সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জন্মদিন

গতবছর আমার উনিশতম জন্মবার্ষিকী ছিল। সেটা ছিল ২০১০ সাল। আমাদের HSC পরীক্ষার প্র্যাকটিকাল সবে শেষ হয়েছে - দু-চারদিন গিয়েছে কেবল, আমার জন্মদিন চলে এলো। ফোনে "Happy Birthday" লেখা পড়া, আর সামনাসামনি শোনার অনেক পার্থক্য। সামনাসামনি যখন কেউ বলে - "Happy Birthday !", তখন আমি অস্বস্তিতে পড়ে যাই। কী বলব ভেবে পাই না। আর আমার একটা বড় সমস্যা হল, মুখ দিয়ে 'ধন্যবাদ' কথাটা বের হতে চায় না। আমি করুণ হাসি দিই !
যাহোক, যা বলছিলাম, গত জন্মদিনের কথা।
আমি ইচ্ছা করেই রাত বারোটার আগে শুয়ে পড়লাম (যেন Happy Birthday কথাটা শুনতে না হয়)। সকালে উঠে নিয়মমতো mashable.com এ রোমিং করছি, তখন বোধহয় ন'টা মতন বাজে, যীনাত এসে ফোন দিয়ে গেল - কলেজের বন্ধুরা মেসেজ দিয়েছে। বার্থডে উইশ। আমি পড়লাম। ভালোই লাগল।
আসলে, এই 'happy birthday' কথাটা দিয়ে কী উইশ করা হয় ? এক্স্যাক্টলি কী উইশ ? মন থেকে উইশ করা জিনিসটা আসলেই কঠিন, খুব কম মানুষই করে বোধহয়।
কী বলতে কী বলছি। দশটার পরে নিলয় বাসায় এলো। আমি গিফট পেলাম একটা টি-শার্ট।
- "পরো তো দেখি !"
আমি হাসলাম। নিলয়কে আর পরে দেখানো হল না। তারপর আড্ডা হল। দুপুরের দিকে ও চলে গেল। ওহ হো, সেদিন কি খুব বৃষ্টি হয়েছিল ? হ্যাঁ, তাইতো। রাস্তায় পানি জমে গিয়েছিল। বেলা তিনটার দিকেই সম্ভবত দোকানে গেলাম সদাই আনবার জন্য। বাসায় এসে শুনি যীনাত বলছে - লিমন ফোন দিয়েছিল, ও, মার্জিয়া আর মার্জিয়ার বোন আসবে সন্ধ্যায়।
আমার তো আক্কেল গুড়ুম !
"এই যীনাত, তাড়াতাড়ি ড্রয়িং রুমটা গুছাও তো।" আমাদের ড্রয়িং রুম আবার গেস্ট চলে যাবার পরেই আমরা ইচ্ছেমতো এলোমেলো করে ফেলি। প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস মুভিতে এজাতীয় একটা দৃশ্য থাকে। নায়িকারা এবং তার মা এলোমেলোভাবে শুয়ে-বসে থাকে। জানালা দিয়ে গেস্ট আসতে দেখে এক লাফে ঘরদোর গুছিয়ে পরিষ্কার ! ঘর গুছিয়ে একেবারে পরিপাটি করে ফেলল যীনাত ! আমিও একটু সেজেগুজে (!) রেডি হয়ে থাকলাম। সন্ধ্যায় এলো ওরা। লিমন, সিফাত, মার্জিয়া, জাকি, আর মার্জিয়ার বোন ঝুমা আপু। কারেন্ট চলে গেল। আমাদের ড্রয়িং রুমের ফ্যানটাও আবার নষ্ট হয়েছিল কিছুদিন আগে। সবমিলিয়ে 'জুনের' গরমে আমরা ঘেমে নেয়ে গেলাম। তার মধ্যে আবার গরম ন্যুডলস, চা - এইসব খেয়ে সবার আরো অবস্থা খারাপ। তবুও কথা চলতে থাকল।
আমি আবারও গিফট পেলাম। ফুলদানি, কার্ড, পানি খাবার মগ, আর - একটা তালাচাবি-অলা জিনিস, যেটার মাঝে টাকা রাখা যায়। আমি ডায়রিতে তালা দিয়ে রাখতাম বলে মার্জিয়া (সম্ভবত) এই জিনিসটা কিনেছিল।
আর একটা জিনিস, সেটা ছিল কলম-পেন্সিল রাখবার ঝুড়ি।
ঝুমা আপুর গিফটটা পেটের মধ্যে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল - 7 up.
সিফাত একটু গিটার বাজাল।
সংখ্যাতত্ব নিয়ে একটু আলোচনা হল।
লিমনের ২, সিফাতের ৪, ঝুমা আপুর ৪, মার্জিয়ার ৩, জাকির ৩, আমার ৫, যীনাতের ১, আম্মুর ৯; ওহ হ্যাঁ, আম্মুও আমাদের সাথে গল্প করেছিল খানিক, শেষটায় এসে।
তারপর রাত সাড়ে আটটার দিকে ওরা চলে গেল। ড্রয়িং রুমটা তখন একটু আগের আড্ডার চিহ্ণ নিয়ে এলোমেলো হয়ে আছে।
সেদিন একটু ডায়রি লিখেছিলাম।

