সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইসলাম ?

ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে অনেককেই দেখেছি খুব দ্রুত (বিবদমান দুটি পক্ষের) একটি পক্ষ নিতে চান। আমি তাদেরকে দোষ দিচ্ছি না, বরং এর একটি ভিন্ন দিকে আলোকপাত করতে চাচ্ছি। আমি যতদূর বুঝতে পেরেছি তা হলো, এর পিছনে একপ্রকার অনিরাপত্তার অনুভুতি (feeling of insecurity) কাজ করে। আর তাদের এই ইনসিকিওর ফিল করার পিছনে একটি বড় কারণ আমরা নিজেরাই। বিশেষত যারা ঐ বিভক্তির বিষয়ে লড়াই করছেন এবং যারা বিভক্তির বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন। কিভাবে, তা বলি।

সবচে' সহজ উদাহরণ হলো শিয়া-সুন্নি বিভেদ। কেউ হয়তো নতুন নতুন ইসলামের প্রতি ঝুঁকছেন, ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান পালন করার চেষ্টা করছেন, পড়াশুনা করার চেষ্টা করছেন। একটা পর্যায়ে এসে শিয়া-সুন্নি বিভেদের বিষয়টি জানতে পারলেন। ব্যক্তিটি নিজে হয়তো সুন্নি সমাজে বেড়ে ওঠা, সুন্নি পরিবারের সদস্য। এদিকে একদল (বা একজন) শিয়াপন্থী ব্যক্তি তার সামনে সুন্নিদের ব্যাপক সমালোচনা করছে, বিভিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার করে ভুল ধরছে, সুন্নিদেরকে ভ্রান্ত বলছে।

এমতাবস্থায় সুন্নিদের চিন্তাধারার বিরুদ্ধে কোরআন হাদিসের অনেক অনেক রেফারেন্স দেখে ব্যক্তিটি অনিরাপদ বোধ করে। কারণ হয়তো গোটা কোরআনটা তার একবারও পড়া নেই; হাদিস হয়তো শোনার বাইরে পড়া নেই। এসময়ে মনে হয় যে : "ঐ শিয়া তো খুব শক্তিশালী ঢাল-তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে, এদিকে আমি তো (জন্মসূত্রে / আচারসূত্রে) সুন্নি। এখন আমি যদি তাকে ঠেকাতে না পারি, তাহলে আমি হেরে যাবো এবং আমাকে শিয়া মতবাদ মেনে নিতে হবে (বা বাধ্য হবো)"

এসময় ব্যক্তিটি কোনোভাবে ঐ শিয়ার হাত থেকে পালিয়ে এলেন এবং ধর্ম সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি পড়াশুনা করা বা জানা কারো শরণাপন্ন হলেন। অথবা সমপর্যায়ের কারো কাছে, যার শিয়া-সুন্নি সম্পর্কে জ্ঞান আছে। (আমার ব্যক্তিগতভাবে ইতিহাসের তেমন জ্ঞান নেই, তবে আমিও এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি যে –) "ভাই শিয়া-সুন্নি বিষয়টা সংক্ষেপে বলো তো। এদের মধ্যে কারা সঠিক ?"
অর্থাৎ, ঐ শিয়া ব্যক্তিটির যুক্তির ঢাল-তলোয়ারের বিপরীতে সুন্নি সমাজে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিটি এখন অনুরূপ ঢাল-তলোয়ারের সন্ধানে এসেছেন। এমন নয় যে ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করতে করতে একপর্যায়ে মুসলমানদের ইতিহাস পড়তে পড়তে সুন্নি মতধারা সৃষ্টির অংশে এসেছেন। বরং হঠাৎ আক্রমণের শিকার হয়ে আত্মরক্ষার খাতিরে ঢাল-তলোয়ার যোগাড় করতে এসেছেন। এখন দেখুন পরবর্তী "যুদ্ধ" কেমন হয়।

