সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অনেকদিন পর, এইসব গল্প

৫ই অগাস্ট এর কাহিনী

শুক্র-শনি আব্বু আর বড়াপুর অফিস ছুটি। আম্মু তাই বৃহস্পতি থেকে শনিবার পযর্ন্ত এই ছোট্ট ট্রিপ-এ গেলেন নানাজীর সাথে নানাবাড়ি, সাথে আমি আর ছোটমামা।
৫ই অগাস্ট সকাল আটটার দিকে রওয়ানা করে বেলা একটায় পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে বের হয়েই প্রথম যে কথাটা মনে হল, সেটা একটা শব্দ- 'গরম!' সারা বাংলাদেশে এসি লাগানোর মত অবস্থা!
তাড়াতাড়ি ব্যাগ নিয়ে সোজা দো'তলায়। গোসল করতে যেয়ে দেখি দীর্ঘদিনের অব্যবহারে বাথরুমের অবস্থা খুব চমৎকার! কোনমতে জুতা পরে রবীন্দ্রনাথের সেই চাকরের(নামটা ঠিক মনে নেই, ব্রজেশ্বর মনে হয়) মত হাত বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে গা বাঁচিয়ে গোসল করলাম। আম্মু হাঁড়ি-পাতিল ধুয়ে খিচুড়ির ব্যবস্থা করে ফেললেন। সবাই খেয়ে-দেয়ে দম ফেলতেই ক'ঘন্টা যেন পার হয়ে গেল।




ছোট মামা গেলেন আমার এক কাজিনের বিয়ের অনুষ্ঠানে। আমাকেও যেতে বলল কেউ কেউ, মাইক্রোতে জায়গা-ও ছিল, কিন্তু আমি আগুন-গরম বাতাসে একেবারে শ্রান্ত! ছোট মামার রুমে ঘুমিয়ে পড়লাম।
বিকেলে সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠে তিনতলায় গেলাম আরেক মামার রুমে। আম্মু বসে কথা-বার্তা বলছিল। মামার দুই মেয়ের জ্বর। মামীরও জ্বর(সম্ভবত)। খানিক গল্প-টল্প করলাম। ছাদে গেলাম। মামার বড় মেয়ে এসে খানিক গল্প করল। আমি এইচ.এস.সি পাশ করেছি, আমাকে নাকি কোন 'ভারিক্কি'-ই মনে হয় না! আম্মু এলেন। তারপর নানাজী। নানাজী ছাদে হাঁটলেন। সবাই টুকটাক গল্প করলাম।
এরপর সন্ধ্যা।
আমরা নেমে এলাম। এরমধ্যেই আবার ড্রাইভার বাজার করে দিয়ে গিয়েছিল। মামার মেয়েটা পেঁয়াজ-রসুন কেটে দিল (বটিতে), আমি আবার পেঁয়াজ আর মরিচ কেটে দিলাম(সুইস নাইফ দিয়ে) আর আম্মু করলেন বাকীটা(প্রধান কাজগুলো- মুরগি পিস করা, কষানো...)।
এরপর যেন কী? রাত হয়ে গিয়েছিল মনে হয়। ড্রয়িঙ রুমে সোফার উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। অফিসের গাড়ির ড্রাইভার বেচারা জানত না যে তাকে দু-দিন থাকতে হবে। এক কাপড়ে এসে বেশ ফাঁপড়ে পড়ে গিয়েছিল। তাই নিয়ে খানিক দুঃখ প্রকাশ করল।
তারপর কী হল মনে নাই।
ছিলাম বলতে তো শুধু শুক্রবারটা। তার-ই দু-একটা যা মনে আছে, লিখে যাই।


মতিনের দোকান
সকালবেলা বিখ্যাত মতিনের দোকান থেকে ১৫ টা পরটা, সাথে ডাল না আলু কী যেন দেয় ঐটা আর রাজভোগ কয়েকটা কিনে আনলাম- নাস্তা!
এই মতিনের দোকান অনেক বিখ্যাত। একবার আমাকে বড় মামার বড় ছেলে এখানে এনে 'আনলিমিটেড মিষ্টি' খাইয়েছিল। তখন আমি অনেক ছোট। এখান থেকেই প্রয়োজনে কেজি কেজি মিষ্টি কেনা হত। আমার মনে আছে, আমার এক কাজিনের সাথে একবার ঐ দোকানে গিয়েছিলাম। টাকা ছিল মাত্র দশ মনে হয়। দু'জনই মিষ্টির পাগল। কিন্তু সেখানের মিষ্টি সম্ভারের প্রতি আমাদের আকর্ষণ আর আমাদের বাজেট- এই দুয়ের মিল হচ্ছিল না কোনমতেই। তাই দেখে দোকানি বলল- 'ক' সাহেবের নাতি তোমরা, আর মিষ্টি খাওয়ার টাকার হিসেব কর। তার কথা শুনে যে কোথা দিয়ে পালাবো, খুঁজে পাচ্ছিলাম না।


