সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গাদীরে খুমের উপেক্ষাই মুসলমানদের দূর্দশার কারণ

গাদীরে খুমের উপেক্ষাই মুসলমানদের দূর্দশার কারণ। এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, এর গোটা ব্যাপারটাই মুসলমানদের in-house ব্যাপার; বহিঃশত্রুর কোনো হস্তক্ষেপে নয়।


গাদীরে খুমের ঘটনা কী?
মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের শেষ হজ্জ্ব শেষে ফিরবার পথে ১৮ই জিলহজ্জ্ব তারিখে গাদীরে খুম নামক স্থানে থামলেন এবং সকল সাহাবীকে একত্র হবার নির্দেশ দিলেন। সেখানে তিনি ইমাম আলী (আ.)-কে সাথে নিয়ে মঞ্চে উঠে একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। এই ভাষণে মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ছিল। তার মাঝে প্রথমটি ছিল "কুরআন ও আহলে বাইতের" অনুসরণের আদেশ, এবং দ্বিতীয়টি ছিল "ইমাম আলী(আ.) এর অভিষেক", অর্থাৎ হযরত আলী (আ.) কে মুসলিম জাতির মওলা ঘোষণা করা। [মওলা শব্দের অনেক অর্থ হয়, যেমন মনিব, বন্ধু, অভিভাবক, শাসক ইত্যাদি।]


"কুরআন ও আহলে বাইত"
বিভিন্ন সহীহ সূত্রে বর্ণিত, হাদীসে সাকালাইন নামে পরিচিতি এই হাদীসের মূল কথাটি মোটামুটি এরকম:
নবীজি (সা.) বললেন, "আমি তোমাদের মাঝে দুটি গুরুত্বপূর্ণ/ভারী/মূল্যবান বস্তু রেখে যাচ্ছি, আমি দেখব তোমরা এর সাথে কী আচরণ করো।"
এরপর তিনি বললেন, "একটি হলো আল্লাহর কিতাব, অপরটি হলো আমার আহলে বাইত। এই দুটি কখনো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।" [আহলে বাইত: আলী (আ.), হাসান (আ.), হোসেন (আ.), ফাতেমা (সা.)]


হযরত আলী (আ.)কে মওলা ঘোষণা:
"মুমিনদের জীবনের উপরে তাদের নিজেদের চেয়ে কি আমি বেশি অধিকারপ্রাপ্ত নই?" একথা বলে উপস্থিত সাহাবীগণের সম্মতি আদায় করে নবীজি (সা.) হযরত আলী(আ.) এর হাত উঁচু করে ঘোষণা করেন, "আমি যার মওলা, অতঃপর এই আলী তার মওলা।" এছাড়াও তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ! যে তাকে সমর্থন করবে তাকে তুমিও সমর্থন কর; যে তার সাথে শত্রুতা করবে, তার সাথে তুমিও শত্রুতা কর; যে তাকে ভালোবাসবে, তাকে তুমিও ভালোবাস; যে তাকে ঘৃণা করবে, তাকে তুমিও ঘৃণা কর; যে তাকে সাহায্য করবে, তাকে তুমিও সাহায্য কর এবং যে তাকে সাহায্য থেকে বিরত থাকবে, তাকে তুমিও সাহায্য থেকে বিরত থাক এবং সে যেদিকে ঘোরে, সত্যকেও তার সাথে সেদিকে ঘুরিয়ে দাও।”
এবং তখন আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করেন:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়েদা : ৩)”
……………………………………………………………….
অতএব, এটাই স্বাভাবিক যে, মুহাম্মদ (সা.) এর ওফাতের পর মুসলমানেরা ইমাম আলী (আ.) কে মওলা হিসেবে গ্রহণ করবে, অর্থাৎ সকল বিষয়ে যেইভাবে নবীজি মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে যেত, ইমাম আলী (আ.) এর নিকটও সেইভাবে যাবেন। আর প্রথম নির্দেশনা অনুযায়ী কুরআন ও আহলে বাইতকে আঁকড়ে ধরবে, অর্থাৎ অনুসরণ করবে। মোদ্দা কথা, মুহাম্মদ (সা.) এর ঘোষণা মোতাবেক মুসলিম উম্মাহর অনুসরণ করতে হবে কুরআন, আহলে বাইত ও হযরত আলী (আ.)কে। কিন্তু নবীজি (সা.) এর ওফাতের পরে তা ঐক্যবদ্ধভাবে হয়নি, বরং এরপর থেকে ঐতিহাসিকভাবেই স্বল্পসংখ্যক মুসলিম নবীজির শেষ নির্দেশনা মেনে চলেছে বা এখনো চলছে। তখন থেকেই আহলে বাইতের অনুসারীরা একটি ধারা হলো, আর বাকি সিংহভাগ মুসলিম আরেকটি ধারা হলো (যথাক্রমে শিয়া ও সুন্নি নামে পরিচিতি / লেবেল / ট্যাগিং লাভ করলো)।


