সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

লংমার্চ নিয়ে আশা-হতাশা : ৬-ই এপ্রিলের একটি পূর্বাপর বিশ্লেষণ।

সকালে পত্রিকায় দেখলাম news analysis : Hefazat's  tough threat, soft program.
RTNN.net লিখেছে : হেফাজতে ইসলামের বক্তব্য খুব দুর্বল।
প্রথম আলো লিখেছে : ১৮ দলীয় জোটের আশা পূরণ হয়নি। অন্তত টানা দু'দিন হরতালসহ হেফাজতের অবস্থান গ্রহণ আশা করেছিলো তারা।
আমার দেশ পত্রিকাটির উপলব্ধি অবশ্য ভিন্ন ছিলো, সম্পাদকীয়তে তারা পূর্বাপর এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে ফোকাস করে bigger picture দেখানোর চেষ্টা করেছে।


ছবি : ৬-ই এপ্রিল ২০১৩, মতিঝিল শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ

আমরা বাংলাদেশীরা একটি লজ্জাজনক কাজ করে ফেলেছি। অবশ্য আমাদের লাজ-লজ্জা কম কিনা; তা হলো -- যেকোনো বড় ধরণের মুভমেন্ট শুরু হবার আগেই তাকে তাহরির স্কয়ারের সাথে তুলনা করছি। এটা একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এমনকি ইসলামের বিরুদ্ধে কার্যতঃ যুদ্ধ ঘোষণাকারী শাহবাগ আন্দোলনকে ইসলামী জাগরণ তাহরির স্কয়ারের সাথে তুলনার ধৃষ্টতাও দেখানো হয়েছিলো। অবশ্য জনগণকে দোষ দিয়েই বা কী -- খোদ সরকারই এই ভয়ে কয়েকবার কেঁপে উঠেছে। মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে একবার খালেদা জিয়ার "চলো চলো ঢাকা চলো" কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে ভীত সরকার ঢাকাকে দুই দিনের জন্য সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো। সেই প্রথম "সরকারী হরতাল" টার্মটা মানুষের মুখে চলে এলো, এবং শাহবাগ আন্দোলন পরবর্তী সময়ে মানুষ আরো দু'বার সেটা প্রত্যক্ষ করলো।


সরকার দ্বিতীয়বার তাহরির স্কয়ার আতঙ্কে ভুগেছিলো জামাত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদির ফাঁসির রায় দেবার সময়। অবশ্য সাঈদী সাহেবের ফাঁসির রায়ের সময়ে "বাংলা স্প্রিং" এর ভয়ের সাথে আরো একটি ভয় যুক্ত ছিলো, তা হলো জামাত-শিবির। জামাত-শিবিরের শক্তি সম্পর্কে আ.লীগের বেশ ধারণা আছে, কারণ তারা সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই আগেরবার ক্ষমতায় এসেছিলো। এবার আওয়ামী সরকার সেই অতীত মিত্রকেই দমন করছে, কারণ মিত্র আর মিত্র নাই, শত্রুর সাথে যোগ দিয়েছে। এতদিনে জামাতের শক্তি আরো বেড়েছে নিঃসন্দেহে। এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে জামাতের কৌশলগত এবং কাঠামোগত ভিন্নতা রয়েছে। একারণে বিএনপি বা আ.লীগের ৫০ হাজার সমর্থক যা করতে পারে না, জামাত-শিবিরের ৫ হাজার সমর্থক তার চেয়ে বেশি করতে পারে। সুতরাং সাঈদী সাহেবের ফাঁসির রায়ে সরকারের তাহরির স্কয়ার আতঙ্কে ভোগা অতি স্বাভাবিক। আতঙ্কিত সরকার স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষায় দেড় শতাধিক মানুষকে হত্যা করলো।


