সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি

ভূমিকা

বেশ কিছুদিন যাবৎ মানুষের হৃদয়ের জগত সম্পর্কে কিছু লেখার কথা ভাবছিলাম। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক বিষয়াবলী, এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ও চর্চার কিছু পথ। অথচ সেটা কিভাবে সম্ভব? যেখানে আল্লাহ তায়ালা নিজেই এই বিষয়গুলিকে প্রকাশ্য করেননি, বরং লুকিয়ে রেখেছেন কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আড়ালে।


আমরা জানি যে, ব্যাখ্যায় মূলভাবের মান কমে যায়। তবু আল্লাহ তায়ালা কুরআন দিয়েছেন, আবার তার ব্যাখ্যাকারকও দিয়েছেন। নাযিল অর্থ অবতরণ, নেমে আসা, উঁচু থেকে নিচুতে নামা। সদাজ্ঞানী আল্লাহপাকের থেকে মুহাম্মদ (সা.) এর অন্তরে যখন “ভাব” প্রদান করা হলো, তখনই তার মান কমে গেল, কেননা তাকে মানব-হৃদয়ে ধারণ করার মত করে আল্লাহপাক ব্যাখ্যা করলেন। তবু সেটা সর্বোচ্চ পর্যায়, কেননা কোন নূরই মুহাম্মদী নূরের সমান হতে পারে না। এরপর মহামানব মুহাম্মদ (সা.) যখন তাঁর অন্তরের এই ভাবকে আল্লাহর আদেশক্রমে সর্বোন্নত ভাষা আরবীতে প্রকাশ করলেন, তখন তার মান আরো কমে গেলো। আমরা পেলাম মহাগ্রন্থ আল কুরআন। সেই কুরআনেই যখন আধ্যাত্মিক বিষয়াবলীকে আমরা লুক্কায়িত দেখতে পাই, তবে প্রকৃত মহাসত্য না জানি কী রকম! এরপর যুগে যুগে ওলী-আউলিয়া, বড় বড় আ’রেফ -- তাঁরা নিজেদের কবিতায়, কথা ও কর্মে সেই “ভাব” এর প্রকাশ ঘটিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য আরো সহজ করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তারপর সেসব আধ্যাত্মিক কবিতার ব্যাখ্যা, তার ব্যাখ্যা, এবং তার ব্যাখ্যা...। ব্যাখ্যার শেষ নেই। এত ব্যাখ্যা কেন? আমরা জানি যে, যত সরলীকৃত করা হয়, ততই মান কমতে থাকে। তবু এটাই আল্লাহপাকের চিরন্তন নিয়ম।


আমরা এ-ও জানি যে, ভালোবাসা হলো অনুভবের বিষয়। ভালোবাসাকে যতই বর্ণনা করা হোক না কেন, যতক্ষণ তা মানব-হৃদয়কে দগ্ধ না করছে, ততক্ষণ সে ভালোবাসা মাথায় (intellectual mind-এ) রয়েছে, হৃদয়ে (spiritual soul-এ) প্রবেশ করেনি। তবুও, প্রেমের উপন্যাস পড়ে যেমন নিতান্ত বেরসিক মানুষও প্রেমের কলাকৌশল শেখে, এবং প্রেমও করে, তেমনি হয়ত আমরা আধ্যাত্মিক বিষয়াবলী সম্পর্কে নানান কথা (intellectual mind দ্বারা) পড়ে (spiritual sould-এ) খোদাপ্রেমে মশগুল হতে পারব। কারণ প্রতিটা মানুষই খড়ের গাদার মত, খোদাপ্রেমের আগুনের একটুখানি ফুলকিই তার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে।


