদারের ইচ্ছানুযায়ী তার সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হয়। এজাতীয় ছেলেদেরকে ঘেটুপুত্র বলা হতো। মুভির ঘেটুপুত্রের নাম কমলা। টাকার অভাবে সে এই কাজে আসে। ঘেটু দলে তার বাবাও থাকে, সে হলো দলের অধিকারী। বেশ ক'দিন জমিদারকে আনন্দ দেবার পর একদিন জমিদারে স্ত্রীর হিংসার শিকার হয়ে কমলার অপমৃত্যু ঘটে : কাজের মহিলা টাকার বিনিময়ে কমলাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে।

হুমায়ন আহমেদের শেষ কর্ম হলো এই "ঘেটুপুত্র কমলা” নামক মুভি। মুভির মূল বিষয় সমকামিতা (homosexuality)। ইতোমধ্যেই এটা বেশ আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। ঈদের দিনে প্রচারিত হয়েছিলো টিভিতে, সেই ভার্সন দেখলাম গতকাল।

হুমায়ুন আহমেদের কথা-কর্ম নিয়ে কখনো সেভাবে লেখার প্রয়োজন বোধ করি নাই, কিন্তু মুভিটা দেখা হয়ে যাওয়ায় লেখার প্রয়োজন বোধ করছি। কেউ হয়তো দেখেছেন, কেউ হয়তো দেখেন নি, কেউ হয়তো শুধু পত্র-পত্রিকা কিংবা ব্লগে রিভিউ পড়েছেন। আমিও এখন লিখতে বসলাম। অবশ্য আমার এই লেখাও হয়তো গতানুগতিক রিভিউ এর দলে পড়ে যাবে। সে যাহোক।

সেন্সর বোর্ড মুভিটাকে "বাচ্চাদের উপযোগী” করে টিভিতে ছেড়েছে। সমকামিতা যেখানে মূল বিষয়, সেই মুভি কাট-ছাঁটের পরও কী করে বাচ্চাদের উপযোগী থাকে, সেটা চিন্তার বিষয়। একটা বাচ্চা যখন তার বাবা কিংবা মাকে প্রশ্ন করবে : "আচ্ছা, ছেলেটার গায়ে ব্যথা থাকে কেনো ? ও কাঁদে কেনো ?” তখন সেই বাপ-মা কী জবাব দেবে ? যাহোক, আসল কথায় আসি।

মুভিটা দেখার পর সামগ্রিক যে অনুভুতি জাগে, সেটা হলো সিমপ্যাথি।
দারিদ্রের কারণে কিভাবে একটা ছোট ছেলে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, এবং শেষটায় এসে তার করুণ মৃত্যু ঘটে – এই সবই দর্শকের মনে করুণা না জাগিয়ে পারে না। বাড়ি থেকে দূরে এসে যে মনোদৈহিক অত্যাচারের শিকার হয় কমলা, তা যে কারো মনে দয়ার উদ্রেক করবে। জমিদার বাড়িতে সকলের দুর্ব্যবহার, সকলের ঘৃণার পাত্র হবার মনোকষ্ট, এরই মাঝে বাড়ির ছোট মেয়েটির সাথে ক্ষণস্থায়ী বন্ধুত্বের মুহুর্তগুলো, স্মৃতিচারণে ছোটবোনের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা, বৃষ্টিতে ভেজা, বাড়ি ছেড়ে আসবার সময়ে মায়ের মুখ, ঘুমঘোরে মায়ের ডাক... সবশেষে হিংসার শিকার হয়ে করুণ অপমৃত্যু বরণ করা – খুব স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটার প্রতি দর্শকের দয়া-মায়া, সিমপ্যাথি তৈরী হবে। এই সিমপ্যাথির সুদূর প্রসারী প্রভাব আছে।

এই মুভিতে সমকামিতা দেখানো হয়েছে বয়স্ক লোক ও নাবালক ছেলের মাঝে। এখানে ছেলেটা অসহায়, এবং কোনো বিচারেই তাকে অপকর্মের শাস্তি দেয়া যায় না। তার প্রতি সিমপ্যাথিও অনুচিত কিছু নয়। কিন্তু ভবিষ্যতে শাস্তির যোগ্য ব্যক্তিদের সমকামিতা নিয়ে মুভি হলে, এবং সেখানেও নায়ককে করুণ করে উপস্থাপন করা হলে মানুষের মাঝে যে তার প্রতি সিমপ্যাথি জাগবে না, তা বলা যায় না। বরং এই মুভিতে একটা ইমপ্লিসিট সিমপ্যাথি তৈরী হয়ে যায় "সমকামীদের" প্রতি। এবং এই ইমপ্লিসিট সিমপ্যাথি ভবিষ্যতে যেকোনো সমকামিতার মুভির প্রতি দর্শকের দৃষ্টিকে একপেশে করে দেবে, যেটা বিশেষত তরুণ ছেলেপেলেদের সামগ্রিক মানসিকতার জন্য ক্ষতিকর। হুমায়ুন আহমেদ অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোক, সে তার audience সম্পর্কে খুব ভালো করে জানে, এবং মূল উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে সব লেভেলের দর্শকের জন্যই সে উপাদান রেখেছে।