২৮শে ফেব্রুয়ারি জামাত-শিবির মাঠে নেমেছিলো, কিন্তু সেসাথে সাধারণ জনগণও নেমে এসেছিলো। কারণ এদেশের মানুষের কাছে সাঈদী সাহেব "জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী" নন, তিনি শুধু "সাঈদী" -- সবাই তাঁকে একনামে চেনে, এবং দল-মত নির্বিশেষে ভালোবাসে। সেই ভালোবাসার প্রকাশ হলো রায় পরবর্তী দুইজনে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়া, এবং দেড় শতাধিক মানুষের জীবন। এতগুলো প্রাণক্ষয়ের জাস্টিফিকেশান ভিন্ন আলোচনার প্রসঙ্গ, তবে সাঈদী সাহেবের রায়কে কেন্দ্র করে আরেকটি তাহরির স্কয়ারের আশা যারা করছিলো, তারা নিরাশ হয়েছে। মিলিট্যান্ট হয়ে ওঠা 
জামাত-শিবির প্রায় সপ্তাহখানেক পর ঘরে ফিরে গেলো, সাধারণ মানুষ তাদের মৃত স্বজনদের কবরস্থ করলো। তারপর সব চুপ। তাহরির স্কয়ার হলো না। যেভাবে হয়নি ঢাকা চলো কর্মসূচীতে। অবশ্য সেখানে খালেদা জিয়া আগেই বলেছিলেন, সমাবেশের নাম করে এসে তাহরির স্কয়ার বানানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

তৃতীয়বার মানুষ তাহরির স্কয়ারের আশা করেছিলো ৬ই এপ্রিলের লংমার্চে।

৬-ই এপ্রিলের লংমার্চ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে ফোকাস করা দরকার। হেফাজতে ইসলামকে ক্রেডিট দেবার আগে এর ক্রেডিট আমার দেশ পত্রিকার, এবং তার পিছনের মাহমুদুর রহমানের। শাহবাগ আন্দোলনের স্বরূপ উন্মোচন করে একে ব্যর্থ করে দেয়া, এবং সেই সূত্রে বছরের পর বছর ধরে ইন্টারনেটে চলে আসা ইসলাম-বিদ্বেষ নিয়ে অনুসন্ধানী সিরিজ প্রকাশ করা - এসবেরই ফসল ৬-ই মার্চের লংমার্চ।


বাংলাদেশে ইন্টারনেট ইউজার কয়জন ? সারাদেশে তিন কোটির মত মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এর মাঝে ফেসবুক ইউজার ৩৩ লাখের মতন। সবচে' বড় ব্লগ সামহোয়্যারইনব্লগ এর নিয়মিত ইউজার ১০ হাজারও হবে না। আর যেসব নাস্তিক ওয়েবসাইট এদেশে নাস্তিকতার প্রচার করে বেড়াচ্ছে, তাদের দু-একটা ছাড়া আর কোনোটাই বাংলাদেশের top 500 ওয়েবসাইটের মধ্যে নাই। অর্থাৎ তারা সামহোয়্যারইনব্লগ থেকে চার পাঁচশ ধাপ পিছনে। ছয় বছর যাবৎ ব্লগিং করেছি, এখনও করি, এবং আমার ব্লগিং অভিজ্ঞতা হলো, এসব নাস্তিকের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকশ' এর বেশি হবে না। তাও বেশিরভাগই বিদেশে অবস্থান করা টাকা-পয়সা অলা লোকজন  : পেইড ব্লগার -- যারা কিনা বিভিন্ন বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রচুর পরিমাণ টাকা পেয়ে থাকে নাস্তিকতার প্রচার-প্রসারের জন্য। তাহলে বাংলাদেশে অবস্থানকারী বড়জোর ২০০ জন ইসলাম-বিদ্বেষী ব্লগারের বিরুদ্ধে না লাগলে কি হতো না ? ওদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন যে ৭-৮ বছর ধরে তারা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, কিন্তু ওয়েবসাইটের জনপ্রিয়তা বাড়ার পরিবর্তে কমছে। এদেরকে simply ignore করা যেতো, এবং এত বছর ধরে তাদেরকে উপেক্ষা-ই করে আসা হচ্ছিলো। ইসলামী শক্তিগুলো এদেরকে পাত্তা দেয় নাই। বরং ইসলাম প্রচারে ব্যস্ত ছিলো।

৬-ই এপ্রিলের লংমার্চ কিছুতেই হতো না, যদি সরকার ইসলাম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতো। ইসলামপন্থীরা এতদিন চুপ করেই ছিলো। ইসলামের বিরুদ্ধে যে কাজগুলো সরকার করছিলো, তার একটা-একটা নিয়ে আলাদাভাবে বৃহৎ মুসলিম গণজাগরণ করা সম্ভব ছিলো না। কারণ ঈমানদার মুসলিম জনগোষ্ঠী বহু বছর ধরে ঝিমাচ্ছিলো। এই ফাঁকে বিদেশী বন্ধুকে খুশি করতে গিয়ে সরকার ইসলাম নিয়ে যা-খুশি-তাই করলো। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান ঝিমিয়ে পড়া ঈমানদার জনগোষ্ঠীকে প্রবল নাড়া দিলেন ইসলাম-বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড প্রকাশ করে দিয়ে।