আমি নিজের সীমা সম্পর্কে কিছুটা হলেও সচেতন, এবং “ভাব”-এর মূল ব্যাখ্যাকারী মুহাম্মদ (সা.) থেকে শুরু করে তাঁর নিচের সকল ব্যাখ্যাকারীর প্রতি সালাম ও ভক্তি জানিয়ে আমার ক্ষুদ্র সীমার ভিতরে কিছু অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টা করছি। আশা করছি যে, আমার পরিচিতজনদের জন্যে তা আগুনের ফুলকি হতে না পারলেও কিছুটা উত্তাপের উৎস হবে। আমার ভুলত্রুটির জন্যে আমি আল্লাহপাক ও তাঁর সকল ব্যাখ্যাকারীর নিকট ক্ষমা চাইছি। যে পবিত্র চেহারা আমাকে অনুক্ষণ আন্দোলিত করে চলেছে, সংযুক্ত করছে, মুহাম্মদী সূত্রের সেই মহান ব্যক্তির প্রতি সালাম। আমার এই কাজের কিছুমাত্র পুণ্য যদি হাসিল হয়, তবে উপকৃত সকল ব্যক্তির পক্ষ থেকে সেই ব্যক্তির জন্যে অনন্ত সালামের একটি সূত্র রেখে গেলাম।


নূরে আলম
মে ৮, ২০১৬।


অধ্যায় - ১ (আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা)

আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা অবশ্যই পূরণ হবে। অতএব, নিশ্চয়ই প্রতিটা মানুষ তার অন্তরে আল্লাহ তায়ালাকে এমনভাবে অনুভব করবে যে, তাতে কোনোই সন্দেহের অবকাশ থাকবে না (৪১:৫৩)। অতঃপর যে ব্যক্তি হৃদয়ে অনুভব করা স্রষ্টাকে মান্য করবে, সে মুক্তি পাবে, এবং যে ব্যক্তি সেই আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার (spiritual inspiration) বিপরীতে চলবে, সে বন্দী হয়ে পড়বে। সেই বিস্ময়কর মুহুর্ত যে কার জীবনে কখন কোন সূত্রে কিভাবে আসবে, তা বলা কঠিন। তবে অন্ততঃ এতটুকু বলা যায় যে, হয় আপনি তা ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন, নতুবা সামনে তা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। এমন এক মুহুর্ত, যখন আপনি সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তায়ালাকে অনুভব করছেন, যেদিকেই তাকাচ্ছেন, শুধু তাঁকেই দেখতে পাচ্ছেন। সমস্ত দেহ-মন-আত্মা যেন হঠাতই এক পবিত্র পানিতে বিধৌত হয়ে আপন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। জীবনের এই মহা ক্ষণটির কথা আপনি কাউকে বলতে পর্যন্ত পারছেন না, কেননা, প্রথমবারের মত অনুভব করতে পারছেন যে, স্রষ্টা আপনাকে কিনে নিয়েছেন, তাঁর অনুমতির বাইরে আপনার কিছুই করার শক্তি নেই।


এরপর স্থিতিশীল হলেন। দুনিয়ার দিকে তাকালেন। পতন হলো। জমজমের পানির মত স্বতঃস্ফূর্ত যে ধারা আপনার ভিতরে সৃষ্টি হয়েছিলো, তা শুকিয়ে গেল। আবার অন্ধকার। আবার পথিকের পথচলা। মনের কাছে এখন কেবল এতটুকু খবর আছে যে, সেই মহাক্ষণটি আমার জীবনে এসেছিলো, এবং আমি তা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সেতো কেবলই বর্ণনা। কেননা মস্তিষ্কের কাজ শুধু ঘটনার বর্ণনা সংরক্ষণ করা; আর হৃদয়ের কাজ হলো প্রেম, অনুভব, শিহরণ।


এরপর পথিকের পথচলা। চলতে চলতে খুঁজতে খুঁজতে কুরআন, মুহাম্মদ (সা.), আহলে বাইত (আ.) কিংবা ওলি-আউলিয়া, পীর-সূফি-দরবেশ যে কোনো এক সূত্রে হারানো আলো ফিরে পাওয়া। কিন্তু তা কি এতই সহজ? বিনা শ্রমেই আল্লাহ তায়ালা যে আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা দান করলেন, সেটাকে হারিয়ে ফেলার শাস্তিই হলো মেহনত। অতএব, এখন মেহনতের পথচলা শুরু। ঠিক যেভাবে জান্নাতের আরাম-আয়েসের জীবন ছেড়ে আদমকে (আ.) আসতে হয়েছিলো মেহনতের এই দুনিয়ায়।