লক্ষ্য করে দেখুন, এই মুভির সামগ্রিক অনুভুতিটা কী ? সামগ্রিক অনুভুতিটা কি সমকামিতার প্রতি ঘৃণা, না অসহায় কমলার প্রতি মায়া, সিমপ্যাথি ?
মুভি দেখা শেষে কি কেউ সমকামিতার বিরুদ্ধে তীব্র কথা বলবে, কেউ কি বলবে ইসলাম ধর্মে সমকামিতা নিষিদ্ধ, কেউ কি বলবে যে সমকামী লোকদের (এক্ষেত্রে জমিদারের) শাস্তি হওয়া উচিত ? না। কেউ তা বলবে না। বরং মুভি শেষে বেশিরভাগ মানুষ সহানুভুতি মনে নিয়ে বের হবে (এবং হলগুলোতে হয়েছেও তাই)। কার জন্যে সিমপ্যাথি ? সমকামিতার শিকার এক ছেলের প্রতি সিমপ্যাথি। (যদিও ছেলেটি পরিস্থিতির শিকার, এবং কোনো বিচারেই তাকে দোষ দেওয়া যায় না।) এবং এই সিমপ্যাথি ভবিষ্যতে সামগ্রিকভাবে সমকামিতা রিলেটেড যেকোনো ব্যক্তির জন্য কাজে লাগবে। সেটা অসহায় ব্যক্তির ক্ষেত্রেই হোক, আর স্বেচ্ছায় সমকামী হওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রেই হোক। খুব ভালো করে খেয়াল করুন। হুমায়ুন আহমেদের মুভির মূল মেসেজ কিন্তু সমকামিতার বিরোধিতা নয়, বরং সমকামিতার শিকার বালকের প্রতি সহানুভুতি।

এবার বিভিন্ন চরিত্রের প্রসঙ্গে আসি।
গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো হলো জমিদার (চৌধুরি সাহেব), কমলা (ঘেটুপুত্র, আসল নাম জহির), আর্টিস্ট (জমিদারের ছবি আঁকে), মওলানা সাহেব (হুজুর)। প্রতিটা চরিত্রকে আলাদাভাবে দেখুন, মূল মেসেজটা কী দাঁড়ায়।

জমিদার :
জমিদার অনেক বিত্তশালী লোক। সে কর্মহীন তিনমাস সময়ে ভোগের জন্য ঘেটুদলকে ভাড়া করে আনে। আবার চিত্রশিল্পীকেও নিয়ে আসে। আর্টিস্ট তার ছবি এঁকে দেয়। আবার তার বাড়িতে হুজুরও (মওলানা সাহেব) থাকে। ঘেটুপুত্রের সাথে এক বাড়িতে থাকতে না চাইলে স্ত্রী যখন বাপের বাড়ি যেতে চায় তখন জমিদার বলে, যাওয়া আসার মধ্যে থাকার প্রয়োজন কী, পুরোপুরি যাও।” তারপর পা-টিপানোর লোককে দিয়ে মওলানাকে ডাকিয়ে আনে : মওলানাকে খবর দাও, তালাকের মাসালা জিজ্ঞাসা করি।” লক্ষ্য করুন, ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ সমকামিতা করলে কী হবে, জমিদার কিন্তু ইসলামের রীতি-নীতি মানার ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ! আবার, মেয়েকে নিয়ে ময়রার দোকানে গিয়ে গোল্লা খাওয়ায় জমিদার। বিসমিল্লাহ না বলে মুখে দেওয়ায় মেয়েকে মুখ থেকে মিষ্টি ফেলে দিতে বলে। মেয়ে বিসমিল্লাহ বলে তবেই মিষ্টি খেতে পারে। লক্ষ্য করুন, সমকামী হওয়া সত্ত্বেও বিসমিল্লাহ বলার প্রতি জমিদারের খুব খেয়াল ! এমনকি খাওয়ার আগে যে জমিদার বিসমিল্লাহ বলে, সেটাও যত্ন করে দেখানো হয়েছে। এদিকে আবার গরিব ছেলে-পেলেকে সে মিষ্টি খাইয়ে দেয় (সেক্ষেত্রে কিন্তু বিসমিল্লাহর প্রয়োজন হয় না !) – তার দিলটা উদারও বটে ! কিন্তু আবার ঘেটুপুত্রের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে তাকে নির্যাতন করতেও ছাড়ে না।
আরেকদিন হাঁটতে বের হয় জমিদার, দেখে চাকতি ঘুরিয়ে জুয়ার আসর বসিয়েছে এক লোক। সে বলে, “আমার অঞ্চলে জুয়া নিষেধ, তুমি জানো না ?” লক্ষ্য করুন, ইসলামের বিধি-বিধান মানার ব্যাপারে সমকামী লোকটা বড়ই সচেতন !
জুয়া-অলা যখন কারণ হিসেবে বলে – "পানিবন্দী আছি, আমোদ-ফূর্তি তো লাগে চৌধুরি সাহেব", তখন চৌধুরি সাহেব বলে, হুম, তাও ঠিক।” (কারণ সে নিজেই পানির কারণে ঘেটুদলকে নিয়ে এসেছে ভোগের জন্য) অর্থাৎ জমিদার ইসলামও মানে, আবার আমোদ ফূর্তির প্রয়োজনে অনিসলামি কাজও করে। অবশ্য যাবার সময় সেই জুয়া-অলার কাপড়ের উপর একটা রূপার মুদ্রা ফেলে যায় – জমিদার দয়ালুও বটে !
মুভির শেষের দিকে, যখন মৃত ছেলেকে নিয়ে বসে তার বাবা কান্না করতে থাকে, তখন দয়ালু জমিদার তাদের বাকী জীবন সুখে কাটানোর ব্যবস্থা করার ওয়াদা করে : যথেষ্ট টাকা পয়সা সে দিয়ে দেবে কমলার পরিবারকে। জমিদারকে এখানে সামগ্রিকভাবে দয়ালু-ই দেখানো হয়েছে।