সুন্নি ব্যক্তিটি জ্ঞান সংগ্রহ করে এসে শিয়া ব্যক্তিটির সম্মুখীন হলো। এখন সাধারণভাবে এই জ্ঞানের আকার-আকৃতি এমন হয় যে : "অমুক হুজুর বলেছে..."। কিংবা, "শেইখ ইবনে.... অমুক বলেছেন, শিয়া একটি ভ্রান্ত কুফরি মতবাদ।" "শিয়ারা আলীকে God মানে। মুহাম্মাদ (সা.) কে শেষ নবী মানে না। কোরআনের ১১৪ সূরায় বিশ্বাস করে না।" ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, শিয়া ব্যক্তিটির আক্রমণের জবাবে সে-ও ঢাল-তলোয়ার নিয়ে এসেছে, কিংবা অন্যের ঢালের পিছনে আশ্রয় নিয়েছে ("শেইখ ইবনে...")

যুদ্ধের সমাপ্তি যেমন-ই হোক না কেনো, এখন থেকে সুন্নি ব্যক্তিটি ঐ যুক্তিগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। কারণটা এজন্য নয় যে ঐ যুক্তিগুলো সর্বজনীন গ্রাউন্ড থেকে প্রমাণিত, বরং এজন্য যে ভবিষ্যতে যদি সে আক্রমণের শিকার হয়, তবে যেনো একটা পক্ষে থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

অনুরূপভাবে বিপরীত ঘটনা-ও ঘটা সম্ভব।

আরেকটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। যার উদাহরণ তাকে আমি মোটেই দোষ দিচ্ছি না, বরং আমরা সকলেই কমবেশি এজাতীয় ইনসিকিউরিটি থেকে জ্ঞান / ঢাল-তলোয়ার অর্জনের চেষ্টা করে থাকি। যাহোক, প্রায় দুই বছর আগের কথা। আমার এক বন্ধুর বন্ধু হঠাৎই ঘোষণা দিয়ে "নাস্তিক" হয়ে গেলো। এরপর থেকে সে ফেসবুকে নিয়মিত ইসলামবিদ্বেষী পোস্ট শেয়ার করতে শুরু করলো। প্রথম প্রথম উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে তাদেরই আরেক বন্ধু কমেন্ট করলো : "তোর যা খুশি বিশ্বাস কর, অন্যদের নিয়ে বাজে কথা বলিস কেনো ?" বা এইজাতীয় কিছু একটা। তখন আমার বন্ধুটি আমাকে যা বললো তার সারকথা এই যে, এইসব নাস্তিকতার মোক্ষম যুক্তিখণ্ডন করে আমি যেনো কিছু লেখালেখি করি। এমনিতে হয়তো বন্ধুটি এনিয়ে মাথা ঘামাতো না, কিন্তু এখন তার নিজের "বিশ্বাস" প্রশ্নের সম্মুখীন, এবং এটাকে এড়ানো যাচ্ছে না, হয়তোবা কয়দিন পর সরাসরি-ই নাস্তিক বন্ধুটির হাতে নিজের বিশ্বাস "ইসলাম" নিয়ে নাস্তানাবুদ হতে হবে – এমতাবস্থায় ভবিষ্যত যুদ্ধের ঢাল-তলোয়ার সংগ্রহ করা দরকার। যাহোক বন্ধুর অনুরোধে আমি নিজেই লেখা শুরু করলাম ফেইসবুকে একটা পেইজ খুলে। (আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করুন – তার কারণে শুরু করা এই লেখালেখিতে আমিসহ অনেকে উপকৃত হয়েছি।)

যে বিষয়ে বলছিলাম : feeling of insecurity – অনিরাপত্তার অনুভুতি। ফিলিং অব ইনসিকিওরিটির কারণে যেসব জ্ঞান অর্জন করা হয়, তার বেশিরভাগই হয় hasty – তাড়াহুড়ার কাজ। এবং অনেকাংশে অসম্পূর্ণ, বিকৃত বা ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ ভুল। একটা তুলনা হতে পারে যে :
"এই দেখতো, ওমুক আমাকে বাংলায় অনেক গালি দিচ্ছে, আমি সব বুঝতেও পারছি না !"
 "এই নাও, তোমাকে কতগুলো ইংলিশ গালি শিখিয়ে দিলাম। যাও তবে যুদ্ধের ময়দানে !"