এখন পথিককে মেহনত করতে হবে। মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া স্বতঃস্ফূর্ত জলধারাকে দেয়াল দিয়ে বেঁধে সে কূপে পরিণত করেনি, অতএব এখন তাকে কূপ খনন করতে হবে। কূপ খনন করতে করতে না জানি কত গভীরে গেলে আবার মাটি ফুঁড়ে পানির সন্ধান পাওয়া যাবে! যে আত্মা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে জেগে উঠেছিল, তাকে যতন না করার ফলে সে মরে গেল, এবার আল্লাহরই দেয়া বিধান মোতাবেক শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে কঠোর সাধনা করে সেই আত্মাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ, শরীয়তের বিধান, নামাজ রোজা হজ্জ্ব যাকাত আদব আখলাক্ব ইত্যাদি কঠোরভাবে যত চর্চা করব, ততই যেন কূপ গভীর হতে থাকবে। এবং কূপ খনন করতে করতে হঠাৎ করেই যেমন একসময় পানি উঠে আসতে থাকে, এই কঠোর শরীয়ত সাধনা করতে করতে হঠাতই একটা সময়ে আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত আত্মা জেগে উঠবে। আমরা লাভ করব দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান, ইনশাআল্লাহ।

অধ্যায় - ২ (দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান)

দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান কী?
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, “তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, সুতরাং তারা ফিরে আসবে না (২:১৮)।” অথচ এর মানে তো এই নয় যে তারা মেডিকাল সায়েন্সের দৃষ্টিতে বধির, বোবা ও অন্ধ। বরং এই অন্ধত্ব হলো প্রাথমিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তির অন্ধত্ব, অতঃপর মূলতঃ আত্মার অন্ধত্ব। অর্থাৎ, হৃদয়ের জগতে সে অন্ধ। কুরআনের আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন। “...নিশ্চয়ই চোখ অন্ধ হয় না, বরং বক্ষস্থিত হৃদয় অন্ধ হয় (২২:৪৬)।” তাহলে নিশ্চয়ই আমরা হৃদয়ের জগতে দেখতে পেতাম, অর্থাৎ আমাদের দর্শন (vision) ছিলো, এবং আমরা হৃদয়ের জগতে শুনতে পেতাম ও বলতে পারতাম! এবং কুরআনের সেই ওয়াদা (৪১:৫৩) অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা যখন আমাদেরকে আধ্যাত্মিকভাবে অনুপ্রাণিত করেন, তখন আমরা তা অনুভব করি / করেছি। কিন্তু নিজদোষে তা হারিয়ে ফেলেছি, তাই ফিরে পাবার জন্য আল্লাহ তায়ালা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন কুরআনে। যেন হৃদয়ের জগতে নিজেকে বন্দী করে ফেলার পরেও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে অন্ততঃ এটুকু বুঝতে পারি যে, হৃদয়ের জগতে একদা আমার দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান ছিলো, তা আমি হারিয়ে ফেলেছি; অতএব তা ফিরে পাবার জন্য চেষ্টা করা কর্তব্য।
এখন আমরা বুঝতে পারি যে, সূরা আর-রহমানে আল্লাহপাক বয়ান (কথা বলা) শিক্ষা দেয়া বলতে কী বুঝিয়ে থাকতে পারেন, কেননা, অনেক মানুষ এমনকি জন্মগতভাবেই কথা বলতে অক্ষম, কিন্তু হৃদয়ের জগতে আল্লাহ তায়ালা সকলকেই দিয়েছেন বয়ান, শ্রবণ ও দর্শন:
“আর রহমান (পরম দয়ালু),
আল্লামা আল কুরআন (শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন),
খালাক্বাল ইনসান (সৃষ্টি করেছেন মানুষ),
আল্লামাহু আল বায়ান (শিক্ষা দিয়েছেন বয়ান)।” (সূরা আর-রহমান, ৫৫: ১-৪)