সকল দর্শক সমান না।
হুমায়ন আহমেদ খুব বুদ্ধিমান লোক। সে তার দর্শকের বিভিন্ন স্তর বোঝে। যে স্তরের দর্শকই দেখুন না কেনো, এই মুভি দেখে সবাই যেনো ইসলাম সম্পর্কে নেগেটিভ মেসেজ পায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে সে। আপনিই দেখুন, একটা লোক ওজু করছে, নামাজ পড়ছে, বাড়িতে মওলানা রেখে মেয়েকে আরবী পড়াচ্ছে, মেয়েকে বিসমিল্লাহ বলা শিখাচ্ছে, নিজে বিসমিল্লাহ বলে খাচ্ছে, তালাকের মাসআলা জিজ্ঞাসা করছে, নিজের অঞ্চলে জুয়া নিষিদ্ধ করেছে – ইসলামের রীতিনীতি বেশ জোরেশোরেই পালন করছে সে, কিন্তু সমকামিতার মত ইসলাম বিরোধী অপকর্মও করছে।
ইসলাম বিরোধী লোকেরা বলবে : ঐ দেখো, বাইরে দিয়ে যারা বেশি ইসলামের ভাব দেখায়, তলে তলে ওরাই শয়তান।
তখন হয়তো ভালো-খারাপের মাঝে দোদুল্যমান লোক বলবে : তাইতো, দেখসো, এই ব্যাটা নামাজ পড়ে ঠিকই, আবার ঐদিকে অকামও করে।”
"ইন্টেলেকচুয়াল স্তরে ওঠার চেষ্টাকারী” সুশীল লোকেরা বলবে, যা-ই বলো না কেনো, এগুলো তো fact. সমকামীতা তো আছে সবজায়গায়ই।”

হুমায়ুন আহমেদের ঘেটুপুত্র কমলা মুভির জমিদার চরিত্রটি নামাজ-কালাম পড়া এমন এক সমকামী লোক, যে ইসলামের রীতি-নীতি পালনের ব্যাপারে খুবই যত্নবান। অর্থাৎ, খারাপ লোকটির মাঝেই ধর্মীয় চর্চা বেশি। কিন্তু ধর্মহীন লোকটি মুভির সবচে' ভালো চরিত্র (সামনে দেখা যাবে)

মওলানা :
হুমায়ুন আহমেদের যেকোনো নাটক বা মুভিতে এজাতীয় চরিত্র না থাকলেই নয়। খুব স্পষ্টভাবেই হুজুরকে হাস্যকর করে উপস্থাপন করে হুমায়ন আহমেদ। মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামপন্থীদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা, এবং ইসলাম বিরোধী মানুষদের হাতে কথার অস্ত্র তুলে দেয়া, যা দিয়ে তারা "হুজুর” দেরকে হেয় করতে পারে, অপমান করতে পারে, এবং যেনো সামগ্রিকভাবে ইসলামপন্থী দাড়ি-টুপি অলা লোকেরা মানুষের কাছে হাসির পাত্র হয়। ঘেটুপুত্র কমলা মুভিতেও সেই একই কাজ করা হয়েছে।

মুভিতে "মওলানার” উপস্থিতি ঘটে যখন জমিদার তালাকের মাসআলা জানতে চায়। দরজার ওপাশ থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে মওলানা বলে : চৌধুরি সাব, এসেছি।” পরে জমিদারে স্ত্রী যখন কেঁদে বলে যে সে থাকবে, বাপের বাড়ি যাবে না, তখন দরজা না খুলেই জমিদার বলে দেয় : মওলানা চলে যাও, মীমাংসা হয়ে গিয়েছে।”
ইমপ্লিসিট মেসেজ : মওলানার কাজ হলো তালাকের মাসআলা বলা। মওলানা আসলে দরজা খোলা কি তাকে সালাম দেয়া-বসতে বলা – কিছুরই দরকার নেই। তাকে সম্মান করার দরকার নেই।
ইসলাম বিরোধীদের জন্য উপাদান : "জমিদারের নুন খায় তাই গুন গায়, জমিদার ব্যাটা যে সমকামিতা করছে, সেইটা নিষেধ করে না, ডাক পড়লে তালাকের মাসআলা বলতে আসে। দেখসো মওলানার অবস্থা !”