৪০ বছর ধরে এদেশের মানুষকে হিন্দী শিখানো হয়েছে, ইংরেজী শিখানো হয়েছে, আরবী শিখানো হয় নাই। পাশ্চাত্য ও ইন্ডিয়ান সংস্কৃতি ইমপোর্ট করা হয়েছে, ইসলামী সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা হয়েছে। ৪০ বছর ধরে ছেলে-মেয়েদের বেপর্দা ও বেহায়া করে তোলা হয়েছে, ইসলামী অনুশাসন থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যিনা-ব্যাভিচারকে মহামারী আকারে গোপনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সারাদেশে। এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মন-মগজে ইসলাম বিরোধী অসংখ্য জিনিস ৪০ বছর ধরে "পুশ" করা হয়েছে, কারণ আমাদের ঈমান ঝিমাচ্ছিলো। কিন্তু সরকার সবচে' বড় ভুল করলো আল্লাহ-রাসূলের বিরুদ্ধে গিয়ে। পৃষ্ঠপোষকতা দিলো তাদেরকে, যারা সরাসরি নগ্ন ভাষায় আল্লাহ-রাসূলের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছে। এর ফলে ঝিমাতে থাকা মুসলমানদের কলিজায় টান পড়লো : আর যা-ই হোক, আল্লাহ রাসূলের বিরুদ্ধে কোনো কথা নয়। এমনকি যারা অনিসলামী কর্মকাণ্ডে আপাদমস্তক নিমজ্জিত, তাদেরও অন্তরে ঝিমাতে থাকা একটা অংশ ছিলো, আর সেখানে আল্লাহ-রাসূলের কথা ছিলো। অনেকটা রূপকথার দৈত্যের প্রাণভোমরার মত, যেটা কৌটায় করে পানির নিচে লুকানো থাকে।

আল্লাহ-রাসূলের সরাসরি বিরোধীতা না করেই ৪০ বছর ধরে এদেশের মানুষকে ইসলাম থেকে ডেভিয়েট করা হচ্ছে, করা হয়েছে। ইসলাম বিরোধিতায় আ.লীগসহ ইসলাম বিরোধী শক্তি কৌশলগত ভুল করে ফেললো - নিজেদের সাময়িক বিজয় দেখে আনন্দে অতি উল্লাসিত হয়ে সরাসরি আল্লাহ-রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। আর তখনই অর্ধ-ঘুমন্ত ঈমানদারদের কলিজায় টান পড়লো, এবং প্রাণ ভোমরা জেগে উঠলো। ফলশ্রুতিতে ১৩ দফা দাবীর পক্ষে দল-মত নির্বিশেষে ঐতিহাসিক মুসলিম গণজোয়ার প্রত্যক্ষ করলো বাংলাদেশে। '৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে দেশব্যাপী এত বৃহৎ সমাবেশ এই প্রথম। এবং এই সমাবেশের পিছনে নেই "মুক্তিযুদ্ধের চেতনা", "জাতীয়তাবাদের চেতনা", কিংবা "যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চেতনা"। সব চেতনার উর্ধ্বে এটা মুসলমানের ঈমানের চেতনা। সুতরাং আজকের প্রথম আলোর সম্পাদকীয় এর বক্তব্যের বিরোধিতা করে এবং ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে বলতে হয়, "ধর্মভিত্তিক দল ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারে নাই," একথা তো সত্য নয়-ই, বরং ভবিষ্যত বাংলাদেশের ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের মূল নিয়ামক হবে এই ধর্মের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান।