'জা.পু.'র বাগানবাড়ি
সকাল সকালই গেলাম জা.পু.তে। সেখানে দেখা হল লাদেনের সাথে। লাদেন মাঝে চলে গিয়েছিল, আবার এসেছে। সে-ই সব দেখাশোনা করে, বাগানবাড়িতে চাষবাস করে। তার আসল নামটা জানি না। আমার রসিক নানির দেওয়া নাম এটা। নানি বেঁচে থাকলে নিশ্চয় এখনও লাদেন নামেই ডাকতেন। জা.পু.র মসজিদটা দো'তলা হচ্ছে। নানাজী বললেন যে ওটা নাকি চারতলার ফাউন্ডেশানে করা। অবশ্য চারতলা পর্যন্তই করতে হবে, কারণ ওখানে স্যাটেলাইট সিটি হয়ে গেলে সবাইকে তো ঐ মসজিদে আসতে হবে। মসজিদটার বারান্দায় একটা খাটিয়া টানানো আছে। দেখামাত্রই কেমন যেন ভয় লাগল। মৃত্যুকে খুব ভয় লাগে।
যাহোক, আমরা নানাজীর সাথে বাগান ঘুরতে বেরোলাম। গাড়ি থেকে নেমে বাংলো বাড়িটা পর্যন্ত যেতে দু'পাশে ফুলের গাছ, পাতাবাহার, ক্রিসমাস ট্রি, এইসব। আর চারপাশে বাগান। ফলের বাগান। আম, লিচু, কাঁঠাল, ঔষধি সব গাছ, তেজপাতার গাছ, পাম ট্রি, আরও অনেক ফলের গাছ। পুকুরটা লিজ দেওয়া।
নানাজী লাদেনের সাথে কথা বলতে বলতে আমি আর আম্মু হাইওয়ের ওপারে আম্মুর রিলেটিভদের দেখতে গেলাম।