এর ঠিক পরের দৃশ্যেই মওলানা বাড়ির বাইরে যায়। সেখানে জমিদারের ঘোড়ার সহিস লুঙ্গি হাঁটুর উপর তুলে বসে আছে। মওলানা তাকে কাপড় ঠিক করে বসতে বলে। তারপর, নামাজে "শামিল” হয় না কেনো, সেকথা জানতে চায়। সহিস বলে : যে বাড়িতে ঘেটুপোলা থাকে, সেই বাড়িতে নামাজ ? এইডা কেমোন কথা ?” ভালো করে লক্ষ্য করুন, মওলানা কিন্তু সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ভিন্ন কথায় চলে যায়, বলে : চৌধুরি সাহেবের কাছে নালিশ কইরা, আমি তোমার শাস্তির ব্যবস্থা করবো।....” অর্থাৎ, চৌধুরির অপকর্মের দিকে যখন সহিস ইঙ্গিত করলো, তখন সে কথার জবাব তো দিলোই না, বরং আরো চৌধুরির কাছে নালিশের ভয় দেখালো।
ইসলাম বিরোধীদের জন্য উপাদান : . আরে মওলানার অবস্থা...। জমিদারকে অকাম করতে নিষেধ করতে পারে না, সছে সহিসকে নামাজ শিক্ষা দিতে।. জমিদারের টাকা খায় তো ব্যাটা... টাকা দিলে জমিদারের কুকামকেও হালাল বলে ফতোয়া দেবে এইসব মওলানা।”
আরো দুয়েকটা কথোপোকথনের পর মওলানা চলে যাওয়ার সময় পিছন থেকে ঘোড়ার ডাকের মত শব্দ করে টিটকারি দেয় সহিস। মওলানা একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে চলে যায়।
ইমপ্লিসিট মেসেজ : . দাড়ি-টুপি অলাদেরকে টিটকারি দেওয়া ভীষণ মজা ! . হুজুরদের সাথে যেমন খুশি বেয়াদবি-ঠাট্ট-মশকরা করা যায়, এতে কোনো অসুবিধা নেই, রিস্ক নেই, বরং আরো মজা আছে।

পরবর্তী দৃশ্যেই মওলানাকে দেখা যায় আর্টিস্টের ঘরে। আর্টিস্ট কাঠের মূর্তি বানাচ্ছে। আর্টিস্টকে সালাম দিলে সে সালামের জবাব দেয়। একটা কাঠের মূর্তি তুলে নিয়ে মওলানা বেশ খানিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, তারপর প্রশ্ন করে : "এইটা কী ?”
"বক, বকপক্ষী।"
মওলানা : "বকোপক্ষী ?”
ইসলামী ব্যক্তিদেরকে হাস্যকর করে উপস্থাপন : মওলানা "বকপক্ষী” না বলে "বকোপক্ষী” বলে। আর এত স্পষ্ট একটা বকের মূর্তি দেখেও সে সহজে চিনতে পারে না – "মওলানার বুদ্ধি মনে হয় কম।"

এর পরের অংশটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বকটা রেখে দিয়ে মওলানা বলে : আপনি জীবজন্তুর মূর্তি বানান। ছবি আঁকেন। দুইটাই বেদাত কাজ। তার উপরে আপনি পাঞ্জেগানা নামাজে শামিল হন না। আসেন, নামাজে আসেন। ওঠেন।
এই কথাটুকু শোনার সময় আর্টিস্ট মওলানার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সে কোনো জবাব না দিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার তার মূর্তির কাঠ ঘষতে থাকে।
মপ্লিসিট মেসেজ : এইসব মলানা-ছলানার কথায় পাত্তা দেয়ারই মানে হয় না ! এরা এতই তুচ্ছ যে কথার জবাব পর্যন্ত deserve করে না।
মওলানা আবার বলে : ভাই, আপনি বেহেস্তে যেতে চান না ? হাবিয়া দোযখের আগুনে পুড়ে কয়লা হবেন। কথাটা ইয়াদ রাখবেন।”
মওলানা চলে গেলে আর্টিস্ট একবার ভুরু উঁচিয়ে তাকায়, আবার নিজের কাজে মন দেয়।
ইসলাম বিরোধীদের জন্য উপাদান : . "এইসব মওলানারা আর্টের তো বোঝে না কিছুই, হুদাই সবকিছুর মধ্যে বেহেস্ত-দোযখ টেনে আনে।" . বেহেস্ত দোযখ ছাড়া আর কিছু নিয়ে এদের চিন্তা নাই।”

