সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঐশী গ্রন্থ চেনার উপায় : কুরআনের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য

ঐশী গ্রন্থ চেনার উপায় ও কুরআনের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করার আগে মানুষের চিরন্তন অপূর্ণতা সংক্রান্ত দর্শনের উপর কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন।

মানুষের সকল ধর্মচিন্তার মূলে রয়েছে উৎসের সন্ধান। এমনকি ছোট একটি বাচ্চাও কোনো শব্দ শুনলে সেই শব্দের উৎসের সন্ধান করে : শব্দের দিকে মুখ ফিরিয়ে খুঁজতে থাকে – কোথা থেকে শব্দটা এলো ? ঘরের মাঝে অচেনা কোনো জিনিস দেখলে সোৎসাহে সেটার দিকে ছুটে যায়, জিনিসটা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে : ভাবে – কোথা থেকে এলো এই অদ্ভুত জিনিস ? আরো বড় হবার পর জীবনের একটা সময়ে মানুষের মাঝে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা আসে। নিজের উৎসের সন্ধান করতে করতে মানুষ চিন্তা করে যে, দুনিয়ার প্রথম মা'কে কে সৃষ্টি করেছিলো ? পৃথিবীর প্রথম মানুষটির সৃষ্টি হয়েছিলো কিভাবে ?
এই উৎসের সন্ধান মানুষের নিতান্তই মৌলিক চাহিদা। প্রতিদিনকার খাওয়া দাওয়ার চাহিদা পূরণ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মাঝে নিজের উৎসকে জানার চাহিদা বিদ্যমান থাকে। এমনকি দুনিয়ার আরাম-আয়েস, সুখ-শান্তি ইত্যাদি সকল কিছু পাবার পরও দিনশেষে মানুষ অতৃপ্ত থেকে যায়। নিজের উৎস সম্পর্কে না জানা পর্যন্ত সে তৃপ্ত হয় না। ঠিক যেভাবে নিজের পিতৃপরিচয় না জানা একজন মানুষ আজীবন অতৃপ্ত থেকে যায়; সর্বদা নিজের পিতাকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করে ! অনুরূপভাবে যেকোনো মানুষের মাঝেই তার আদি পিতার সম্পর্কে জানার চাহিদা বিদ্যমান থেকেই যায়, এমনকি দুনিয়ার সকল কিছু পেয়ে যাওয়া সত্ত্বেও। অর্থাৎ, দিনশেষে মানুষ অপূর্ণ-ই থেকে যায়। দিনশেষে সে অতৃপ্ত। সে অনেক কিছুই জানে না। এই অপূর্ণতা মানুষকে কষ্ট দেয়, অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, অতৃপ্ত করে রাখে সবসময়। সে যেনো স্বাধীন নয়। জ্ঞান অর্জনের চিরন্তন চাহিদার কাছে সে বাঁধা পড়ে আছে। এই চাহিদা পূরণে কেউবা দূরদেশে চলে যাচ্ছে, কেউবা বন-জঙ্গলে গিয়ে ধ্যান করছে, কেউবা আবার বিভিন্ন মানুষের শরণাপন্ন হচ্ছে তার প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য। এভাবে মানুষের মুখাপেক্ষীতা শেষ হয় না। এমনকি পাশের লোকটির মনের কথাও মানুষ জানে না – এই অতৃপ্তি পূরণের জন্যেও সে কত প্রচেষ্টা-ই না করে ! নিশ্চিতই, যদি মানুষের সকল বিষয়ের জ্ঞান থাকতো, তবে এই অতৃপ্তি দূর হয়ে যেতো।

নিজের উৎসের সন্ধান, আদিপিতার সন্ধান, পৃথিবীর উৎসের সন্ধান, সৃষ্টিজগতের উৎস ও সৃষ্টিরহস্য ইত্যাদি জানার চিরন্তন চাহিদা থেকে মানুষ তার বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে সর্বশক্তিমান সদা জ্ঞানী এক আল্লাহর ধারণায় উপনীত হয়। কিন্তু এতে তার অতৃপ্তি তো পূরণ হয়-ই না, বরং এক আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে নিজের অপূর্ণতাকে আরো বেশি করে অনুভব করতে থাকে। একইসাথে তার সকল অতৃপ্তি ও চাহিদা পূরণের জন্যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ঐশী গ্রন্থের ধারণা কখন আসে ?