প্রথম উদাহরণে ফিরে আসি – শিয়া যুক্তির বিপরীতে "তর্কযুদ্ধে জেতার খাতিরে" সংগ্রহ করা যুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় এই ব্যাপারটিই ঘটে : তাড়াহুড়া করে সংগ্রহ করা অসম্পূর্ণ, বিকৃত এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ ভুল জ্ঞান। (অনুরূপভাবে বিপরীতও সম্ভব।)

উদাহরণ থেকেই মূল বক্তব্যে আসি :
. শিয়া-সুন্নি বিভেদ নিয়ে যুদ্ধ বা সমাধান করতে হলে এ সংক্রান্ত ইতিহাস নিয়ে অবশ্যই ডিল (deal) করতে হবে। কারণ কোরআনে শিয়া-সুন্নি বিষয়ে কিছু বলা নেই। সুতরাং হাদিস নিয়ে নাড়াচাড়ার প্রয়োজন পড়বে। অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত ইতিহাস নিয়েও নাড়াচাড়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।
. সেক্ষেত্রে ইতিহাসবিশেষজ্ঞ হতে হবে : সত্য ইতিহাসকে মিথ্যা কল্পকাহিনী থেকে পার্থক্য করতে জানতে হবে। এবং সর্বোপরি হাদিসের সত্যাসত্য নির্ণয়ের পদ্ধতি শিখতে হবে। কারণ শিয়া-সুন্নি উভয়ের পক্ষে-বিপক্ষেই মিথ্যা হাদিস থাকা অসম্ভব না। সুতরাং সেগুলোকে আলাদা করতে হলে মুহাদ্দিসের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
. হাদিস নিয়ে নাড়াচাড়া করা কিংবা শিয়া-সুন্নি উভয়ের বক্তব্য শুনে রায় প্রদান করতে গেলে কোরআনের বেশ কিছু আয়াত নিয়েও ডিল করতে হবে। এখানে আবার কোরআনের বিভিন্ন তাফসিরে পার্থক্য বিদ্যমান। সুতরাং মূল টেক্সট ব্যবহার করতে হবে, নয়তো কোনো আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলেই সেক্ষেত্রে নিজেকে জ্ঞান-গবেষণা করে ঐ ব্যাখ্যাটি বের করতে হবে (তাফসির করতে হবে)
. এইখানে এসে যদি একজন শিয়ার পাশাপাশি একই যুদ্ধের ময়দানে একজন নাস্তিকের আগমণ ঘটে, এবং সেই নাস্তিক আপনার কোরআনকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে, তবে সেক্ষেত্রে আপনি দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের সম্মুখীন হবেন। একদিকে যেমন কোরআন-হাদিস-ইতিহাস নিয়ে বিশাল বিস্তারিত গবেষণা করে শিয়া মতবাদের যুক্তিখণ্ডন করবেন, অপরদিকে তেমনি আরো কোনো উপায়ে নাস্তিকের ঢাল-তলোয়ারের বিপরীতে ঢাল-তলোয়ার তৈরী করবেন। এখন, নাস্তিকের ক্ষেত্রে:
(). কোরআনের ঐশীতা এবং অপরিবর্তনীয় থাকা প্রমাণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে কোরআনের গুণাবলী প্রমাণের আগে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। কারণ আপনি নাস্তিককে বলতে পারবেন না : "যেহেতু স্রষ্টা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, সেহেতু নিশ্চয়ই তিনি আমাদের জীবন চলার পথের সন্ধান দেবেন।" এই কথা নাস্তিক গ্রহণ করবে না। কারণ সেতো স্রষ্টায়ই বিশ্বাস করে না। সেক্ষেত্রে নাস্তিকের সাথে মূল যুদ্ধটি হবে স্রষ্টা প্রসঙ্গে।
(). নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে, সর্বজনীনভাবে আপনাকে স্রষ্টা তথা আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোরআন-হাদিস কিংবা অমুক শাইখের রেফারেন্স কিছুই কাজে আসবে না। সম্পূর্ণ নিজে থেকে নিজের বক্তব্য হিসেবে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

