সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

হরবোলা

১. একদিন ক্লাস হচ্ছিল না বলে কয়েকজন ফ্রেন্ড বসে গল্প করছিলাম। এখনকার জেনারেশনের ছেলে- মেয়েরা সাধারণত যে গল্প করে, তা হল অমুকের নতুন মোবাইল সেট, অমুকের এই ল্যাপটপ, কিংবা ফেইসবুক অথবা কাপড়-চোপড়, গাড়ি ইত্যাদি। এসব নিয়েই গল্প করছে সবাই। আমি এসব কথায় খুব একটা পার্টিসিপেইট করতে না পেরে শেষে দেশের কথা তুললাম। বিডিআর মিউটিনির কথাটা স্বাভাবিকভাবেই এল। দু-একজন ফ্রেন্ডকে দেখলাম এ বিষয়ে আমার সাথে কথায় অংশ নিতে পারল। আর বাকীদের অবস্থা না বললেই নয়- রাজনীতি কিংবা দেশের খবর, কিছুই জানা নেই তাদের। বিডিআর এর এই ঘটনায় কীভাবে সীমান্ত অরক্ষিত হয়ে পড়েছে, তাতে বাংলাদেশের কী কী ক্ষতি হতে পারে, সীমান্তে প্রতিদিন কীভাবে গুলিবর্ষণ করে বাংলাদেশীদের হত্যা করা হচ্ছে এসব কথা বলায় কয়েকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর বললাম বাংলাদেশের সমুদ্র মিয়ানমার আর ভারত কীভাবে দাবী করেছে, ভারত তাদের হাইকমিশনসহ অন্যান্য স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য এস.এস.বি(সশস্ত্র সীমা বল), স্কাই মার্শাল, গোয়েন্দা ইত্যাদি নিয়োগ দিতে চেয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা তৈরী পোশাক শিল্পের বাজার অন্যান্য দেশের হাতে চলে যাচ্ছে, রেমিট্যান্সের প্রবাহে ধস নেমেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শ্রমিক ফেরত আসায় ইত্যাদি। খুবই অবাক হলাম যখন দেখলাম, আমার বন্ধুদের দুনিয়ার বাইরের কথা বলছি আমি। সত্যিই, এখনকার জেনারেশন রাজনীতির খবর খুব কমই রাখে। এসব শুনে আমার এক ফ্রেন্ড তো অস্থির হয়ে গেল। ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্সের কথা তো বাদই দিলাম, কিছুই জানা নেই তার যে দেশটায় বাস করে, সে দেশ সম্পর্কে। আর এ অবস্থা এই যুগের বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ের। বাবা-মা হয়তো রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি, পাঁচ বছর অন্তর অন্তর প্রত্যেকেই নিজের পছন্দের দলকে ভোট দেন, কিন্তু ছেলে মেয়েকে রাজনীতির কথা জানাবার প্রয়োজন বোধ করেন না, সময়ও পান না। আগের জেনারশন তাও কোন না কোন পার্টি সাপোর্ট করত, এই জেনারেশন ভোট দেবার সময় কি no party কে ভোট দেবে?
২. আরেকদিনের কথা, ক্লাসের কয়েকজন ছেলে-মেয়ে দাঁড়িেয় গল্প করছি। কথা হচ্ছিল ইসলাম ধর্মের নানান আচার্য বিষয় নিয়ে। একজন বলছে, টাখনুর উপর পর্যন্ত পায়জামা বা প্যান্ট পরতে হবে, না হলে নামাজ হবে না। কিংবা- জুমার নামাজ না পড়লে মুসলমানিত্ব বাতিল, এইসব। আমি বললাম- "ধর্ম তো আর কোন অন্ধ বিশ্বাসের ব্যাপার নয়, বিশেষত ইসলাম ধর্মের প্রতিটা বিষয়ই অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত আর বৈজ্ঞানিক। নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করলে অনেক কিছুই খুব পরিষ্কার হয়ে যায়।" আমার এই কথায় প্রবল বিরোধিতা করল দু'জন- "ধর্ম হল বিশ্বাসের ব্যাপার।" তাদের মত হল, ধর্মের রীতিনীতি আমরা যেভাবে ঐতিহ্যগতভাবে পালন করে আসছি, সেটাই ধর্ম। এর সাথে বিজ্ঞানকে সম্পর্কিত করা যাবে না ইত্যাদি। এদেরই একজন, সে অলরেডি চারবার কোরআন শরীফ খতম দিয়েছে, কিন্তু কখনও সেটার বঙ্গানুবাদ পড়ার তাগিদ অনুভব করে নাই, পড়লে অবশ্যই জানত ইসলাম কতটা বিজ্ঞানসম্মত জীবনব্যবস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, গোষ্ঠীতে নামাজ পড়ার রীতি হুবহু এক নয়- কেউ বুকে হাত বেঁধে নামাজ পড়ে, কেউ হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে; কেউ বসে মুনাজাত করে, কেউ করে দাঁড়িয়ে, কেউ পাগড়ি পরে, কেউ টুপি পরে, এসব দেখলে ওরা কী বলত? ধর্মটাকে শুধুমাত্র কয়েকটা আচার্য বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি আমরা, এই আমাদের জেনারেশনের ছেলে-মেয়েরা, কখনো সেটাকে জীবন বিধান হিসেব ভাবতে শিখিনি। ইসলামের কয়েকটা বিষয়ে, যেগুলো নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে, কেউ কেউ সেটার প্রতি অন্ধ ভক্তি দেখাচ্ছে। অথচ এই এরাই যে এসব কথা শেষে বাসায় গিয়ে টিভি ছেড়ে হিন্দি মুভির নাচগান দেখবে- সেকথা মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা যায়। ইসলাম ধর্মে কি কখনো এসব অশ্লীল নাচ দেখবার অনুমতি ছিল? চারবার কোরআন খতম দেয়া মেয়েটা হয়তো বলতে পারত, যদি এই চারবারের একটিবার অর্থসহ পড়ে দেখত।