এক আল্লাহর ধারণায় উপনীত ব্যক্তি তার জ্ঞানার্জনের চাহিদা পূরণের জন্য ক্রমেই স্রষ্টার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে, এবং এক পর্যায়ে ঐশী গ্রন্থ বা ঐশী বাণীর সন্ধান শুরু করে।
সামাজিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ নানারকম ভুল করে বসে, পরবর্তীতে অনুতাপ তাকে গ্রাস করে। বারবার ভুল করে অনুতপ্ত ক্লান্ত মানব-মন আশা করে : কেউ যদি আমাকে ভুলগুলো থেকে রক্ষা করতো ! কেউ যদি আমাকে সতর্ক করতো, একটু পথ দেখিয়ে দিতো ! হায় তাহলে আজ আমার এই দুরবস্থা হতো না।
সামাজিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে উদ্ভুত নিত্য-নতুন চাহিদা, জ্ঞানার্জনের চিরন্তন চাহিদা, এছাড়াও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করার আত্মিক চাহিদা ইত্যাদি মানুষকে বাধ্য করে ঐশী বাণীর সন্ধান করতে। সে আশা করে যে, স্রষ্টার কাছ থেকে একবারে সকল জ্ঞান নিয়ে পরিতৃপ্ত হবে।

ঐশী গ্রন্থ চেনার উপায়

বেশিরভাগ মানুষই জন্মসূত্রে কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকে। সকলেই দাবী করে যে তাদের ধর্মগ্রন্থটিই ঐশী বাণী, এক আল্লাহর কথা। তাই নিরপেক্ষভাবে স্রষ্টার গ্রন্থ শনাক্ত করতে গিয়ে মানুষ প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখীন হয়, তা হলো : পরস্পরবিরোধী একাধিক গ্রন্থ, যার অনুসারীরা ঐ গ্রন্থগুলোকে ঐশী বাণী বলে দাবী করছে। এমতাবস্থায় মানুষ কী করবে ? হ্যাঁ, সে যে কাজটি করতে পারে তা হলো স্রষ্টার গ্রন্থ বলে পরিচিত কুরআন, বাইবেল ইত্যাদি গ্রন্থ নিয়ে পুরোটা পড়ে দেখতে পারে। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব যে, যে কেউ একটা বই এনে বলবে যে এটাই ঐশী বাণী, আর ওমনি আমি তা পড়তে শুরু করে দেবো ! দুনিয়ার যে প্রান্তে যে কেউ-ই দাবী করবে যে তার কাছে ঐশী গ্রন্থ আছে, আর আমি সেখানেই ছুটে যাবো সেই গ্রন্থ পড়ার জন্য – এটা কী করে সম্ভব ! তারপর যদি দেখি সেটা ছিলো পুরোটাই প্রতারণা !
মহান আল্লাহ তায়ালা, যাঁর প্রতি আমি সর্বাবস্থায় সার্বিকভাবে মুখাপেক্ষী, সেই মহান আল্লাহ কি তাঁর ঐশী গ্রন্থ হাতে পাওয়াটাকে এতই কঠিন করে রেখেছেন !
এধরণের কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে হলে এবং সঠিকভাবে সত্যিকারের ঐশী বিধানের কাছে উপনীত হতে হলে আমাদের আগে চিন্তা করা প্রয়োজন। সময় নিয়ে ভেবে দেখা উচিত : ঐশী বিধান কী ? ঐশী বিধানের বৈশিষ্ট্য কী ? কমপক্ষে কী কী বৈশিষ্ট্য খোদার বিধানে থাকতেই হবে, ইত্যাদি।

বিষয়টা আরো সহজ হতো যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত পথনির্দেশক বাণীবাহক কোনো নবী আমাদের মাঝে এসে ঐশী বাণী প্রচার করতেন। তখন নবী চেনার উপায় নিয়ে চিন্তা করে তারপর সত্যিকারের নবীকে চিনে নিয়ে তাঁর মাধ্যমে আমরা স্রষ্টার কাছে উপনীত হতে পারতাম। কিন্তু যেহেতু সেটা পাওয়া যাচ্ছে না, সুতরাং একটু কষ্ট করে আমাদেরকে ঐশী গ্রন্থ নিয়ে চিন্তা করতেই হবে। নিজের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দানের জন্য স্রষ্টার কাছে উপনীত হতে হলে, অতৃপ্তির কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে হলে, সর্বোপরি সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পন করে প্রশান্তি লাভ করতে হলে আমাদের ভাবতেই হবে ঐশী বাণী নিয়ে। ঐশী বাণী বলে পরিচিত গ্রন্থ হাতে তুলে নেয়ার আগে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে চিন্তা করতে হবে : ঐশী গ্রন্থের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য কী কী ? অতঃপর সেই অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যগুলো যেই গ্রন্থের সাথে মিলে যাবে, সেটাকেই আমরা আল্লাহর বিধান বলে চিনে নিতে পারবো।