ধরলাম আপনাকে নাস্তিকের সাথে যুদ্ধ করতে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে ৪ নং পয়েন্ট বাদ দিলেও, ,২ ও ৩ নং পয়েন্টের ভিতর দিয়ে যখন আপনি যাবেন, তখন নিশ্চয়ই একদিনে এই সব হয়ে যাবে না ! হয়তো আপনি আরবি ভাষা-ই জানেন না, সেক্ষেত্রে জ্ঞান গবেষণা আরো ধীর হয়ে যাবে, এবং কয়েক বছর ধরে আরবি শিখে তারপরে কোরআন-হাদিসের সমন্বিত জ্ঞান-গবেষণা করে আপনি শিয়া-সুন্নি সমস্যার সমাধান বের করে ফেলবেন। কিংবা শিয়াদের (বা সুন্নিদের) ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডন করবেন। এখন, এই কাজের জন্য যে দীর্ঘ বছরের পর বছর সময়ের প্রয়োজন হয়, এই দীর্ঘ সময়ে আপনি (বা আমি) অনিরাপদ থেকে শিয়া (বা সুন্নি) ব্যক্তিটির ঢাল-তলোয়ারের আঘাত সহ্য করতে পারবো কিনা ? "শিয়ারা ভ্রান্ত" – কেউ এসে এই কথা বললে তখন আমি এই কথা বলতে প্রস্তুত কিনা : "দাঁড়ান ভাই, ইন-শা-আল্লাহ আগামী পাঁচ-সাত বছর পর আপনার সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করবো।" এবং গবেষণা শুরু করে দেবো ? নাকি আমি ফিলিং অব ইনসিকিওরিটি থেকে তক্ষুনি দৌড়ে দিয়ে কোনো এক শায়খের বিশ মিনিটের লেকচার শুনে আসবো, কিংবা অপর কারো ঢালের নিচে আশ্রয় নিয়ে তলোয়ার চালাবো ?

আমি উপরে দুটো লেভেলের উদাহরণ দিয়েছি :
. ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের একটি গ্রুপ (শিয়া/সুন্নি) অপর একটি গ্রুপের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে আত্মরক্ষার পথ খুঁজছে।
. শিয়া-সুন্নি তো দূরের কথা, একজন মুসলমানের "বিশ্বাস" ইসলাম ধর্মকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছে এক নাস্তিক, আর মুসলমান ব্যক্তিটি তার জবাব দিতে পারছে না।

দুটো লেভেলের উদাহরণ এইজন্য দিয়েছি যে অনেক ব্যক্তি হয়তো শিয়া-সুন্নি নিয়ে ঝগড়া / যুদ্ধ করছে, ওদিকে নাস্তিকের প্রশ্নের সামনে সে লা-জওয়াব হয়ে যাচ্ছে। কারণ সে তো "জন্মসূত্রে মুসলমান" : নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের যথার্থতা তো তার কখনো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি !

আবার, এক ব্যক্তি হয়তো শিয়া (বা সুন্নির) পক্ষ নিয়ে অপর পক্ষের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। যদিও সে নিজে জ্ঞান গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেয়নি, বরং দুই-চারটা যুক্তি বিভিন্নজনের মুখে শুনে তাই দিয়েই সে তর্ক/যুদ্ধ করছে, এবং যদিও সেই যুক্তিগুলোর ভিত্তি তার কাছে অজানা।

উদাহরণ দেই।
"শিয়ারা তো ভ্রান্ত আকীদা।"
"মানে ?"
"আমি শুনেছি ওরা কোরআনের ১১৪টা সূরা মানে না।"
"তাই ? বাকি সূরাগুলোর নাম কী ?"
"তাতো জানি না। তবে আমি শুনেছি ওদের এইটা হলো গোপন বিশ্বাস, শিয়া না হলে ঐ সূরা পড়তে দেয় না।"
"তাহলে আপনি জানলেন কিভাবে ?"
"এটাতো আমি নেটে এক ব্লগে পড়েছি।"
"তাই ? ঐ ব্লগার জানলো কিভাবে ?"
"তাতো জানি না। নিশ্চয়ই সে কোনো না কোনোভাবে জেনেছে।"
"শোনা কথায় বিশ্বাস করছেন ? ১১৪ এর চেয়ে বেশি সূরা-অলা "শিয়া কোরআনের" একটা প্রিন্ট কপি দেখাতে পারবেন ?"
"সেটা আমি পাবো কিভাবে। ইরানিদের ওখানে নিশ্চয়ই আছে..."

এভাবে চলতে থাকে। লক্ষ্য করুন :
"শিয়ারা ভ্রান্ত আকীদায় বিশ্বাসী" – এই সিদ্ধান্ত কোথা থেকে এসেছে ?
"শিয়ারা ১১৪ সূরা মানে না, ওদের নিজস্ব সূরা আছে" – এই যুক্তি থেকে। অথচ এই যুক্তির পক্ষে প্রমাণ কী ? প্রমাণ নেই। প্রমাণ হলো "শুনেছি" বা "পড়েছি" কিংবা "ওমুক শাইখ বলেছেন"। অথচ এগুলো কোনো প্রমাণই হতে পারে না।
যুক্তিতর্ক হতে হবে এইভাবে, পিনপয়েন্ট করে, প্রতি ধাপকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে।

তারপর দেখুন, আপনি যদি যৌক্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে ভুল না ভাঙান, এই ব্যক্তিটি তখন ভুল (বা ভিত্তিহীন বা অজানা ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত) ধারণা নিয়ে চলে যাচ্ছে : "শিয়ারা ভ্রান্ত আকীদায় বিশ্বাসী।" এরপর এই বিশ্বাসের কারণে ইরানের প্রতি ঘৃণা, ইরানের শাসকগণের উপর ঘৃণা, ধর্মীয় নেতাদের উপর ঘৃণা। তারপর যদি তাকে বলেন যে "আমেরিকা তো ইরানের শত্রু", তখন সে এই প্রকাশ্য সত্যটিকে গ্রহণ করতে পারবে না। আপনি যতভাবেই প্রমাণ করুন না কেনো, তখন ঐ ব্যক্তিটির মনে হবে : "তাহলে আমি এতদিন যা জেনে এসেছি তার সবই মিথ্যা ? এত বছর ধরে আমি বোকার স্বর্গে বাস করছিলাম !" কিন্তু এতো কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। সুতরাং সে তার একটি মিথ্যা বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সিঁড়িকে আঁকড়ে ধরবে, এবং ইরানের ধর্মীয় নেতাদেরকে মুনাফিক অ্যাখ্যা দেয়া সুইপিং স্টেটমেন্টের উপর ভিত্তি করে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে।