আত্মীয়-স্বজনদের কথা
আমি তেমন কাউকে চিনি না।
যাওয়ামাত্র কয়েকজন মহিলা 'আপু...' ইত্যাদি কথা শুরু করে দিল। আমি তাদের কাউকেই চিনি না। কাউকে আবার চিনি 'অমুক খালা' বা 'অমুক মামা' হিসেবে, কিন্তু কীভাবে খালা-মামা হয়, তা জানি না।
একটু পরেই 'এটা কি আপুর ছেলে?' এই প্রশ্ন। তারপর আমি চুপ করে তাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকি, আর আম্মু তার ছেলে-মেয়েদের গল্প শুরু করেন।
প্রায় অনেকের মুখেই জিজ্ঞাসা-'আচ্ছা, ঐটা কি সত্যিই করবে?' সবাই তাদের ভালোবাসার মানুষটির খোঁজ নেয়, সে নিরাপদ- এটা নিশ্চিত করতে চায়, তাকে একনজর দেখতে চায়।
ছোট নানার বাসায় গেলাম। ছোট নানা ছাড়া একজনকেই কেবল চিনি। তাও আবার কীভাবে কী, তা জানি না। যাকগে। সাথে সাথে আমাদের মুড়ি খেতে দেওয়া হল। তারপর 'ভাজা' আনতে বলা হল। ভাজা আনা হলে দেখলাম জিনিসটা চানাচুর। আমি আবার পেঁয়াজ-মরিচ কেটে দিতে বললাম। ছোট নানার স্ত্রী কেটে দিলেন। সর্ষের তেল দিয়ে মাখিয়ে সেটা মুড়িতে দেওয়ার পর খেতে গিয়ে ঝাঁঝের চোটে চোখে পানি চলে এল। খাঁটি সরিষার তৈল বলে কথা। ঢাকায় তো এত-এত সর্ষের তেল দিলেও ঝাঁঝ লাগে না।
'হাসি' খালাম্মা কাকে দিয়ে যেন কয়েকটা পেয়ারা পাড়িযে দিলেন। মুড়িটা প্রায় শেষ করে সেগুলো খেতে শুরু করলাম। ছোট ছোট পেয়ারা, কিন্তু খুব স্বাদ ভালো। ভেতরটা লালচে। বড় দেখে একটা পেয়ারা হাতে তুলে নিয়ে আম্মুর পিছ পিছ বেরোলাম অন্যদের বাসা ভিজিট করতে। আম্মুর সাথে আরও কয়েকজন এলেন। তাদের মাঝে যারা নাম 'পারভিন', উনি আবার দুইটা পেয়ারা ধুয়ে এনেছেন- আমার পকেটে দিয়ে বললেন- 'গাড়িতে যাওয়ার সময় খেও, মজা লাগবে।'
আম্মুর এক চাচী, একেবারে বুড়ি মানুষ, আম্মুর কাছে বড় ছেলের খবর জিজ্ঞাসা করল। বউ বিদেশী মেয়ে আর ছেলে বিদেশ চলে গিয়েছে- একথায় দন্তবিহীন তোবড়ানো গালে সে তার ঠোঁটটা উল্টে মাথা নাড়তে লাগল। বোঝা গেল- বিষয়টা পছন্দ হয়নি তার
আরও অনেকের বাসায় গেলাম.....। কতগুলো ছোট ছোট বাচ্চা একটু দূরত্ব বজায় রেখে দেখতে লাগল আমাদেরকে। আমরা এসেছি বলে একটু জোর করেই যেন খেলতে খেলতে আমাদের সামনে এসে পড়ছিল। তাদের মাঝে একটা ছোট মেয়ে, তার কথা বিশেষভাবে মনে আছে। চোখগুলো খুব বড় বড় আর সুন্দর, একটা পায়জামা পড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, পায়জামার কোমরের অংশে নানান সম্পত্তি গুঁজে রাখা আছে আর তেলবিহীন চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। চেহারাটার দিকে তাকিয়ে কেন যেন খুব মায়া লাগল। সে আর তার বন্ধুরা একসাথে খেলছিল। মেয়েটার নাম জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বেশ পরিষ্কার ভাবেই বলেছিল নামটা। কিন্তু এখন মনে পড়ছে না। নামটা সম্ভবত 'ন' দিয়ে ছিল। তার কথা বিশেষভাবে মনে আছে একারণে যে তার চোখদুটো বড় অদ্ভুত ছিল।
হুঁ, নামটা মনে পড়েছে। নাজিফা। 'জ' টা বেশ পরিষ্কারভাবে জোর দিয়েই উচ্চারণ করেছিল সে।
ঘোরাঘুরি শেষে মসজিদে এলাম।
ওহ হো, ভালো কথা, এর আগে, ঘুরতে বেরোবার আগে গোসল করেছিলাম। লাদেনের বউকে বললাম একটা রুম খুলে দিতে, বাথরুমে যেয়ে গোসল করে আসি। নানাজী আবার এখানে বাথরুমগুলো মডার্ণ ফিটিংস দিয়ে সাজিয়েছেন। ঢাকার অনেক জায়গার চেয়ে ভালো, ঐ এলাকা হিসেবে তো ভালোই!
লাদেনের বউ আমাকে প্রস্তাব করল যে সে চাপকল থেকে পানি তুলে দেবে বালতিতে, আর আমাকে গামছা এনে দেবে, আমি ঐ কলপাড়ে গোসল করব।
অসম্ভব! মনে মনে ভাবলাম। বাইরে দিয়ে হেসে বললাম, গামছা লাগবে না, আমার রুমাল আছে, আপনি খালি রুমটা খুলে দেন।
-'ওমা, তুই ল্যাংটা হয়ে লাবু(নাইবে)? আমি ফুকচি(উঁকি) পেরে দ্যাকপো(দেখব)।'
আমি যে কী বলব ভেবে পেলাম না। রুম খুলে দেবার পর বাথরুমে যেয়ে দেখি মাকড়সার জালে ভরে আছে। এখানে এসে অবধি যে বাথরুমেই যাচ্ছি, সবগুলোরই এই অবস্থা। এগুলো আমাদের জন্য রিজার্ভ করে রাখা হয়।
আমি সাধারণত মসজিদে যাই না। সেদিন জুমার নামাজ পড়লাম। খুতবাও শুনলাম। তবে, নানাজীর খুতবা অন্যান্যদের মত না। ওরকম সুর করা নয়। He spoke to the people.
নামাজ শেষে আবার 'পা.ত.' তে।