ঐশী গ্রন্থের অপরিহার্য় বৈশিষ্ট্য

সবরকম প্রভাবমুক্ত হয়ে মুক্ত মনে কোনো ব্যক্তি যদি নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে ঐশী গ্রন্থের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে চিন্তা করে, তবে সে অবশ্যই কমপক্ষে নিচের কয়েকটি বিষয়কে ঐশী গ্রন্থের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করবে।

এক. সর্বজনীন গ্রন্থ।
ঐশী গ্রন্থকে অবশ্যই সর্বজনীন হতে হবে। অর্থাৎ, সেটা হতে হবে গোটা বিশ্ববাসীর জন্য, সকল মানুষের জন্য। কারণ জ্ঞানার্জনের ও অতৃপ্তি পূরণের যেই চিরন্তন চাহিদা থেকে আমরা ঐশী বিধানের সন্ধান করছি, তা কেবল আমাদের চাহিদা নয়, বরং গোটা মানবজাতির চাহিদা। প্রতিটা মানুষই স্রষ্টার পক্ষ থেকে পথনির্দেশের মুখাপেক্ষী। সুতরাং, এটা কখনোই সম্ভব না যে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর ঐশী বিধান কেবল দুই-দশজন মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন, আর ওদিকে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হবে ! কিংবা সেই গ্রন্থটি এতটাই জটিল ও দুর্বোধ্য হবে যে কেবলমাত্র দুনিয়ার কয়েকজন বড় বড় পণ্ডিত ব্যক্তি ছাড়া আর কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না ! এটা হতেই পারে না। সুতরাং, ঐশী গ্রন্থকে অবশ্যই সর্বজনীন হতে হবে। আল্লাহর গ্রন্থ হবে একজন কৃষকের জন্যেও পথনির্দেশ, একজন পদার্থবিজ্ঞানীর জন্যেও পথনির্দেশ। কারণ মানুষ ঐশী বিধানের সন্ধান করছেই তার চিরন্তন চাহিদা পূরণের জন্য। আর চিরন্তন চাহিদা নিশ্চয়ই ডাক্তার, কৃষক ইত্যাদিভেদে বিভিন্ন হয় না। সুতরাং, এমনটা হবে না যে ঐশী বিধান একজন ডাক্তারের কাছে খুবই আগ্রহোদ্দীপক গ্রন্থ হবে, ওদিকে একজন সুইপারের কাছে তা নিতান্তই নিরস ও বিরক্তিকর মনে হবে। কোনো সুইপার এসে এমন অভিযোগ করবে না যে, ঐশী বিধানতো পড়লাম, কিন্তু সেখানে খালি স্রষ্টার গুণকীর্তন আর মানুষের জন্মরহস্য ইত্যাদি ডাক্তারি কথাবার্তা লেখা, অথচ আমার স্ত্রীর সাথে আমার দ্বন্দ্বের সমাধান নিয়ে কিচ্ছু বলা নেই। এমনটি ঐশী বিধানের বৈশিষ্ট্যের বিপরীত। অর্থাৎ, ঐশী বিধান হতে হবে সত্যিকার অর্থেই সর্বজনীন ও জনহিতকর। এর অনুসরণে মানুষের উপকার-ই হবে, ক্ষতি হবে না। এর অনুসরণে মানুষ অশান্ত হবে না, বরং তার অতৃপ্তি পূরণ হবে।
অতএব, ঐশী বিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারার ক্ষমতা। মানুষ তার মৃত্যু পর্যন্ত বারবার এই গ্রন্থের কাছে ফিরে আসবে, এবং পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত মানুষ এই গ্রন্থের মুখাপেক্ষী হতেই থাকবে। ঐশী বিধান মানুষের চাহিদা পূরণ করেই চলবে অবিরতভাবে।