যাহোক, হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সুতরাং তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচীর অনুরূপ কর্মসূচী আশা করা ভুল। ৬-ই এপ্রিলের লংমার্চে হেফাজতে ইসলামের (আল্লামা আহমদ শফীর) নেতৃত্বে সারা দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ শুধু সরকারকে নয়, সারা বাংলাদেশ এবং বিশ্ববাসীকে এই মেসেজ দিয়ে দিলো যে সব কিছুর উর্ধ্বে আমাদের পরিচয় হলো মুসলিম, এবং আর সব কিছুর চেয়ে দামী ও ভালোবাসার হলো ইসলাম : আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল।
এই লংমার্চ এবং সারা দেশের বিভিন্ন জায়গার জনসমুদ্র হলো ইসলামী শক্তিপ্রদর্শন। নিশ্চিতভাবেই কোনো রাজনৈতিক দল দেশব্যাপী অনুরূপ গণজমায়তে হাতে পেলে তাহরির স্কয়ার বানিয়ে ক্ষমতা দখলের সুখস্বপ্ন দেখতো। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয়। জামাত-শিবির রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের সংমিশ্রন থাকায় তাদের বোঝা কঠিন, এবং শুধু রাজনৈতিকভাবে তাদের মোকাবিলা করা কঠিন। আর হেফাজতে ইসলাম এবং তার নেতৃত্বে সারা দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ নির্বাচনের সময় যেখানেই সিল দিক না কেনো, ৬-ই এপ্রিলের গণজোয়ারে তাদের অংশগ্রহণ কেবলমাত্র ইসলামের ভালোবাসায়। সুতরাং, কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচীর ন্যায় কর্মসূচী এখানে ফলপ্রসূ হবার সম্ভাবনা নেই, কারণ সেক্ষেত্রে এই গণজোয়ারকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে সরকার, এবং এই খেলা আ.লীগ ভালোই খেলতে জানে, জিততেও জানে।

একারণেই অনেককে হতাশ করে উত্তেজিত আবেগী জনতাকে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এবং সরকারকে যেই তিন সপ্তাহ সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে, এর মধ্যবর্তী সময়ের কর্মসূচীও রাজনৈতিক কর্মসূচীর মত নয়। বরং এই সময়ে হেফাজতে ইসলাম মানুষকে আরো সংগঠিত করবে, এবং পরবর্তী ডেডলাইন ৫-ই মে এর অবরোধের জন্য পরিকল্পনা করবে। ইসলামপ্রিয় মানুষজন, যারা ৬-ই এপ্রিলকে কেন্দ্র করে তাহরির স্কয়ার আশা করছিলেন, তারা হতাশ না হয়ে অপেক্ষা করুন। অপেক্ষা করুন এবং দেখুন। কারণ রাজনৈতিক বহু বিপ্লব দেখে এবং বিশ্লেষণ করে আমরা অভ্যস্ত হলেও, এই ৪০ বছরের বাংলাদেশে আমরা কোনো ইসলামী বিপ্লব প্রত্যক্ষ করি নাই। বিশ্বব্যাপী অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ইসলাম বিপ্লবের রূপরেখাও আমাদের অধিকাংশের অজানা।

( জামায়াতে ইসলামী তো অনেক আগে থেকেই বহুল বিতর্কিত, কিন্তু --) হেফাজতে ইসলাম এবং তাদের ১৩ দফা নিয়েও বেশ আলোচনা-সমালোচনা আছে।  আর সব পত্র-পত্রিকা, আলোচক-সমালোচক যেটা এড়িয়ে গিয়েছেন, সেটা লিখেছে RTNN.net । প্রধান প্রতিবেদক খোমেনী ইহসানের সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে, কিন্তু "হেফাজতে ইসলামের বক্তব্য খুব দুর্বল" শিরোনামের আর্টিকেলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দুটি কথা লিখেছেন :
১. যার প্রশ্রয়ে ইসলামবিরোধীরা ইসলাম ও নবীর অবমাননা করলো, তার কাছেই বিচারের ধরণা দেওয়ার মানে তো স্পষ্ট : অনিষ্টকারীকেই অনিষ্টতার বিচারক মানা।
২. পরের কথা হলো, একটা গণবিরোধী, ইনসাফ ও আদলবিরোধী সংবিধানের মধ্যে "আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" থাকা বা না থাকা তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। যেমন তামাশা বাংলাদেশের সংবিধানে বিসমিল্লাহর ব্যাপারে করা হচ্ছে।

কথা দুটি খুবই সত্য। বিসমিল্লাহ এর অর্থ হলো আল্লাহর নামে। আল্লাহর নামে সংবিধান শুরু করে যদি সংবিধানে কোরআন-হাদীসের আইন না থাকে, বরং উল্টা অনিসলামী এবং অনেক ক্ষেত্রে ইসলাম বিরোধী আইন থাকে, তবে শুরুতে আল্লাহর নাম নেয়ার কোনো অর্থ হয় না। অনেকটা বিসমিল্লাহ বলে মদ খাওয়ার মত, কিংবা মদ খাবার সময় বড় গোঁফ ভিজে গিয়ে মাকরূহ হবার মত ব্যাপার।