আমাদের দেহ দেখা, শোনা ও বলার জন্য জৈবিক চোখ-কান-মুখের উপর নির্ভর করে। শুধু তা-ই নয়, আলো ও বাতাসের উপর নির্ভরশীল বলে আলোকে বাধা দিলেই আমরা আর দেয়ালের ওপারে জিনিস দেখতে পাই না, বাতাস না থাকলেই আর কিছু শুনতে পাই না। অর্থাৎ, বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে আমাদের দেহ কাজ করে; তার দেখা, শোনা ও বলাও তাই সীমাবদ্ধ। কিন্তু হৃদয়ের জগতে, আত্মার জগতে, রুহের জগতে এই সীমাবদ্ধতাগুলি নেই। অতএব, একজন আধ্যাত্মিক সাধকের পক্ষে এটা খুবই সম্ভব যে, তিনি অন্য যেকোনো মানুষের হৃদয়ে সরাসরি কথা বলবেন, হৃদয় থেকে হৃদয়ে যোগাযোগ স্থাপন করবেন, তা সেই ব্যক্তি দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন; এমনকি দেহত্যাগকারী আত্মার সাথেও। একইভাবে তাঁদের পক্ষে বস্তুগত ও অবস্তুগত জগতের নানান চিত্র দেখা সম্ভব, এমনকি জেলখানার অন্ধকার কুঠুরিতে বসেও। তাই এজাতীয় বর্ণনা যখন বড় বড় ওলি-আউলিয়াদের সম্পর্কে শোনা যায়, সেগুলিকে না বুঝে উপহাস বা অস্বীকার করা উচিত নয়। যদি আল্লাহর কোনো ওলী সম্পর্কে শোনা যায় যে, তিনি আল্লাহ রাসূলের (সা.) থেকে সরাসরি হেদায়েত গ্রহণ করেন, কিংবা ইমামে যামানার থেকে দিকনির্দেশনা পান, তবে সেটা অসম্ভব কিছু নয়। নাকি নবীজির (সা.) কাছ থেকে সরাসরি হেদায়েত গ্রহণের সৌভাগ্য শুধু অল্প কিছু মানুষের জন্য নির্ধারিত, আর তাঁর দেহত্যাগের পরে আগত সকল মুসলমান সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত? এ-ই কি আল্লাহর ন্যায়বিচার?


না, বরং নবীজির (সা.) জীবদ্দশাতে তাঁর দুই প্রকার সাহাবী ছিল। একপ্রকার ছিলেন বাহ্যিক সাহাবী, অর্থাৎ বাহ্যিক সঙ্গী। আরেক প্রকার ছিলেন রুহানী বা আত্মিক সাহাবী: হৃদয়ের জগতে যিনি মুহাম্মদের (সা.) খাঁটি অনুসারী, মুহাম্মদের (সা.) সঙ্গী। বাহ্যিক সাহাবীদের মাঝে অনেকে মুনাফিক ছিলো। কিন্তু যারা আত্মিক সাহাবী, তাদের মাঝে কখনো মুনাফিক থাকা সম্ভব নয়। এমনকি তাদের মাঝে এমন ব্যক্তিও ছিলেন, যিনি কখনো নবীজির চেহারা চোখ দিয়ে দেখেন নাই। তবুও তিনি মুহাম্মদের (সা.) সাহাবী, প্রকৃত সাহাবী, রুহানী সাহাবী।
আল্লাহ রাসুল (সা.) দেহত্যাগের পর তাঁর বাহ্যিক সাহাবী হবার পথ বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকৃত সাহাবী, রুহানী সাহাবী হবার পথ খোলা রয়েছে। অতএব, নিশ্চয়ই চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে এমনকি আমাদের পক্ষেও নবীজির (রুহানী) দর্শন লাভ করা সম্ভব, তাঁর কাছে আমাদের হৃদয়ের ব্যথা-বেদনাগুলি খুলে বলা সম্ভব। নিশ্চয়ই এটা সম্ভব, বরং আমাদের মত গুনাহগার মানুষেরা এটার জন্যে সবচেয়ে বেশি কাতর, সবচে’ বেশি মুখাপেক্ষী। তবে হ্যাঁ, মুহাম্মদের (সা.) রুহানী সঙ্গী হতে হলে মেহনত করতে হবে বৈকি! আর সেই মেহনতের পথ যুগে যুগে ইমাম ও ওলী-আউলিয়াগণ দেখিয়ে গেছেন...।