দুই. অপরিবর্তিত ও অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ।
স্রষ্টার গ্রন্থকে অবশ্যই অপরিবর্তিত ও অপরিবর্তনীয় হতে হবে। এটা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে, স্রষ্টার গ্রন্থে যদি মানুষের লেখা দুই-চারটা বাক্য ঢুকানো-ই যাবে, কিংবা এমনকি একটি শব্দও – তাহলেই তো সেটা আর স্রষ্টার গ্রন্থ থাকবে না। সেটা হয়ে যাবে মানুষ ও স্রষ্টার যৌথভাবে লিখিত গ্রন্থ। এটা তো একেবারেই অসম্ভব যে মহান আল্লাহ পাক তাঁর গ্রন্থকে বিকৃত হবার সুযোগ দেবেন ! বরং এটাই যুক্তিসঙ্গত যে, আল্লাহর বিধান সর্বদা অপরিবর্তিত ও অবিকৃত থাকবে। এমনকি মানুষ শত চেষ্টা করলেও আল্লাহর বিধানকে বিকৃত করতে পারবে না, সেই গ্রন্থে নিজের লেখা কথা ঢুকাতে পারবে না।
অতএব, ঐশী গ্রন্থ শনাক্ত করতে গেলে আগে দেখতে হবে : যে বইটাকে স্রষ্টার বাণী বলে দাবী করা হচ্ছে, সেটি কি সত্যিই অপরিবর্তিত আছে ? কোন সে বিস্ময়কর উপায়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের শত প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তাঁর মহান গ্রন্থকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করে চলেছেন !

তিন. আইন গ্রন্থ।
সামাজিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে মানুষের যেসব চাহিদার উদ্ভব ঘটে, সেগুলো পূরণের ক্ষমতা অবশ্যই স্রষ্টার গ্রন্থের থাকতে হবে। আর যেসকল চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে মানুষের এই ঐশী গ্রন্থের সন্ধান করা, সেসব চাহিদার মাঝে অন্যতম হলো সামাজিক সমস্যাবলীর সমাধান। স্রষ্টার গ্রন্থ যদি কেবল আল্লাহরই গুণকীর্তকন করে চললো, ওদিকে দুনিয়ার অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে কিছু বললো না, কোনো শাস্তির বিধান জারি করলো না – তবে মানুষের চাহিদা আর পূরণ হলো কই !
সুতরাং, সামাজিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে মানুষের নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে যে আইন প্রয়োজন হয়, সেই আইন অবশ্যই ঐশী বিধানে থাকতে হবে। আল্লাহর বাণীকে হতে হবে একটি আইন গ্রন্থ। মানুষের জন্যে আইনের উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে ঐশী বিধানকেই।

চার. স্রষ্টার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা।
মানুষ তখনই ঐশী বিধানের সন্ধান করে, যখন সে এক আল্লাহর সম্পর্কে ন্যুনতম পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করেছে। নইলে ঐশী বিধানের যে চাহিদা, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা হলো স্রষ্টাকে জানার চাহিদা। নিজের উৎস না জানার যে কষ্ট, তার সাথে আর কোনো কিছুই তুলনীয় নয় ! তাই চিন্তাশীল মানুষ সর্বাগ্রে তার স্রষ্টাকে সন্ধান করে, অতঃপর আল্লাহর বিধান সন্ধানে ব্যাপৃত হয়।
সৃষ্টি-উৎস আল্লাহ তায়ালাকে সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর যেসব গুণাবলী সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে, অবশ্যই সেগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গুণাবলী বিবৃত থাকতে হবে ঐশী গ্রন্থে। ঐশী গ্রন্থে যদি আল্লাহকে অন্যায়কারী, অন্যায়ের নির্দেশ দানকারী, অবিচারকারী – ইত্যাদি নেগেটিভ গুণের এক সত্ত্বা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে অবশ্যই সেটা ঐশী বিধান হবে না। বরং সেটা হবে আল্লাহদ্রোহী কোনো এক গ্রন্থ।