স্কুলের কথা মনে আছে, বাংলা ম্যাডাম একবার বিরক্ত হয়ে এক ছেলেকে বলেছিলেন, "তুই হলি মাকাল ফল। মাকাল ফল কী, বুঝিস ?" সে ছেলে বললো, "জ্বী ম্যাডাম, চিনি, বাইরেটা দেখতে খু-উ-ব সুন্দর, কিন্তু ভাঙলে ভিতরে বিলাইয়ের গু।" তার ভাষা যেমনই হোক না কেনো, আমাদের বর্তমান সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ সংযোজন হলো অনুরূপ ব্যাপার।

আর হ্যাঁ, সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই ইসলাম বিরোধী তৎপরতা চলছে, সুতরাং তাদেরকে ১৩ দফা দাবী বাস্তবায়ন করতে বলা (যা কিনা কার্যতঃ ইসলাম রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব নয়) মানে চোরের কাছে চুরির বিচার দেয়া। গত অর্ধ শতাব্দীর সবচে' সফল ইসলামী বিপ্লব, ইরানের ইসলামী বিপ্লবটা হয়েছিলো অত্যাচারী রেজা শাহ পাহলভীর বিরুদ্ধে। ইরানের শাহ এত বেশি ভোগ বিলাসে মত্ত ছিলো, যা আমাদের দেশের হলমার্ক অলারা কিংবা পদ্মা সেতুর টাকাখোরেরা সারা জীবনেও ভোগ করে নাই। কিন্তু ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে সেই শাহকে উল্টে দিয়ে বিপ্লব হয় নাই। প্রথমে শাহকে ইসলামের পথে আহ্বান জানানো হযেছিলো, যেনো শাহ অত্যাচার-অনাচার বন্ধ করে ইসলামী বিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করেন। শাহ উল্টা অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে বাধ্য হয়ে সেখানকার আলেম-ওলামাগণ বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪ বছর ধরে এই আলেমগণই ইসলামিক রিপাবলিক ইরানকে সফলভাবে পরিচালনা করে আসছেন। ফলশ্রুতিতে ইরান, ইসলামী বিশ্বসহ আমেরিকা পরবর্তী নতুন বিশ্বের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

৫-ই মে ডেডলাইন। স্পষ্টতঃই সরকার ১৩ দফার একটিও এর মধ্যে মেনে নেবে না। লোক দেখানো দু-তিনজন ব্লগারকে গ্রেফতার কিংবা কিছু ব্লগ বন্ধ করার কৌশল মানুষ বুঝে গিয়েছে, সুতরাং এতে কাজ হবে না। লংমার্চে মানুষ ঢাকায় আসতে চেষ্টা করেছে, আর ঢাকাকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে সরকার। ৫-ই মে রোববার এর বিপরীতটা হবে : ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করতে হেফাজতে ইসলাম সকল বাস-ট্রেন-লঞ্চ রাস্তা বন্ধ করে দেবে। অহিংস এই আন্দোলন সেইদিন সরকারী অত্যাচারে সহিংস হয়ে উঠবে কিনা, তা বলা যাচ্ছে না। তবে যারা তাহরির স্কয়ার আশা করছিলেন, তারা অপেক্ষা করুন ৫-ই মে এর জন্য। ঐদিনই বোঝা যাবে এদেশে ইসলামের কণ্ঠস্বর থাকবে না আরো জোরে টুঁটি টিপে ধরা হবে। ঈমানদার মুসলিম গণজোয়ার যদি সেদিন সত্যিকারের কোনো ফসল নিয়ে ঘরে ফিরতে না পারে, তবে এদেশে ইসলাম বহুদিনের জন্য শেষ হয়ে যাবে। কারণ ইসলামের পথ রাজনীতির মত নয় যে মুহুর্তে মুহুর্তে রং বদলায়, শত্রু হয়ে যায় মিত্র কিংবা আজকের হিরো কাল ভিলেন হয়ে যায়। এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ইসলাম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এতটুকু বলা যায় যে, বাংলাদেশে ইসলাম থাকবে কি থাকবে না, এই প্রশ্নের এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা।


নূরে আলম
এপ্রিল ৭, ২০১৩।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…