অনেক মানুষকে দেখবেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে বহু জ্ঞানগর্ভ লেখালেখি কিংবা ব্যাপক যুক্তিতর্কে মত্ত। হয়তো দেখা গেলো তাদের অবস্থা ঐ উপরের মতন : একবার যেহেতু বিশ্বাস করেছে যে শিয়ারা ভ্রান্ত কিংবা মুনাফিক / কাফির, সুতরাং তার উপর ভিত্তি করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিবেশ ব্যাখ্যা করছে; অথচ তার এই সমস্ত ব্যাখ্যার যে গোড়া – সেই গোড়াটিই শক্ত নয় : “শিয়ারা ভ্রান্ত” এই কথার পিছনে তার কোনো যৌক্তিক প্রমাণই নেই ! সেই "১১৪+ সূরার শিয়া কোরআন” সে জীবনেও চোখে দেখেনি, অথচ তার উপর ভিত্তি করে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ব্যাখ্যা করছে ! আর সমীকরণ মেলাতে হিমশিম খেয়ে কল্পনার আশ্রয় নিচ্ছে, যেগুলো আরও প্রমাণবিহীন ! গণহারে সুইপিং স্টেটমেন্ট দিয়ে যাচ্ছে : “ইরানের নেতারা মুনাফিক”, “ওরা সিরিয়ায় আসাদের গণহত্যার সঙ্গী..”। অথচ আপনি তাদেরকে ইরানের দশজন নেতার নাম ধরে প্রশ্ন করুন যে, কুরানিক পদ্ধতিতে তুমি তাদের মুনাফেকি প্রমাণ করো ! তখন হয়তো বলবে যে আসাদ সরকারকে সহযোগীতা করেছে তারা। সেটাকে যদি প্রশ্ন করেন, তাহলে হয়তো ব্যক্তি আক্রমণে চলে যাবে। অথচ এটা খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন : “প্রমাণ উপস্থাপন করো যে : . আসাদের নির্দেশের আসাদের আর্মি সিরিয়ার সাধারণ জনগণের উপর গণহত্যা চালিয়েছে। ২. ইরান সরকার অস্ত্র কিংবা ট্রেনিং বা অন্য যেকোনো উপায়ে এই গণহত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে।” তখন সেই প্রমাণ দিতে গিয়ে হয়তো বিবিসির বিভিন্ন নিউজের উপর ভিত্তি করতে হবে। বিবিসির গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্ন করলে … এভাবে আলোচনা কখনোই শেষ হবে না, অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকবে।

এজন্য শুরু করতে হবে গোড়া থেকে। ইসলামের পথে উঠবার সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ-ই যেনো হয় বিচারবুদ্ধির যৌক্তিক সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে। কোনো একটি ধাপে অন্ধ বিশ্বাসকে প্রশ্রয় দিলে বাকী জীবনটা-ই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে। এজন্য সময় থাকতেই পরীক্ষা করে নেয়া ভালো : আমার গোড়া থেকে সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো ?

একারণে প্রশ্ন করার উপর জোর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। Reasoning এর উপর জোর দেয়া উচিত। এবং যৌক্তিক উপায়ে নিজে-নিজেই যুক্তিতর্ক করে নিজের ভুল শোধরানো উচিত। স্রষ্টার অস্তিত্ব, কোরআনের ঐশীতা, ইসলামের যথার্থতা, – এগুল হলো একেবারে গোড়ার কয়েকটি ধাপ। এগুলোকে খুব মামুলি ব্যাপার মনে হতে পারে, কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারবুদ্ধির আলোকে এগুলোকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সেই জ্ঞান অর্জনের পথে এমন আরো কিছু জিনিস শেখা হয়, যা বাকী জীবনের জন্য কষ্টিপাথর হয়ে কাজ করে। আর এই কষ্টিপাথর হলো reasoning, আক্বল বা বিচারবুদ্ধি। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিচারবুদ্ধি নামক গুণটি জন্মগতভাবেই উপহার দিয়েছেন, কিন্তু পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে আমরা প্রায়ই সেটাকে ভুলে যাই, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার খাতিরে অন্ধবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরি।