পাঁচ. সময় ও প্রযুক্তির উর্ধ্বে (time and technology independent)
ঐশী বিধানকে অবশ্যই হতে হবে সময় ও প্রযুক্তির উর্ধ্বে (time and technology independent)। যেমন, ঐশী বিধান যদি কাগজের উপর নির্ভরশীল হয়, তবে একদিন যদি প্রকাণ্ড এক অগ্নিকাণ্ডে দুনিয়ার সকল কাগজ পুড়ে যায়, কিংবা কালের বিবর্তনের কাগজের ব্যবহার শেষ হয়ে যায়, তবে ঐশী বিধানও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে বিধান বিলুপ্ত হয়ে যায়, তা তো ঐশী বিধান নয় ! সুতরাং, ঐশী বিধানের সংরক্ষণ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া চলবে না। বরং ঐশী বিধানকে এমন উপায়ে সংরক্ষিত হতে হবে, যেনো পৃথিবীতে একজন মানুষও বেঁচে থাকলে ঐশী বিধান অস্তিত্বমান থাকে। অর্থাৎ, ঐশী গ্রন্থের সংরক্ষণ হবে প্রযুক্তির উর্ধ্বে, টেকনোলজি ইনডিপেন্ডেন্ট।
একইসাথে তাকে হতে হবে সময়ের উর্ধ্বে। ঐশী গ্রন্থের কোনো বিধান এমন হবে না যে, তা কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোত্র, এলাকা কিংবা কালের জনপদের জন্য প্রযোজ্য। ঐশী গ্রন্থের আইনসমূহ কালের বিবর্তনে অকার্যকর হবে না কখনোই। মানুষের প্রযুক্তি, সভ্যতা ইত্যাদির উত্থান-পতন সত্ত্বেও ঐশী গ্রন্থের আইনসমূহ সংরক্ষিত ও বলবৎ থাকবে। মানুষের ইতিহাসে এমনটা ঘটবে না যে ঐশী গ্রন্থের ওমুক বিধানটা রহিত হয়ে গিয়েছে, কারণ সেটা কেবল ওমুক যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য ছিলো। বরং ঐশী বিধানকে হতে হবে অপরিবর্তনীয় ও কালের উর্ধ্ব (independent of time)

আসলে, “আইন” হলো এমন এক জিনিস, যা স্থির থাকে, পরিবর্তিত হয় না। প্রকৃত আইন কেবলমাত্র স্রষ্টার গ্রন্থেই থাকতে পারে। সেটাই পরম আইন। আইনের নামে মানুষ যেসব গ্রন্থ রচনা করে, সেগুলোর কিছুটা আজকে বদলে দেয় তো আগামীকাল বদলে দেয়ে আরেক অংশ। যখন যেমনটা ইচ্ছা হয় মানুষ সেটাকেই আইন বলে ঘোষণা করে নিজের সুবিধা হাসিলের জন্য। ক্ষণে ক্ষণে বদলানো এসব মানব রচিত “আইন” প্রকৃত অর্থে কোনো আইন-ই নয় ! বরং আইন তা-, যা হলো পরম (absolute)। যা সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় না। যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে বদলে যায় না। প্রকৃত অর্থে সেটাই আইন, যা কালের বিবর্তনে অপরিবর্তিত ও সংরক্ষিত থেকে যায়। প্রকৃত আইন কেবল স্রষ্টার গ্রন্থেই থাকা সম্ভব। ঐশী বিধানই আইনের পরম ও প্রকৃত উৎস। এর কোনো আইন বদলানো সম্ভব নয়, এবং কালের বিবর্তনে এর কোনো আইন রহিত-ও হয়ে যায় না।