মানুষ মৃত নয়, আত্মার ধ্বংস নেই, আমরা কবরবাসীদেরকে সরাসরি সালাম দিয়ে বলি, “আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর”। নবীজিকে (সা.) আমরা সালাম দিলে তিনি জবাব দিয়ে থাকেন। অতএব, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, সাহায্য করুন!” একথা বলতে কিসে আমাদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে? শাফায়াতের দরজা খোলা রয়েছে, এবং দয়াল নবীর সাহায্যও আমাদের জন্য প্রতিশ্রুত আছে, কেবল আমাদের প্রার্থনাগুলিকে একটু সাজিয়ে সুন্দর করবার অপেক্ষা। প্রার্থনার সৌন্দর্য বিষয়ে আরেকদিন আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। ততদিন পর্যন্ত অন্ততঃ বেশি বেশি দরুদ পাঠকে জারি রাখি, কেননা, নবীর উপর দরুদ প্রেরণ করলে তিনিও আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, আর আমাদের দোয়া কবুল না-ও হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর হাবীব মুহাম্মদ (সা.) এর দোয়ার মর্যাদা আল্লাহপাকের নিকট সবচেয়ে বেশি।

অধ্যায় - ৩ (নানা মত, নানা পথ)

হৃদয়ের জগতে আধ্যাত্মিক দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান লাভ করার একাধিক পথ থাকতে পারে। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা মানুষের হৃদয়ে ইলহাম (spiritually inspire) করতে পারেন। আবার, দুনিয়ার সকল দুয়ার যখন একজনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তখন আল্লাহর দুয়ার খুলে গিয়ে মানুষ হৃদয়ের জগতে প্রবেশ করতে পারে। কিংবা নবী, রাসুল, ইমাম, ওলি-আউলিয়ার মাধ্যমে মানুষ আধ্যাত্মিক যাত্রার পথ চিনতে পারে। আল্লাহ তায়ালার প্রাকৃতিক নিদর্শন নিয়ে গভীর চিন্তা একজনকে আধ্যাত্মিক জগতের ইঙ্গিত দিতে পারে। অর্থাৎ, এর নানান পথ রয়েছে।

অপরদিকে, নামাজ রোজা পালনকারী মানুষ, অর্থাৎ কেবলমাত্র মুসলমানের জন্যই যে খোদাপ্রেম ও জান্নাত এক্সক্লুসিভ, তা আমরা মনে করি না। ইসলামের বাণী সকল মানুষের কাছে যথাযথভাবে না-ও পৌঁছাতে পারে। কিন্তু জান্নাত-জাহান্নাম ও বিচার পৃথিবীর সকল মানুষের জন্যেই। তবে আল্লাহর বিচারের নিয়ম কী?

সূরা বাকারার ৬২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদী, খ্রিষ্টান ও সাবী, -- যে কেউ ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, শেষ দিবসের উপর এবং সালেহ (উপযুক্ত, ভালো) কর্ম করবে, তাদের পুরস্কার তাদের রবের নিকট রয়েছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঈমান ও মানবতার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। এই তিনটি বিষয় ধর্ম-বর্ণ-পরিবার-পরিবেশ নির্বিশেষে যে কোনো মানুষের পক্ষেই পালন করা সম্ভব, এমনকি যদি সে আল্লাহ তায়ালাকে “আল্লাহ” শব্দ দিয়ে না-ও জেনে থাকে, কেবল আল্লাহপাকের গুণগুলি দ্বারা আল্লাহ তায়ালাকে চেনে, এবং সেই আল্লাহতে ঈমান আনে।

আবার, জন্মের উপর কারো হাত থাকে না। আল্লাহ তায়ালা এই দুনিয়াতে প্রতিটা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ-পরিবারে প্রেরণ করেছেন। এমতাবস্থায় এটা কিভাবে ন্যায়বিচার হতে পারে যে, সকল মানুষের জন্য সমান আইন ও সমান শাস্তি-পুরস্কার প্রযোজ্য হবে? যে ব্যক্তি অশ্লীল পরিবার-পরিবেশে জন্ম নেয় ও এগুলো দেখে বড় হয়, সে ব্যক্তি কি তার সমান, যার জন্ম একটি আধ্যাত্মিক ধর্মীয় পরিবারে? প্রতিটা মানুষের চারিপাশের পরিবেশ ভিন্ন, যার উপর তার হাত নেই। আল্লাহপাক শুরুতেই সকলকে সমান দেননি, কিভাবে এটা সম্ভব যে তিনি সকলকে এক নামাজ-রোজা-হজ্জ্ব-যাকাতের শরীয়তের ভিত্তিতে বিচার করবেন?