যে মানুষটা জোরে "আমিন” বলা কিংবা ওজুর পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা নিয়ে তর্কে লিপ্ত, তাকে আকস্মিকই যদি গোড়ার প্রশ্নগুলি করি তবে সে হয়তো হাসবে, কিংবা বিরক্ত হবে। আর তা না করে যদি তাকে উপরের শাখা-প্রশাখা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে থাকি আর প্রমাণ চাইতে থাকি, তখনও হয়তো সে বিরক্ত হয়ে চলে যাবে। এজন্যে কথা বলার আগে কথা বলার আর্ট নিয়ে একটু চিন্তা করতে হবে। "যে ব্যক্তিকে বলছি, সে আমার কথা মানবে তো !” “ঠিক কোন অ্যাপ্রোচে কথা বললে সে আমার কথা ভালোভাবে মেনে নেবে !” এই চিন্তাগুলো করতে হবে। তারপর ব্যক্তি অনুযায়ী, দর্শক অনুযায়ী কথা বলতে হবে। আর এই অ্যাপ্রোচের প্রথম ধাপ হলো বিনয়।

যাহোক, সে অন্য আলোচনার প্রসঙ্গ। যা বলছিলাম, যে মানুষটা জোরে আমিন বলা নিয়ে ব্যাপক তর্কে লিপ্ত, তাকে সিঁড়ির ধাপগুলো নিয়ে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করতে হবে : "যতগুলো ধাপ পেরিয়ে এসে আপনি এই বিষয়ে কথা বলছেন, তার সবগুলো ধাপ দৃঢ় আছে তো ? ভুলক্রমে অন্ধ বিশ্বাস এসে কোনো একটা ধাপকে ভুলের জগতে ঢুকিয়ে দেয়নি তো? সবগুলো ধাপের যথার্থতা / নির্ভুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত আছেন তো !”


সবচে' বড় কথা, অন্যকে প্রশ্ন করার আগে এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করতে হবে। কারণ অন্যের বোঝা আমাকে বইতে হবে না, আর আমার কর্মের দায় অন্য কেউ-ও বহন করবে না। অপরকে সংশোধন করার দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে যেনো নিজের ভুলগুলি দৃষ্টির বাইরে চলে না যায়। নবী রাসূলগণ কেবল-ই ইসলাম প্রচার করতেন, কারণ তাঁরা ছিলেন নির্ভুল, নিষ্পাপ। আমাদের তো অনেক ভুল, অনেক ভ্রান্তি। ইসলামের দাওয়াতে বের হবার আগে নিজের পদক্ষেপের দিকে তাই দৃষ্টি দিতে হয় শতবার : ঠিকভাবে হাঁটছি তো !

নূরে আলম
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৩।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগ এবং আহমেদ দিদাতের ইরান অভিজ্ঞতা

(লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।)
আহমেদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫) এর নাম হয়তো অনেকের অজানা থাকবে। তবে ডা. জাকির নায়েকের নাম নিশ্চয়ই অজানা নয়। ডা. জাকির নায়েকের বর্তমান কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা হলেন আহমেদ দিদাত। আহমেদ দিদাত, যিনি কিনা ডা. জাকির নায়েকের নাম দিয়েছিলেন "দিদাত প্লাস" – পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়ানো এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেকচার দেয়া ছিলো তাঁর কাজ। যাহোক, ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ইসলামী ইরানের জন্ম হয়। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ভিজিট করেন আহমেদ দিদাত, সাক্ষাৎ করেন ইমাম খোমেইনীর সাথে এবং নিজদেশে ফিরে এসে ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তাঁর অনুভূতি তুলে ধরেন। আহমেদ দিদাতের নানা বিষয়ে বক্তব্য ও চিন্তাভাবনা বাংলা ভাষায় কিছু না কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু শিয়া-সুন্নি ঐক্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর চমৎকার বক্তব্যের অনুবাদ কোথাও না পেয়ে সবার সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই অনুবাদ করে ফেললাম। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। মূল অডিও কোথাও কোথাও শুনতে বা বুঝতে অসুবিধা হয়। কোথাওবা অডিও নিঃশব…