এর পরের দৃশ্যে দেখায় যে মওলানা ইকামাত দিচ্ছে নামাজের জন্য। লক্ষ্য করে দেখবেন, হুমায়ুন আহমেদের নাটকে আযান কিংবা ইকামাত থাকলে সেটা শুনতে সুমধুর হয় না। কিন্তু সেটা সুমধুর হতে পারতো ! যাহোক, ফজরের নামাজ পড়া দেখানো হয়, জমিদার ছাদের উপর নামাজ পড়ে। যদিও সে সময়ে আকাশ আলো হয়ে গিয়েছে; অর্থাৎ এমন সময়ে ফজরের নামাজ দেখানো হয়েছে, যখন কিনা আসলে ফজরের সময় আর নেই ! তারপর আবার, একই সময়ে অন্দরমহলে জমিদারের স্ত্রী নামাজে দাঁড়ায়, পাশে তার মেয়েটি। উঁকি দিয়ে সেই দৃশ্য দেখে ঘেটুপুত্র কমলা, আর তখন তাকে কান ধরে নিয়ে গিয়ে চড় লাগিয়ে দেয় কাজের মহিলা। তারপর সেই হাতটি ধুয়ে সে নামাজে দাঁড়ায় অন্য দুই কাজের মহিলার সাথে এবং ইমামতি করে। খুবই লক্ষ্য করার বিষয় যে, হুমায়ুন আহমেদের নাটক বা মুভিতে নামাজ পড়ছে, এমন মহিলা তেমন একটা দেখা যায় না, আর যখন বা দেখাও গেলো – এই দুই "নামাজী মহিলাই” কিন্তু ষড়যন্ত্র করে কমলাকে খুন করে !
খেয়াল করেছে, সবচে' খারাপ লোকগুলোর মাঝে ইসলাম পালনের প্রবণতা বেশি দেখানো হয়েছে ? (আর সামনেই দেখবেন যে সবচে' ভালো লোকটি ধর্ম-কর্মহীন।)
এই জাতীয় মুভি এভাবে অনেক ইমপ্লিসিট মেসেজ বহন করে, যা সরাসরি স্পষ্টভাবে খেয়াল হয় না। কিন্তু বিভিন্ন বুদ্ধিমত্তার দর্শকের ব্রেনে বিভিন্ন ইসলাম বিরোধী অনুভুতি / চিন্তা ঢুকে যায়।

জমিদারের মেয়েকে যখন মওলানা অশুদ্ধ উচ্চারণে আলিফ-বা-তা-সা শিখাচ্ছে, তখন এক পর্যায়ে পাশে রাখা একগ্লাস দুধ খেয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখতে রাখতে মওলানা বলে : “দুগ্ধ পান করা সুন্নত। নবীজী দুগ্ধ পান করতেন।” এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ করুন : . দুধকে "দুগ্ধ” বলায় মওলানার কথাটিতে হাস্যরস যোগ হয়েছে। (অবশ্য ইতোমধ্যেই মওলানা হাসির পাত্র !) . দুধ পান করাকে সুন্নত বলা হচ্ছে। যেনো ইয়াং জেনারেশানের ফালতু ছেলেপেলে সিমিলার টোনে তুচ্ছার্থক কথাবার্তা বলে। যেমন, বন্ধু গোষ্ঠীতে হয়তো একজন আরেকজনেক বলছে : “এই, তুই সেভেন আপ খেয়েছিলি ? সেভেন আপ খাওয়া সুন্নত।” কিংবা, “আরে ভাই, খা-না ! শরাব খাওয়া সুন্নত, হা হা হা...।”
মহানবী (সা.) শ্বাস নিতেন, তাই বলে আমরা শ্বাসকার্যকে সুন্নত বলি না, তেমনি মহানবী পানি খেতেন, আমরা সেটাকেও সুন্নত বলি না। যে বিষয়গুলো সুন্নত বলে আলোচিত হয়, যে বিষয়গুলোকে সুন্নত ক্যাটেগরিতে রেখে গবেষণা করা হয়, সেগুলো বাদ দিয়ে "সুন্নত” শব্দটাকে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে তুচ্ছ বিষয়ের সাথে, যেটাকে আসলে সুন্নত বলা যায় না। উদ্দেশ্য : ইয়াং জেনারেশানকে সুন্নত শব্দটার তুচ্ছার্থে ব্যবহার শিখিয়ে দেওয়া।