ছয়. অন্যান্য কিছু শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য।
ঐশী বিধানের অন্যান্য কিছু শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য আছে, যার বিস্তারিত আলোচনা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন, ঐশী বিধানকে অবশ্যই কমপক্ষে এটুকু দাবী করতে হবে যে সে স্রষ্টার গ্রন্থ। যে নিজেকে ঐশী বিধান বলে দাবী-ই করবে না, তাকে নিয়ে আমরা কেনো চিন্তা করবো যে সে ঐশী গ্রন্থ কিনা ? সুতরাং, ঐশী গ্রন্থকে অবশ্যই সুস্পষ্ট ভাষায় দাবী করতে হবে যে সে স্রষ্টার গ্রন্থ।
ঐশী গ্রন্থ নিশ্চয়ই অন্ধ বিশ্বাস পরিহার করতে বলবে। বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে বলবে। কারণ অন্ধ বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকলে আমরা হয়তো আজকে একাধিক স্রষ্টায় বিশ্বাসী মূর্তিপূজারী হতাম। কিন্তু বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেছি বলেই সৃষ্টি-উৎস হিসেবে এক আল্লাহকে চিনে নিয়েছি। তা না করে অন্ধ অনুসরণ করলে আমরা এ পর্যায়ে উপনীত হতে পারতাম না। অন্ধ বিশ্বাস, অহংকার, অযৌক্তিক আবেগ – ইত্যাদি সবই সত্য গ্রহণের পথে অন্তরায়। আমরা সেগুলোকে ত্যাগ করতে পেরেছি বলেই এক আল্লাহকে আমাদের উৎস হিসেবে চিনে নিয়েছি, অতঃপর তাঁরই মুখাপেক্ষী হয়েছি এবং তাঁরই প্রেরিত গ্রন্থ শনাক্ত করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। অপরপক্ষে, আমরা যদি বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করতাম, চিন্তাশীল না হতাম, তাহলে “আমার বাবা বলেছেন স্রষ্টা একাধিক, তাই আমিও মনে করি স্রষ্টা একাধিক”; কিংবা “পিতা বলেছেন বাইবেল স্রষ্টার গ্রন্থ, তাই আমিও বলি বাইবেল স্রষ্টার গ্রন্থ” – ইত্যাদি অন্ধ বিশ্বাসকে আমরা আঁকড়ে ধরে থাকতাম, এবং কখনোই সত্যে উপনীত হতে পারতাম না। অতএব, যেই অন্ধ বিশ্বাস হলো সত্য গ্রহণের পথে অন্তরায়, স্রষ্টা নিশ্চয়ই সেই অন্ধ বিশ্বাস, অন্ধ অনুকরণ ইত্যাদিকে ত্যাগ করে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে সত্য গ্রহণের দিকে আহবান জানাবেন।

এছাড়াও, মানুষের সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ইত্যাদি চাহিদা পুরণ ছাড়াও ঐশী বিধানকে হতে হবে মানুষের আত্মিক-আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের উৎস। হতে হবে মহান আল্লাহ তায়ালাকে আরো ভালোভাবে জানার উপায়। ঐশী গ্রন্থকে হতে হবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন করে প্রশান্তি লাভের উপায়।

ঐশী গ্রন্থ : আল কুরআন

মুক্ত মনে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যেম ঐশী বিধানের যেসকল অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা যায়, একমাত্র আল কুরআন-ই সেই গ্রন্থ, যা ঐসকল বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। নিচে এর কিছু রেফারেন্স দেয়া হলো।

এক. ুরআন ঘোষণা করেছে নিজের সর্বজনীনতা। মানুষের জন্য হিতকর গ্রন্থ হিসেবে দাবি করেছে নিজেকে, এবং মানুষের জন্য উপস্থাপন করেছে সার্বিক পথনির্দেশ :
আলিফ লা-ম রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি – যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন – পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।” (সূরা ইবরাহীম, ১৪:)

দুই. পৃথিবীর বুকে একমাত্র অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত ধর্মগ্রন্থ হলো আল কুরআন। একমাত্র কুরআনই সেই ধর্মগ্রন্থ, যা সংরক্ষিত আছে অ-ধ্বংসশীল মানব-মস্তিষ্কে। দুনিয়ার সকল মুদ্রিত ধর্মগ্রন্থ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও মানুষের মাঝে মানব-মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকবে একমাত্র একটি গ্রন্থ : আল কুরআন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন :
"আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।(সূরা হিজর, ১৫:)
"তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্য আপনি দ্রুত ওহী আবৃত্তি করবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব।” (সূরা আল কিয়ামাহ, ৭৫:১৬-১৭)

আল্লাহ তায়ালা এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ঐশী বাণী পাঠিয়েছেন, তাঁর সবই সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি তাওরাত কিংবা ইঞ্জিলও এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে, তবে তার বিধানগুলি অপরিবর্তিত কিংবা উন্নত আকারে কুরআন নামক গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়ে গিয়েছ, এবং এভাবেই সেগুলি সংরক্ষিত আছে। আল্লাহ বলেন :
আমি কোনো আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জানো না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান ?” (সূরা বাকারা, :১০৬)

তিন. কুরআনকে আল্লাহ করেছেন বিচারের মানদণ্ড ও আইনের উৎস :
"আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছে, তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন – যেনো তারা আপনাকে এমন কোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। … … ..." (সূরা মায়েদা, :৪৯)
ছাড়াও পরম আইনগ্রন্থ আল কুরআন অনুযায়ী যারা বিচারকার্য পরিচালনা করে না, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদা-তে বলেছেন :
“… … ...যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।” (:৪৪)
... … ...যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম।” (:৪৫)
... … ...যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই পাপাচারী।” (:৪৭)