যদিও ফরম্যাটটা আমার পছন্দ না, তবুও সংক্ষিপ্ত রাখার স্বার্থে প্রশ্নোত্তর আকারে কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় দিচ্ছি।


  • “কুরআন, আহলে বাইত ও হযরত আলী (রা.)কে অনুসরণ করতে বলেছেন, তাহলে হাদীস গেল কই? রাসূল (সা.)-ই বাদ? অথচ আমরাতো শুনে এসেছি “কুরআন ও সুন্নাহ” অনুসরণের কথা।”
→ প্রথমতঃ, আহলে বাইতের ব্যাপারে হাদীসটি সর্বোচ্চ সহীহ বলে পরিচিত গ্রন্থগুলোর (সিহাহ সিত্তাহর) সহীহ সূত্রে প্রাপ্ত হাদীস আর মওলা ঘোষণার হাদীসটিতো মুতাওয়াতির হাদীস (সর্বোচ্চ সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস); অতএব অন্ততঃ বর্ণনাগুলি সত্য; আর যেহেতু নবীজি (সা.) এর আদেশ, সেহেতু সেটার উপর আগ বাড়িয়ে কথা বলা স্পর্ধাই বটে। দ্বিতীয়তঃ, কুরআন ও আহলে বাইত (ইমাম আলী (আ.)-ও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত) -- এই দুটির অনুসরণ করলে এর মাঝেই নবীজির পূর্ণাঙ্গ সুন্নাত পাওয়া সম্ভব, কেননা নবীজি (সা.) এর সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন তাঁরাই। এছাড়াও, কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ মানেই কি সুন্নাহ পরিত্যাগ? মায়ের আদেশ মেনে চলবে, একথার মানে কি পিতার অবাধ্য হও?