আরেক দৃশ্যে, যখন জমিদারের মেয়েকে একই পড়া পড়াচ্ছে মওলানা, তখন সেখানে কমলা উপস্থিত হয়। মওলানা বলে : এই পোলা, আল্লা-খোদার নাম যেখানে নেওয়া হয়, সেখান থেকে দূরে থাকবি। কথাটা ইয়াদ থাকবে ? তখন কমলা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালে মওলানা বলে : ইয়াদ যেনো থাকে, সেই ব্যবস্থা করি ? হাত মেল্।” তারপর ছেলেটার হাতে সাত-আটটা বেতের বাড়ি দেয়। তখন জমিদারের মেয়ে আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে মওলানাকে বলে : “আমি আপনার কাছে পড়বো না, আপনি খারাপ।” এই বলে উঠে যাবার সময় সে দুধের গ্লাসের পুরো একগ্লাস দুধ মওলানার মুখে ছুঁড়ে মেরে দিয়ে চলে যায়। (মওলানার মুখে যে মেয়েটা একগ্লাস দুধ ছুঁড়ে মারল, এই বিষয়টা মুভিতে দেখে যতটুকু হাসি পাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি হাসি পাবে যদি অনুরূপ বর্ণনা হুমায়ুন আহমেদের বইয়ে পড়েন। আরো সুকৌশলে হাস্য-রসাত্মক বর্ণনা দিয়ে মওলানাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে সেই অংশগুলোই হয় গল্প / উপন্যাসের সবচে' হাসির অংশ। যারা হুমায়ুন আহমেদের নাটক / গল্প / উপন্যাসে অভ্যস্ত, তারা হয়তো জানেন।)
যে বিষয়টা উপেক্ষিত হলো : একজন মওলানা, একজন বয়স্ক লোক, সর্বোপরি শিক্ষক, তিনি যতই অনুচিত কাজ করুন না কেনো, তার সাথে বেয়াদবি করার উচিত না; তার মুখের সামনে আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে শাসানো কিংবা তার মুখে একগ্লাস দুধ ছুঁড়ে মারা তো দূরের কথা।
মেসেজ : ঠিক হয়েছে। উচিত শিক্ষা হয়েছে। এইসব ভণ্ড হুজুরদের এমন শাস্তিই হওয়া উচিত।

কিন্তু মওলানাকে কি সম্পূর্ণ ক্লাউন বানালে চলে ? কিংবা মওলানাকে যদি শতভাগ দোষে পরিপূর্ণ দেখানো হয়, তাহলে তো বিষয়টা খুব প্রকাশ্য (explicit) হয়ে যাবে। সুতরাং, মওলানার মধ্যে কিছু ভালো বিষয়ও দেওয়া দরকার ! অর্থাৎ, সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ কিংবা সত্যকে বদলে দেয়া জাতীয় কাজ করা দরকার। মুনাফিকের কাজ যেটা আরকি। সুতরাং...
জমিদারের মেয়েটি চলে যাবার পর গামছা দিয়ে মুখ মুছে কমলাকে কাছে ডাকে মওলানা। তারপর তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে : আমার ভুল হয়েছে। মন খারাপ করিস না, যা।” কমলা চলে গেলে সে একা একা বলে : ইয়া আল্লাপাক, আমার এই অপরাধ তুমি ক্ষমা করো।”
অর্থাৎ, কেউ যদি অভিযোগ করে যে হুমায়ুন আহমেদ হুজুরদের কেবল সম্পূর্ণ খারাপ বলে চিত্রিত করে, তবে যেন ভক্তরাই তার পক্ষ হয়ে জবাব দিয়ে দিতে পারে – সেই সুযোগও থাকলো, ইসলামের ক্ষতি করাও হলো। মুনাফিক যেভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারে, তেমনি।
আর মওলানা তো অলরেডি হাস্যকর একটা চরিত্র, সে তো হাসির পাত্র। সুতরাং তার ভালো কাজ নিয়ে কিছু বলার দরকার নাই। ইসলাম বিরোধীরা তাকে একভাবে উপস্থাপন করবে ও হেয় করবে, আর মুসলমানের গর্দভ বাচ্চারা, যারা হলো ইয়াং জেনারেশান, এবং "স্মার্ট", তারা ষড়যন্ত্রের গভীরতা না বুঝলেও মওলানাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে ছাড়বে না। শয়তানের এর চেয়ে বেশি আর কী দরকার আছে !

রবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করুন : নামাজে “শামিল” হওয়া, “ইয়াদ” করা, "ইয়াদ" থাকা, “পুছ” করা, এই শব্দগুলো খেয়াল করুন। ইসলামী রীতি-নীতির সাথে প্রচুর আরবি-ফার্সি শব্দ জড়িত। কিছু উর্দু শব্দও প্রচলিত। "হাস্যকর চরিত্র মওলানা" যখন আরবি-ফার্সি শব্দগুলো ব্যবহার করে, তখন সেই শব্দগুলোও কিন্তু হাস্যকর হয়ে যায় ! এবং যখন এই শব্দগুলোই বাস্তবে একজন ইসলামী ব্যক্তি ব্যবহার করবে, কিংবা হয়তো বন্ধু শ্রেণীর মাঝেই একটু ইসলামী-মনা ছেলেটি ব্যবহার করবে, তখন সে অন্য বন্ধুদের উপহাসের পাত্র হবে ! এবং এটাই তো হুমায়ন আহমেদের চাওয়া !