সদর গোরস্তানে
বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে মেঝ মামার রুমে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ফ্যানের নিচে থেকেও প্রচণ্ড গরমে ঘামছিলাম। আর- বড় আর মেঝ মামার ক্লাস ৪-৫ পড়ুয়া মেয়ে দুটি আমার ঘুমে বিরক্ত করছিল- 'এত ঘুমান কেন?' ইত্যাদি।
একটু পর উঠে পড়লাম। তখন বুঝলাম, কেন এত বিরক্ত করছিল- তারা কাগজ নিয়ে এসেছে, তাদের কার্টুন এঁকে দিতে হবে।
জীববিজ্ঞানের নানান গাছপালা আর পশুপাখি আর নানান জনুক্রমের চিত্র ছাড়া শেষ কবে 'কার্টুন' বা 'গ্রামের দৃশ্য' এঁকেছি, মনে পড়ে না। কী আর করব, ওদের এঁকে দেখালাম আমার বানানো ওয়াল ক্লকটা কেমন, কিংবা শেড ল্যাম্প, ইত্যাদি অথবা আর্কিটেকচারের স্টুডেন্টরা কীভাবে শোলা দিয়ে মডেল বানায়, এইসব।
হঠাৎ আম্মু ডাকলেন, নানীর কবর জিয়ারত করতে যাওয়ার জন্য। আমরা অনেকেই গেলাম। বড় মামা, মামী, তার ছোট মেয়ে, মেঝ মামার মেয়ে, আমি, আম্মু, ছোট মামা, আমার এক খালা.....।
আমি অবাক হলাম। এইতো, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এখানে এসেছিলাম, নানাজীর সাথে। তখন কোনভাবে চোখের পানি ঠেকাতে পারিনি, বয়সে ছোট কাজিনরা তাই দেখে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল; আর এবার কী যেন এক এসে আমার মনটাকে বাজখাঁই করে দিল! মাটির উঁচু ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু ভাবলাম বটে, তবে কাঁদলাম না। অসাড় এক অনুভুতি হতে লাগল.....


জ্যোতিষবিদ্যার আসর
এত বিখ্যাত জ্যোতিষী আমি(!), আর জ্যোতিষবিদ্যার আসর না বসালে কি চলে! সেদিন রাতেই বড় মামার ড্রয়িং রুমে জ্যোতিষবিদ্যার আসর বসালাম। রাতে তো বারোটা-একটার আগে ঘুমাই না। ওখানে কিন্তু দশটা-ই বেশ রাত, সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। আমার ঘুম পাচ্ছিল না বলে নিচতলায় নেমে এসে আড্ডাবাজি করতে লাগলাম। বড় মামার দুই ছেলে, দুই মেয়ে, মামী, মেঝ মামার মেয়ে আর মামী আর আমি! কথায় কথায় জ্যোতিষবিদ্যার কথা। ৬ সংখ্যা, ৩ সংখ্যা, ৮, ৯, ২, ১, ৪..... এসবের বৈশিষ্ট্য বলতে লাগলাম। তারপর আবার দু-একটা ঘটনা বললাম, আমার ভবিষ্যৎবাণী মিলে যাবার ব্যাপারে। প্রত্যেকেই নিজের সংখ্যার ব্যাপারে জানতে চায়, হাত দেখাতে চায়।
বাসে একবার পেছন থেকে এক লোকের বুড়ো আঙুল দেখে করা ভবিষ্যৎবাণী মিলে যাবার ঘটনা বলতেই মেঝ মামী সাথে সাথে তার বুড়ো আঙুল আমার সামনে বাগিয়ে ধরলেন। আর সবার সেকী হাসাহাসি!
কোন মাসে কোন রাশি, কোন সংখ্যার গ্রহ কোনটা, কোন গ্রহের বৈশিষ্ট্য কী, এইসব বলতে বলতে ঘন্টা পেরিয়ে গেল। ছোটমানুষদের কথা বেশি মজার। মেঝ মামার ক্লাস ফাইভ পড়ুয়া মেয়ে বলছে- 'আচ্ছা, আমার জীবন সুখী না দুঃখী হবে?' কী সরল প্রশ্ন। এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে টিয়া জ্যোতিষীদের কাছে যেতে হবে- ভাবলাম।
-"হুম, তোমার হাতে একটা জিনিস দেখলাম, সেটা সবার সামনে বলা যাবে না।"
-"আচ্ছা, তুলা রাশির বৈশিষ্ট্য কী?"
-"২৯ মার্চ হলে কোন সংখ্যা হবে?"
-"হাতের বুড়ো আঙুল খুব ইমপরট্যান্ট জিনিস। এটা দেখে অনেক কিছু বলা যায়।"
-"বৃহস্পতি কিছুটা অহংকারী।"
-"রাশিচক্রের মাঝে....."