  • “রেফারেন্স?”
→ চাইলে দেব। ইচ্ছা থাকলে নিজেই বই / নেট ঘেঁটে বের করে নিতে পারবেন, তবুও চাইলে দেব।
  • “এতদিন তো এসব হাদীস শুনি নাই, গাদীরে খুম, মওলা আলী…?”
→ কেন শোনেন নাই, আমাদের দেশের হুজুররা এবং ঐতিহাসিকভাবে সিংহভাগ মুসলিম আলেম কেন এই হাদীসগুলি প্রচার করেন নাই, গোপন করেছেন, সেই ইতিহাস দীর্ঘ। কিন্তু আমি শুনি নাই মানেই যে তা ভুল, তা কিন্তু নয়। আমি আগে শুনিনি, এমন জিনিস যদি যাচাই করে দেখি সহীহ, সত্য -- তবে গ্রহণ করাই উত্তম। কারণ “মুমিনেরা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, অতঃপর তা থেকে যা উত্তম তা গ্রহণ করে।” (কুরআন)।
  • “শিয়ারা আলীকে মওলা বলে, মওলা অর্থ প্রভু, শিরক করে...”
→ একটা সুস্পষ্ট হাদীস আনার পর এজাতীয় কথা বলা বিস্ময়কর! তাহলে হযরত আবু বকর, হযরত ওমর -- উনারা কেন হযরত আলী (আ.) কে গিয়ে বললেন, আজ থেকে আপনি আমাদের মওলা? লক্ষাধিক সাহাবী কেন নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন না, মওলা মানে কী? সবচেয়ে বড় কথা, হযরত আলী (আ.) কে যদি মওলা মানতে আমার খটকা লাগে, তবে নবীজি (সা.) কেই জিজ্ঞাসা করা উচিত, কেন আপনি আলী(আ.) কে মওলা বললেন!
বরং বাস্তবতা হলো, মওলা শব্দের যেই যেই অর্থ মুহাম্মদ (সা.) এর উপর প্রযোজ্য, সেই সকল অর্থেই মওলা শব্দ ইমাম আলী (আ.) এর উপর প্রযোজ্য। নবীজি (সা.) আমাদের মওলা অর্থাৎ নেতা, অভিভাবক, শাসক, বন্ধু...। একইভাবে হযরত আলী (আ.)-ও আমাদের নেতা, অভিভাবক, শাসক, বন্ধু...।
  • “আহলে বাইত কারা?”
→ সর্বসম্মতভাবে হযরত আলী(আ.), ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হোসেন (আ.) ও হযরত ফাতেমা (সা.) -- এই চারজন হলেন আহলে বাইত। আল্লাহর রাসূলের স্ত্রীগণ আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন, সিহাহ সিত্তাহতে এর রেফারেন্স পাওয়া যায় (দেখুন “হাদীসে কিসা”তে স্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে নবীজি (সা.) এর উত্তর)।
  • “হযরত আলী (আ.) নবীজি (সা.) এর আহলে বাইত, মানে ঘরের লোক হন কিভাবে?”
→ “আয়াতে তাতহীর (৩৩:৩৩) এ আল্লাহপাক আহলে বাইতকে পবিত্র করার কথা বলেছেন। এছাড়াও ৪২:২৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “হে রাসূল! আপনি বলে দিন, আমি আমার রেসালাতের বিনিময়ে আমার নিকটাত্মীয়ের (প্রতি) ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাই না।” লক্ষ্যণীয়, আর কোনো নবী রাসূল বাণী পৌঁছানোর বিনিময়ে কিছু দাবী না করলেও মুহাম্মদ (সা.) তা করেছেন, এবং অবশ্যই আহলে বাইত সেই নিকটাত্মীয়ের অন্তর্ভুক্ত। এখন প্রশ্ন হলো, ইমাম আলী (আ.) তো নবীজি (সা.) এর চাচাতো ভাই। তিনি কিভাবে আহলে বাইত (ঘরের লোক) হন? যদিও হাদীসে কিসাতে নবীজি (সা.) এর সুস্পষ্ট ঘোষণাই আছে যে এই চারজন হলেন আহলে বাইত, তবুও, যদি নবীজি (সা.) এর মুখের বানীতে আমাদের হৃদয় সন্তুষ্ট না হয় তো কুরআনে এর ইঙ্গিত রয়েছে। নূহ (আ.)কে আল্লাহ তায়ালা যখন বললেন তোমার পরিবারকে উঠিয়ে নাও নৌকায়, তাদের উপর ভয় আসবে না, এবং কাফির পুত্রের মৃত্যুর পর নৌকা জুদি পাহাড়ে ঠেকলে অবতরণের পর নূহ (আ.) যখন আল্লাহকে বললেন যে কিন্তু আমার ছেলেতো আমার পরিবারের অংশ, তখন আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই তোমার ছেলে তোমার পরিবারের অংশ নয় (“আহল” নয়)। অর্থাৎ, যদিও রক্তের সন্তান, একই বাইত-এ (ঘরে) বসবাস, কিন্তু তবুও আল্লাহপাকের কাছে আহলে বাইত একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেছে, তা হলো, ঈমান-আমলের দিক থেকে যারা এক পরিবারের ন্যায়। (লক্ষ্যনীয়, এবং আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজেই তাঁর স্ত্রীকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেননি।)
  • “হযরত আলী (রা.) না বলে ইমাম আলী (আ.) বলা কেন? আলাইহিসসালাম তো নবীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। শিয়ারা আলীকে নবী মানে।“
→ এত সুস্পষ্ট দলিল পাবার পরও মনে এজাতীয় কথা আসা, এবং তা মুখে প্রকাশ করা নিতান্তই অগ্রহণযোগ্য। হযরত জিব্রাইল (আ.) কি নবী? মরিয়ম (আ.) কি নবী ছিলেন? আলাইহিসসালাম -- তাঁর উপরে সালাম -- এই কথার মাঝে কি কোনো দোষ আছে? বরং অন্যান্য সাহাবীর ক্ষেত্রে রাদিয়াল্লাহ আনহু বলার চল থাকলেও যেহেতু সাহাবীদের মাঝেও ইমাম আলী (আ.) বিশেষভাবে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত, আর যেহেতু আহলে বাইতের উপর সালাম প্রেরণের রেয়াজ আছে, তাই নামের শেষে আ. বলা / লেখা হয়।
  • “মওলা অর্থ বন্ধু, মুসলমানেরা পরস্পরের বন্ধু, রাসুলুল্লাহ (সা.) এটাই বুঝিয়েছেন।”
→ আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজে যেখানে বলে যাননি যে আমি মওলা বলতে হাবীব (বন্ধু) বুঝিয়েছি, সেখানে আমরা নিজেদের ইচ্ছামত অর্থ choose করার অধিকার রাখি কি? বরং সতর্কতা হিসেবে হলেও মওলা শব্দের সম্ভব সকল অর্থে হযরত আলী (আ.) কে গ্রহণ করতে হবে।
……………………………………………………..
শেষে এসে নবীজি (সা.) এর বিদায়ী ভাষণের ঐ বাক্যটি স্মরণ করা দরকার: “তোমরা এই দুই (কুরআন ও আহলে বাইত) এর সাথে কী আচরণ করো তা আমি দেখব।” কুরআন তো আমরা পড়িই না, আর “আলেম/হুজুর” হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ লোক ঐতিহাসিকভাবে আহলে বাইতের মান মর্যাদা গোপন করেছে সাধারণ মুসলমানদের থেকে, তাঁদের অনুসরণ যে ফরজ, তা গোপন করেছে, মওলা মুহাম্মদ (সা.) এর পর মওলা আলী (আ.) কে কিভাবে মানতে হবে, তা গোপন করেছে। ইমাম আলী (আ.) এর শিক্ষা গোপন করেছে। নিশ্চয়ই আমরা কুরআন ও আহলে বাইতের উপর যে অন্যায় করেছি / করছি, তা নবীজি (সা.) দেখছেন।