আর্টিস্ট :
আর্টিস্ট হলো এই মুভির সবচে' ভালো চরিত্র। সে আর্টের জগতের মানুষ – উঁচুদরের মানুষ, কিন্তু টাকা পয়সা কম। সে-ও তিনমাসের জন্য এসেছে টাকার বিনিময়ে। সৌখিন জমিদারের পোর্ট্রেইট আঁকা, কিছু কাঠের মূর্তি বানানো, এই হলো তার কাজ। আর সবাই দূর-দূর করলেও সে কমলাকে কাছে ডেকে বিছানায় বসায়। কমলার সাথে বসে সূর্যাস্ত দেখে। বাড়ির উঠানে বসে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকাবস্থায় কমলাকে এসে ভিজতে দেখে আর্টিস্ট তাকে "জহির” বলে ডাকে। "ভালো আছো ?” জিজ্ঞাসা করে। কাছে ডেকে বসায়। কমলার "পরীর-চেয়েও-সুন্দর" বোনের গল্প শোনে। তারপর সে-ও কমলার সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠে। তুমুল বৃষ্টি। তার মাঝে সবচে' ভালো মনের মানুষটা কমলার সাথে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে। ওরা দু'জনেই খুব হাসছে। এ বাড়িতে এসে কমলা এর চেয়ে বেশি খুশি আর কোনোদিন হয়নি।
একটু সাহিত্যিক বর্ণনা দেবার চেষ্টা করলাম আরকি। আমি সাহিত্য পারি না। কিন্তু এতটুকু বর্ণনাই এদেশের খালি-কলস মাথা ইয়াং ছেলেপেলেদের হৃদয়ে ধর্মহীন আর্টিস্টকে বসিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।

কমলা একমাত্র এই আর্টিস্টের সাথেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলে। আর্টিস্ট বসে কাঠ ঘষতে থাকে, আর পানি নামলে বাড়ি যাওয়ার আশা পোষণ করে কমলা তার সাথে গল্প করে। আর্টিস্ট এতটাই ভালো হৃদয়ের মানুষ যে তাকে খুব আপন করে নেয় কমলা, তাকে জিজ্ঞাসা করে : “আপনি কি আমারে ঘিন্না করেন ?” সে মাথায় হাত বুলি বলে : “না।” ছেলেটা খুব খুশি হয়। তারপর ছেলেটাকে একটা কাঠের হরিণের মূর্তি উপহার দেয়। আর সেইসাথে একটা ছবি, ক্যানভাসের উপর আঁকা। ছবিটা "জহির” এর। অর্থাৎ কিনা, বাইরে কম কথা বললেও, আর্টিস্ট ছেলেটাকে অনেক মায়া করে, এবং আর্টিস্টের মনের ভিতরে "জহিরের” যে ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিলো, সেই ছবি থেকেই ওর ছবি এঁকে ওকে গিফট করে।

লক্ষ করুন, মুভির সবচে' ভালো মনের মানুষটি হলো ধর্ম-কর্মহীন। অর্থাৎ, সে খুব সুন্দর হৃদয়ের মানুষ – অন্যান্যদের মত একদিকে ধর্মীয় আচার পালন করে, আরেকদিকে সমকামিতা করে, মানুষ খুন করে – এমন মানুষ নয় সে। সবচে' ভালো মানুষটি ধর্মহীন মানুষ। এবং সে আর্টিস্ট। এই সবচে' ভালো মানুষটা কিন্তু আবার মওলানার "ফালতু কথার” কোনো জবাবই দেয় না ! সুতরাং, (মেসেজ :) তোমরা যারা এই আর্টিস্টের মতো ভালো মানুষ হতে চাও, তারা তারা ধর্ম-কর্ম বাদ দিয়ে নাচ-গান-ভাস্কর্য-ছবি-সাহিত্য এসবে ডুবে থাকো। কী সুকৌশলেই না এই মেসেজগুলো implicitly ইয়াং জেনারেশানের ব্রেইনে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে !

লেখা আর বড় করবো না অযথা অপ্রয়োজনীয় চরিত্র বিশ্লেষণ করে।
আমরা বাংলার ইতিহাস যতটা পড়ে এসেছি, জেনে এসেছি, দেড়শ' বছর আগেকার জমিদারদের মাঝে এজাতীয় অপকর্মের কথা শুনি নাই বা জানি নাই। আসলেই এজাতীয় বিষয় এই অঞ্চলে ছিলো কিনা, তা আমি জানি না। ইতিহাস তুলে ধরবে হুমায়ন আহমেদ, ভালো কথা, কিন্তু দুনিয়ার আর সব বিষয় থাকতে, বাংলা ইতিহাসে টিপু সুলতান সহ আরো অনেক ব্যক্তিত্ব থাকতে, আরো বহু ইতিহাস থাকতে, বিশেষভাবে সমকামিতার ইতিহাস তুলে ধরার কী এত প্রয়োজন হলো ? মানুষকে এই ইতিহাস শেখানোর উদ্দেশ্যেটা কী ? লাভটা কী ? এতে কি মানুষ সমকামীতা থেকে দূরে সরবে, নাকি আরো সমকামীতা বাড়বে ? এতক্ষণ তো বিশ্লেষণ করলামই, কিভাবে কী কী মেসেজ ঢুকিয়ে দিয়েছে হুমায়ুন আহমেদ তার মুভির মাঝে। কোনোভাবেই, কোনো বিচারেই এই মুভির পিছনে কোনো সৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। বরং এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে সমকামিতাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, সমকামিতাকে সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেয়ার পথের সূচনা করা, সর্বোপরি মানুষের মুখে মুখে সমকামিতার বিষয় তুলে এনে ইসলামের ক্ষতিসাধনই এই মুভির প্রধান উদ্দেশ্য। মৃত্যুর আগ দিয়ে শয়তানকে সবচে' বেশি serve করে গেলো এই মুভি দিয়ে। এর প্রতিদান সে অবিরতভাবে পেতে থাকবে, যেমনিভাবে কিছু সৎ কাজের প্রতিদান মানুষ অবিরতভাবে পেতে থাকে।