'টিকটিকির' গল্প
নানাজীর গাড়ির ড্রাইভার ছিল অসুস্থ। সে-ও আমাদের সাথে গিয়েছিল। আমরা গিয়েছিলাম অফিসের গাড়িতে।
জা.পু.তে পৌঁছতেই ড্রাইভার জানাল, স.ব. বসে আছে সেখানে। কিন্তু আমাদের খেয়াল করেনি। Maybe they were expecting a white car, not a colorful pajero. কিন্তু পা.ত.তে পৌঁছেই দেখি হাজির।
বেচারাদের মানুষ কত অসম্মান করে!
শুক্রবার দুপুরে জা.পু.তে ছিলাম অনেক্ষণ। আমরা বৈঠকখানায় বসে গল্প-গুজব করছিলাম। একজন এসে জানালায় উঁকি দিল। নানাজী জিজ্ঞাসা করলেন- "ও কে?"
-"আমি স.ব. এর লোক স্যার।"
-"ভয় নাই, আমরা হারাবো না।"
-"লজ্জা দেবেন না স্যার।"
আম্মুর সাথে রাস্তার অপর পাড়ে যেতে দেখলাম, বেচারাগুলো গাড়িতে বসে দরজা খুলে ঘুমাচ্ছে। প্রচণ্ড গরম। দেখে করুণা হল।
শনিবার ঢাকায় ফিরবার পথে আমরা প্রথমে জা.পু.তে থামলাম একটা বৈঠকের জন্য। ওরা পিছে পিছে হাজির। আমরা রুটি খেলাম। ডিম ভাজি, আলু ভাজি আর রাজভোগ দিয়ে। ওরা শুকনো মুখে গাড়িতেই বসে থাকল। আমি আবার বাগানে ঘুরে ঘুরে আমার মাল্টিপারপাস টুল এর কেচি দিয়ে কেটে নানান জিনিস সংগ্রহ করে ফুলের তোড়া বানালাম। আমার এই মাল্টিপারপাস টুল (সুইস নাইফ) সবার মাঝে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। মেজাপু ইন্ডিয়া থেকে এনে দিয়েছিল জিনিসটা।
যাই হোক, আমরা রওয়ানা দিলাম। মামা, নানাজী, আম্মু- সবাই ঘুমাচ্ছে। আমার একটু ঘুম পাচ্ছিল না। গাড়ির সাইড ভিউ মিররে তাকিয়ে ছিলাম। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সব আসছে। অনেকদূর পেছন পেছন এল। ওদের এরিয়া শেষে সামনে খবর পাস করে দিল। আরও অনেকদূর যাবার পর একজনকে দেখি গাড়ির দরজা খুলে মেশিন হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কী যেন ভাবছিল সে। আমাদের গাড়ির নম্বর প্লেট দেখে কিছুটা যেন হতবিহ্বল হয়ে গেল। সেকেন্ড খানেক কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভঙ্গিতে দাঁত বের করে হেসে লাফিয়ে গাড়িতে ঢুকল।
মেশিন টিপল নিশ্চয়।
আরও অনেকদূর গেলে একজন আবার সালাম দিল।
স.ব.দের কান্ডকারখানা এইরকম।
অনেকেই বিরক্ত হয়। কেউবা হয় রাগান্বিত। আমার কোন অনুভুতি হয় না। কেমন এক নির্লিপ্ততা এসে ভর করে। গাড়ির দুলুনিতে ঘুম আসে। আবার তাকালে দেখা যায় সাদা একটা কিছু। সমান দূরত্ব বজায় রেখে আসছে। হাটে থামলে পরে আবার স্টার্ট করে দেখলাম সামনে গিয়ে বসে আছে। এইতো, এইরকমই।
আধো-ঘুম আধো-জাগো অবস্থায় হঠাৎ শোয়ার্জনেগারের একটা মুভির কথা মনে হয়। সেখানে এইজাতীয় একটা ব্যাপার ছিল। ভয়ঙ্কর এক অস্ত্র দিয়ে গাড়িতে দাঁড়িয়ে আরেক গাড়িকে ফায়ার করে একটা মেয়ে নিজেই উল্টে পড়ে- পশ্চাৎবেগের কারণে।
আবার বিবিসির টিভি সিরিজ মারলিনের কথা মনে হয়। শুধু চোখ দিয়ে তাকিয়ে সে অনেক জাদু করে।
যদি তেমন জাদু পারতাম!