যেই আলে মুহাম্মদ এর উপর সালাম প্রেরণ না করলে নামাজই হয় না, সেই মুহাম্মদের বংশধারার সাথে মুসলিম উম্মাহর (অধিকাংশ) “আলেমদের (?!)” ঐতিহাসিক শত্রুতা নবীজি (সা.) ঠিকই দেখছেন। সম্ভবতঃ আমাদের এমন কাজের কারণেই নবীজি (সা.) কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন: “নিশ্চয়ই আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিল।”


এই অভিযোগ আর কারো বিরুদ্ধে নয়, এই আমাদেরই বিরুদ্ধে হবে, যদি আমরা এতকিছু জানা বোঝার পরও কুরআনকে ফেলে রাখি, আহলে বাইতের অনুসরণ না করি, ইমাম আলী (আ.)কে মওলা হিসেবে মানার নির্দেশ অমান্য করি। আর কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেই দিয়েছেন, আমাদের ঈমানই নেই যদি আমাদের অন্তরের ভিতরে আমরা নবীজির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিতৃষ্ণা / অপছন্দ অনুভব করি (৪:৬৫)। আর নবীজি (সা.) এর আগে বেড়ে যদি মওলা আলী (আ.)কে অমান্য করি, মওলা হিসেবে না মানার অজুহাত হিসেবে “মওলা বলতে বন্ধু বুঝিয়েছেন” এসব যুক্তি দেই, তবে আমাদের সকল কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে (৪৯:২)।
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের অন্তরের খরব জানেন, এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন: ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।


আসসালামু আলাইকুম ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সলিহিন।


নূরে আলম
সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬।

জিলহজ্জ্ব ১৮, ১৪৩৭।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…