আর আমাদের দেশের ইয়াং জেনারেশান, যারা বিশেষভাবে হুমায়ুন ভক্ত, তাদের বেশিরভাগই বুঝতেও পারছে না, ইসলামের বিরুদ্ধে কী সুগভীর ষড়যন্ত্রেরই না অংশ হয়েছে তারা ! হয়তো বুঝবে, কিন্তু তখন হয়তো আর কিছু করার থাকবে না। হয় ততদিনে এদেশে ইসলামের চিহ্ণ মুছে ফেলবে হুমায়ুন আহমেদ-জাফর ইকবাল-আহসান হাবীব গং; নইলে তখন বুঝবে, যখন একজন ফেরেশতাকে চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাবে, জীবনের সমস্ত কর্ম ফ্ল্যাশব্যাক করবে, আর বলবে – হায় ! আমাকে যদি আর কিছুদিন সময় দেয়া হতো !

অনেক বড় লেখা লিখে ফেললাম।
কিন্তু এত বড় লেখা পড়ার সময় কই ? আমাদের ইয়াং জেনারেশান তো খুব "স্মার্ট", "আধুনিক", এবং আরো আধুনিক হতে ব্যস্ত। তাদের সময় কই প্রিয় হুমায়ুন "স্যারের" সমালোচনা পড়ার ?
বরং তারা হলুদ পাঞ্জাবি পরবে, বইমেলা থেকে একগাদা হিমু-মিসির আলী কিংবা জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশান সমগ্র কিনে বাসায় ঢুকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবে : আজ ১৩ টি বই কিনলাম। ইসলাম নিয়ে চিন্তা করার সময় কই ? বরং তারা দু-চারদিন খালিপায়ে রাস্তায় হেঁটে হিমু সাজবে, হুমায়ুন আহমেদের মুভি নিয়ে "বক্তব্য” দিয়ে আঁতেল কিংবা ইন্টেলেকচুয়াল গোত্রে ওঠার খোলস ধরবে : ঘেটুপুত্র কমলায় তৎকালীন বাংলা সমাজের এক নীপিড়নমূলক বাস্তবতাকেই তুলে এনেছে...
আর হুমায়ন আহমেদ ? গ্ল্যাডিয়েটর মুভিতে একটা খুব সুন্দর ডায়লগ ছিলো : “He'll be forgotten in a month.” হুমায়ন আজাদকে মানুষ ভুলে গিয়েছে খুব দ্রুত, কারণ মানুষ ওকে চিনেছিলো ছুরিকাহত হবার পর। হুমায়ুন আহমেদকেও এদেশের মানুষ ভুলে যাবে, তবে একটু বেশি সময় নেবে, এই যা।
হুমায়ন আহমেদ মারা গিয়েছে, তাকে নিয়ে আলোচনাগুলোও হয়তো একসময় মুছে যাবে, কারণ তার ভালো কাজ বলতে তেমন কিছু নেই। কিন্তু ইসলামের যেই ক্ষতি সে করে দিয়ে গিয়েছে তার আজীবনের সাহিত্য দ্বারা, এবং যেই ধ্বংসের বীজ বপন করে দিয়ে গেলো তার শেষ (অপ)কর্ম দ্বারা, তার ফল বয়ে বেড়াবে এদেশের তরুণ ছেলেপেলেরা।

এইসব অন্ধ হুমায়ুন-জাফর ভক্ত ছেলেপেলেদের মাঝে আমার বন্ধু-বান্ধবও আছে। অনেকেরই বন্ধু বান্ধব আছে। অনেকে নিজেও আছেন। (আমি নিজেও ছোটবেলায় জাফর ইকবালের লেখা খুব পছন্দ করতাম !)
মুনাফিককে শনাক্ত করা সবচে' কঠিন কাজ। এজন্যে সচেতন হওয়াটা সর্বাগ্রে জরুরি। হয়তো এই ছেলেপেলেগুলোও সচেতন হবে। হয়তো একদিন হবে। হতে পারে সেটা আজ, এই লেখা পড়ে। কিংবা হয়তো অনেক পরে, বৃদ্ধ বয়সে, যখন তার ছেলে-মেয়েরা হুমায়ুন-জাফরের নষ্ট করে দেওয়া সমাজের নোংরামিতে লিপ্ত। কে জানে !

নূরে আলম
ডিসেম্বর ২, ২০১২।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…