এর আগের জন্মদিনটা কেমন গিয়েছিল ? সেটা ছিল ২০০৯ সাল। সকালে নিলয় বাসায় এল। আমি গিফট পেলাম কার্টুন আঁকা একটা মগ। কিছুক্ষণ পরে সিফাতের ফোন পেলাম। এক নাম্বার বিল্ডিঙের সামনে থেকে ওকে বাসায় নিয়ে এলাম। ও - ও আবার দুটো আইসক্রিম কিনেছিল, আমার আর ওর জন্য। ওকে বাসায় নিয়ে এলাম।
আমি, যীনাত, নিলয়, সিফাত - আমরা আড্ডা দিলাম।
আমার বিশাল বড় ডায়রিটাতে উইশ নিলাম।
নিলয় লিখল - "জীবনে বড় হও !" কে জানে, 'বড় হওয়া' বলতে ও কী বুঝেছিল !
সিফাত লিখল - "Maintain the rhythm of life and succeed in life."
সিফাত হল angel of sorrow. :)

কলেজে এই জন্মদিনের মার খেয়েছিলাম সিফাত, লিমন আর নাহিয়ানের কাছে। এটা ছিল নিয়ম। পিঠের উপর জোরে জোরে দুই তিনটা - । :(
অবশ্য ওদের বেলায় আমিও দিয়েছিলাম ! ;)
সেটা ছিল আমার আঠারোতম জন্মদিন (আসলে হবে 'জন্মবার্ষিকী', কিন্তু জন্মদিন লেখাটা সম্ভবত রীতিসিদ্ধ ভুল হয়ে গিয়েছে)। আমার মনে আছে, সেদিন আমি রাতে বসে ডায়রিতে হিসাব করছিলাম, সে পর্যন্ত জীবনে কী কী বড় ভুল করেছি, কী কী ভালো কাজ করেছি। অনুপাতটা ছিল সম্ভবত ১৮:৮ কিংবা ১০। এখন মনে হয় সেটা হাস্যকর গণনা, কিন্তু তখন খুব সিরিয়াসলি লিখেছিলাম।

২০০৯, ২০১০। দুই বছরে কত কী চেইঞ্জ হয়ে গেল ! আমার ডায়রি বের করলে টের পাই। জীবন পরিবর্তনের দলিল।
২০০৯ এ কলেজে পড়তাম। ২০১০ এ কলেজ পাশ করে ফেললাম। ২০১১ তে, এখন, ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আমি জানি না কেন এই ব্লগ লিখছি। এটা কি বলবার মত কিছু ? কই, নাতো ! সবারই তো বছরে একবার করে জন্মদিন আসে। কেউ পালন করে, কেউ করে না। কেউ মনে রাখে, কেউ মনে রাখে না। আমিই শুধু ডায়রিতে আর ব্লগে সময়কে বন্দী করার ব্যর্থ চেষ্টা করি। তবু, অলস জাবর কাটবার জন্য এগুলো ভালো।

আমি নিজের মাঝের একটা জিনিসকে ভয় করি। সেটা হল - অনেক সময় বলতে বলতে এমন সব কথা বলে ফেলি, যেটা কখনোই বলতে চাই নি। কিন্তু কথা বলার নেশা, আর শ্রোতাকে মুগ্ধ করার নেশা (!) বড় নেশা। এই নেশায় যারা পড়ে, তারা কিছুতে ফিরতে পারে না।

আবার আমার জন্মদিন আসছে সামনে। আমার বয়স বিশ হয়ে যাবে। আমি ডায়রি লিখব কি ? সম্ভবত না। লিখলেও খুব কম, এতটুকুন, তাও কম্পিউটারে, কাগজের ডায়রিটাতে নয়।

আমি দিনটার জন্য অপেক্ষা করছি। এই জন্যে নয় যে আমার বয়স 'বিশ' হয়ে যাবে। এই জন্যে যে ঐ দিনটাতে আমি 'মনের ভিতর' 'অনেক কিছু' 'পরিবর্তন' করে ফেলব। তাই আমি দিনটার জন্য অপেক্ষা করছি।
যেটা পরে করতে পারি, সেটা এখন করছি না কেন ? কারণ, সেটা ঐদিনের আগে করা সম্ভব না।
ধ্যাৎ, কী সব এলোমেলো কথা লিখছি। ঘোর লাগছে। আরেকটু বেশি লিখলেই সব বলে দিতে পারি।

৫ই জুন, ২০১১ - এই দিনটাতে আমি কিছু প্রত্যাশা করি না। কিছুই না।

নূরে আলম,
মে ৩১, ২০১১।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…