বরং আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষের মাঝে যে বিষয়গুলিকে এক রেখেছেন, তার ভিত্তিতেই বিচার করবেন। আর তা হলো আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা (৪১:৫৩), আক্বল (৮:২২) ও বিবেক (৭৫:২, ৯১:৮)। আর এই তিনটির ব্যবহার করেই সকল মানুষের পক্ষে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব, এটিই সাফল্য, এখানেই আল্লাহ তায়ালার ন্যায়বিচার। এই জন্মগত সহজাত গুণগুলি ব্যবহার করেই তার পক্ষে শেষ বিচারের দিনে বিচার্য বিষয়গুলিতে (২:৬২) উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব। নতুবা দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া সন্তানটির উপর অবিচার করা হয়েছে বলা যেত। কিন্তু না! সেটি চলার পথের একটি অংশমাত্র।

নানান মানুষ নানান প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায়, অতএব, খোদামুখী যাত্রায় সকলের পথ একই হবে না, একই পন্থা-পদ্ধতি হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই খোদামুখী যাত্রায় নানান পথের অস্তিত্বকে আমরা অস্বীকার করি না। সুফি দরবেশদের আধ্যাত্মিক চর্চার নানান পদ্ধতিকেও আমরা বাতিল করে দিই না। এমনকি ইসলাম-বহির্ভূত আধ্যাত্মিক সাধনার পথকেও আমরা অস্বীকার করি না। তবে যেহেতু আল্লাহর অশেষ রহমতে ইসলামের স্পর্শ আমরা পেয়েছি, শরীয়তকে মা’রেফাতের ধারণপাত্র জেনেছি, তাই দুনিয়ার বুকে আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ পথ, ইসলামকেই আমরা আধ্যাত্মিক চর্চার জন্য সর্বোত্তম বলে বেছে নিয়েছি। সেটা আধ্যাত্মিক চর্চার নানা পথের সাথে সহাবস্থান করেই।

আর এই ঐতিহাসিক আধ্যাত্মিক যাত্রায় মানুষের পথপ্রদর্শক হয়েছেন নবী-রাসূল ও ইমামগণ। এবং তাঁদের অনুসারী ওলি-আউলিয়া, পীর/সূফি/দরবেশগণ। সেই ব্যক্তি সৌভাগ্যবান, যে ব্যক্তি একজন প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধকের তত্ত্বাবধানে তার জীবনকে পরিচালিত করার সুযোগ পেয়েছে। এটিই হলো পীরের অনুসরণ। কিন্তু যাদের সে সৌভাগ্য হয়নি, তাদের জন্য চলার আরো পথ রয়েছে, যদিও তা কষ্টকর (তবে, নিশ্চয়ই কষ্টের পুরস্কার রয়েছে)। পীর/ওস্তাদ  প্রসঙ্গে এখানে আলোচনার তেমন কোনো সুযোগ নেই, তবে কেউ যদি তার বিবেক/বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে এবং হৃদয় দিয়ে অনুভব করে কোনো ধার্মিক ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুলের (সা.) প্রকৃত অনুসারী পথপ্রদর্শক হিসেবে চিনতে পারে, তবে তার জন্য উচিত, এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্যতামূলক হয়ে যায় সেই ওস্তাদ/পীরের অনুসরণ করা।

একজন ইনসানে কামেলের তত্ত্বাবধানে যেভাবে মানুষ তার আধ্যাত্মিক যাত্রাকে পরিচালিত করে, সে কথা আমরা এখানে লিখছি না, কেননা তা একটি ব্যবহারিক বিষয়। আমরা কেবল ইসলামী শরীয়তের সীমার মধ্যে কিছু চর্চা ও তার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের চেষ্টা করছি, যাকে এই যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। আল্লাহ চাহেন তো এই পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করলে আমাদের হৃদয়ের পর্দা আমরা কিছুটা হলেও ছিন্ন করতে পারব, এবং হয়ত একজন প্রকৃত খোদাপ্রেমিকের নূর দ্বারা সংযুক্ত হবো!