৩. প্রযুক্তির সংস্পর্শে মানুষের খারাপ হওয়াটা এখন মোবাইলে দুটো টোকা কিংবা কম্পিউটারে একটা ক্লিকের ব্যাপার মাত্র। বিশ-ত্রিশ বছর আগেও তো দেশের এ অবস্থা ছিল না। কারো চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মানুষ তাকে ছিছি করত। এখন এগুলো মানুষ জানতেও পারছে না, অনেকে অপকর্ম করে সারাদুনিয়ায় কালি ছড়িয়ে বাসায় এসে বাবা-মা ভাই-বোনের সামনে ভালোমানুষটি সেজে বসে থাকছে। মাল্টিমিডিয়া মোবাইল আর ইন্টারনেটের যুগ এখন। স্কুল ছাত্রদের হাতে পর্যন্ত ঘুরছে এই মাল্টিমিডিয়া মোবাইল। রাস্তা-ঘাটে, এমনকি ক্লাসে বসে পর্যন্ত ক্লাসের মেয়েদেরই ছবি তুলছে ছেলেরা। ভয়াবহ ব্যাপার হল, যুবকদের হাত পেরিয়ে এখন কমবয়েসী স্কুল পড়ুয়াদের হাতের মোবাইলে ঘুরছে পর্নোগ্রাফি। এদেরকেই বাবা-মা না বুঝে আরও ভালো রেজাল্ট করার পুরষ্কার স্বরুপ 'ক্যামেরা মোবাইল' কিনে দেন। বাবা-মা সন্তানের খবর জানবেন কী করে? যে প্রযুক্তিগুলো সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন, সেগুলো যে তাদের মনগুলোকে কীরকম ভয়াবহ বিকৃত করে তুলছে এসব দিয়ে, বাবা-মা তার কিছুই জানছেন না। এই সন্তানদেরই তাঁরা প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে পাঠাচ্ছেন, এরাই আবার রোজা রেখে 'উপবাস' পালন করছে। আমাদের জেনারেশনকে যে এই ভয়াবহ দ্বন্দটা কীভাবে গ্রাস করেছে আর করছে- তা মাঠে নেমে না দেখলে কল্পনাও করা যাবে না।
৪. মিডিয়ার গ্রাসে যে এই মানুষগুলো নিজ সাহিত্য-সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে - টিভিতে বাংলা চ্যানেলগুলোর তুলনায় হিন্দি চ্যানেলগুলোর সংখ্যা গুনলে তা সহজে বোঝা যায়। মেয়েরা তো দেখেই, মায়েরা পর্যন্ত হিন্দি সিরিয়াল দেখে মুখস্ত করে ফেলছেন। ছেলেরা আবার একটু বেশি 'আধুনিকতার প্রমাণ' হিসেবে দেখে ইংলিশ মুভি। এদের দেখবেন গড়গড় করে হিন্দি বলে যাচ্ছেন। ইংলিশ গালিগুলো 'উত্তরাধুনিকতার প্রমাণ' হিসেবে ছেলেদের মুখে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। ফুল ভলিউমে Bass সহকারে ইংলিশ গান বাজিয়ে পুরো পাঁচতলা বাড়ি কাঁপিয়ে ফেলছে অনেকে- সারা বিল্ডিঙের সবাই রোগী হলেও তাতে কী, 'ইংলিশ' হতে হবে না!
বাস্তব এক গল্প বলি। আমার বোন ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বান্ধবীর বাসা থেকে ঘুরে এলেন। বান্ধবী তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২১শে ফেব্রুয়ারির ফাংশােন গান গেয়ে পুরাদস্তুর বাঙালি হয়ে বাসায় গিয়েই হিন্দি চ্যানেল খুলে বসেছেন- অলরেডি সিরিয়ালের খানিকটা মিস হয়ে গেছে! অথচ এই এদেরই দু'কলম বাংলায় লিখতে বলুন শুদ্ধ করে- দশটা ভুল খুঁজে বের করতে পারবেন।

এই আমরা বাংলাদেশী, বাংলাভাষী। এই আমাদের দেশভাবনা, ধর্ম পালন, আর নীতি-নৈতিকতার দৌড়। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই হরবোলার গল্পের মত অবস্থা আমাদের না হয়, যে হরবোলা কখনো নিজের স্বরে কথা বলত না, সবসময় কারো না কারো স্বর অনুকরণ করে কথা বলত। একবার এক ঝামেলায় সে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিতে গিয়ে কখনো আইনজীবির স্বর, কখনোবা বিচারকের স্বরে কথা বলতে শুরু করল। শেষে বিচারক যখন আদেশ করলেন নিজের স্বরে কথা বলতে, তখন সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে বলে- "আমি নিজের কন্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেছি।"

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…