কী যেন এক রিসর্টে
নামটা মনে নেই। সাধারণত যাত্রাবিরতিতে আমরা ওখানে যাই না, এবার থামলাম। আমি কখনো এত সুপার ফাস্ট সার্ভিস দেখি নাই। আমরা বসার পর এক ওয়েইটার এসে ফ্যান অন করে দিল(বিদ্যুৎ বাঁচাচ্ছিল এতক্ষণ), এসি দুইটা সম্ভবত ডামি(!)। সে প্রথমেই স্যার সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করল, আমরা চিকেন ফ্রাই, অমুক, তমুক ইত্যাদির কোনটা খাব। সবাই ন্যুডলস নিল, আমি একটা বার্গারের জন্য বললাম। কয়েক মিনিট পর একটা মামের বোতল দিয়ে গেল। তারও বেশ কয়েক মিনিট পরে ৫টা মিনিপ্যাক প্রাণ টমেটো সস।
ভালো কথা।
আমরা ওয়েইট করছি। ওয়েইট করছি। ওয়েইট করছি তো করছিই। ন্যুডলস আর আসে না। আসে না বার্গারও।
প্রায় সাত আট মিনিট পর বা তারও বেশি সময় পরে লোকটা এল। ঢুকতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা লাগিয়ে প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল ন্যুডলস এর ট্রে। তারপর রাজার হালে এসে দয়া করে টেবিলে রাখল খাবারগুলো।
মামা ন্যুডলসের ডিম দেখে অপছন্দ করে একটা বার্গার চাইলেন।
এল বটে বার্গার। কিন্তু ততক্ষণে আমার ধীরগতির খাওয়াতেও বার্গার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ড্রাইভার সাহেব একটা বার্গার চাইলে সে জমিদার স্টাইলে বলল- আর হবে না। পনরোটা অর্ডার আছে।
মনে মনে ভাবলাম, এরা মনে হয় প্রতিটা জিনিস বানাবার সময় সরাসরি জমি থেকে হার্ভেস্ট করে আনে!
ঢোকার সময় দেখেছিলাম একটা টেবিলে বোর্ডে করে বড় করে লিখে রেখেছে- "Comment Here.", ভাবলাম যাবার সময় লিখে দিয়ে যাব- জীবনে আর আসব না। গিয়ে দেখি ডায়েরী রেখেছে বটে একটা, তবে কোন কলম রাখেনি।
বড় ভালো লাগল এদের সব সার্ভিসে। শাবাস দেবার মত(!)।


ভালোবাসার গল্প
শনিবার সকালে জা.পু.র বৈঠক শেষে রওয়ানা করে খানিকদূর এগিয়েছি, দেখলাম বয়স্ক এক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। গাড়ি ব্রেক করে কিছুদূর এগিয়ে গেল, উনিও দৌড়ে এলেন। নানাজী গ্লাস নামিয়ে হ্যান্ডশেইক করে তার সাথে কথা বললেন। উনি একঘন্টা ঐ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন শুধু নানাজীর সাথে দেখা করার জন্য!
প্রথমে গিয়েছিলেন পা.ত.তে। সেখানে শুনলেন যে কেবলই জা.পু.র উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেছি আমরা। তাই তিনি জা.পু. ছাড়িয়ে সামনের হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে ছিলেন নানাজীকে একনজর দেখার জন্য, কারণ জানতেন যে এই রাস্তা দিয়েই আমরা যাব।
এই না হলে ভালোবাসা!
আবার, হাটে থেমেছি, এক লোক এসে খানিক দাঁড়িয়ে থাকল- "আপনেক একটু দেখি।"
সে দাঁড়িয়ে খানিক সময় নানাজীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকল।






এমনি সব ভালোবাসার গল্প.....


হবে, আরেকদিন সব গল্প হবে।
আজ এ পর্যন্তই থাক।




নূরে আলম
৯ অগাস্ট, ২০১০

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…