চার. স্রষ্টার অপরিহার্য গুণাবলী নিয়ে মানুষ আজও বিতর্ক করে চলেছে, অথচ আল কুরআন চারটি বাক্যের একটিমাত্র সূরায় তাঁর মহান সত্ত্বাকে চিনিয়ে দিচ্ছেন :
() বলুন, তিনিই আল্লাহ, তিনি এক, একক,
() আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (আল্লাহুস-সামাদ),
() তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি,
() এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
আবার, সূরা বনী ইসরাঈলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্র সত্ত্বা সম্পর্কে আরো বলেছেন যে, সকল গুণবাচক নাম তাঁরই :
বলুন : আল্লাহ বলে আহবান করো কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান করো না কেনো, সব সুন্দর নাম তাঁরই। … … ...।” (১৭:১১০)

পাঁ. ময়ের সাথে সাথে কুরআনের কোনো বিধান রহিত হয়ে যায় না কিংবা কার্যকারিতা হারায় না। বরং গোটা কুরআনের সকল বিধান- মানুষকে মেনে চলতে হবে। আল্লাহ তো কুরআনের কোনো বিধানকে স্থগিত করে দেননি যে মানুষ এর কিছু অংশ মানবে আ কিছু অংশ মানবে না ! অর্থাৎ, কুরআনের বিধান মানার ক্ষেত্রে সিলেক্টিভ হওয়া চলবে না। যারা কুরআনের সিলেক্টিভ কিছু আয়াত মেনে চলে, তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা তিরস্কার করেছেন এই বলে যে :
“… … ...তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস করো এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস করো ! … … ...।” (সূরা বাকারা, :৮৫)

. কুরআন মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস ত্যাগ করে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে বলে, অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করে; যা কেবল অমুসলিম নয়, মুসলমানদের জন্যও প্রযোজ্য বটে :
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তার অনুসরণ করো’, তখন তারা বলে, ‘বরং আমরা তারই অনুসরণ করবো যার ওপর আমাদের পিতৃপুরুষদের পেয়েছি।’ তাদের পিতৃপুরুষরা যদি মোটেই বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করে থাকে এবং সঠিক পথ (হেদায়াত) প্রাপ্ত না হয়ে থাকে (তবুও কি তারা তাদের অনুসরণ করবে)? আর যারা কাফের হয়েছে (অর্থাৎ সত্য দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করেছে) তাদের উপমা হচ্ছে তার ন্যায় যাকে ডাকা হলে সে হাঁকডাক ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না (অর্থ বুঝতে পারে না); তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, সুতরাং তারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে না।” (সূরা আল-বাকারা, :১৭০-১৭১)

সাত. যুক্তিতে স্বনির্ভর এই মহাগ্রন্থ একত্ববাদের পক্ষে উপস্থাপন করেছে অনন্য এক যুক্তি, যা মানব মনকে স্তম্ভিত করে দেয় :
তারা কি কোনোকিছু (কোনো সৃষ্টি-উৎস/ সৃষ্টিকর্তা) ছাড়াই (নিজে নিজেই/ শূন্য থেকেই) সৃষ্ট হয়েছে, নাকি তারা (নিজেরাই নিজেদের) সৃষ্টিকর্তা?” (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫)

… …. … … …. … … …. … … …. … … …. … … …. …

যুক্তিতে অনন্য ও স্বনির্ভর এই মহাগ্রন্থ আল কুরআন হলো সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর আনীত এমন এক জীবন্ত মুজিজা, যা কেয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই বিস্ময়গ্রন্থ আল কুরআন দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য হেদায়েতস্বরূপ। প্রকৃতই, যেমনটি সূরা আর রাহমানে বলা হয়েছে, মহাগ্রন্থ আল কুরআন হলো মানুষের উপর আল্লাহর বড় দয়া :

. করুণাময় আল্লাহ
. শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন
. সৃষ্টি করেছেন মানুষ
. তাকে শিখিয়েছেন বর্ণনা (কথা বলা)

(সূরা আর রাহমান, ৫৫:-)

(আরো পড়ুন :)
নবী চেনার উপায়

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…