মে ১৩, ২০১৬।

অধ্যায় - ৪ (আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ: বিচ্ছিন্নকরণ)

তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি হলো আধ্যাত্মিক যাত্রার অনেকগুলো লক্ষ্যের প্রথম লক্ষ্য (মাইলস্টোন)। আধ্যাত্মিক যাত্রার পথিক চায় খোদাপ্রেমে মশগুল হতে, অথচ তার হৃদয় দুনিয়ার প্রেমে মশগুল। এমনকি যদি সে মানুষ বাহ্যিকভাবে শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন না-ও করে থাকে, তবুও এমন হৃদয়কে আমরা বলি অবিশুদ্ধ হৃদয়, কলুষিত হৃদয়। কলুষিত হৃদয় প্রেম করতে পারে না। প্রকৃত প্রেম বিশুদ্ধ অন্তরের কাজ। এর বাইরের যত প্রকার প্রেম, তার সবই লালসার ছদ্মবেশ। একটি কলুষিত হৃদয় খোদাপ্রেম তো করতে পারেই না, এমনকি মানব-প্রেমও সে উপভোগ করতে পারে না। সে কেবলই নানান ছদ্মবেশে নিজের লালসা চরিতার্থ করে থাকে। এভাবে, যারা খোদাপ্রেমে নেই তারা দুনিয়াকেও উপভোগ করতে পারে না, দুনিয়ার মানুষের সাথেও তাদের ভালোবাসা হয় না। যা হয় তা লালসা। দুনিয়া এভাবে মানবাত্মাকে ঘুরিয়ে মারে, হয়রান করে ছাড়ে।

যাহোক, মানব প্রেম বাদ দিয়ে কোনো খোদাপ্রেম নেই। এ বিষয়ে আরেকদিন আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। কিন্তু এই কলুষিত হৃদয় নিয়ে পথিক খোদাকেই বা ভালোবাসবে কিভাবে, আর মানব-প্রেমই বা করবে কিভাবে! হায়রে মানুষ! প্রেমের মত পবিত্র একটি জিনিসের ছদ্মবেশে সে কিভাবেই না নিজের লালসা চরিতার্থ করছে! খোদামুখী যাত্রার পথিক যখনই নিজেকে এই অবস্থায় আবিষ্কার করবে, তখনই সে নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। অথচ সে পথ জানে না। দুনিয়াপ্রেমের পর্দায় তার হৃদয় আগাগোড়া আবৃত। এখন হঠাতই সে জেগে উঠেছে যেন। ক্রমশঃ দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, জেগে উঠে তার আত্মা খোদার সান্নিধ্যে একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চাইছে, কারণ সে আত্মা এতদিনে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পেরেছে। এর আগ পর্যন্ত পথিক মনে করত, তার দেহটাই সে। কিংবা মুখে দেহ আর আত্মা -- দুটি বিষয়কে স্বীকার করলেও কার্যতঃ দেহই ছিল সব।

দেহ দৃশ্যমান, আত্মা অদৃশ্য। দেহ একটি স্থূল সৃষ্টি, আত্মা একটি সূক্ষ্ম সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা এই দুটিকে সূক্ষ্ম সংযোগ সুতায় যুক্ত করে দিয়েছেন। মানুষ তার আত্মার উপর যুলুম করতে করতে আত্মাকে দুর্বল করে ফেলেছে, বন্দী করে ফেলেছে, আবৃত করে ফেলেছে। আত্মাকে করে ফেলেছে দেহের দাস, দুনিয়ার দাস। তারই নিজের দেহ ও তারই চারিপাশের পরিবেশ তার আত্মাকে শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলেছে চতুর্দিক থেকে। অথচ এর বিপরীতটা হওয়ার কথা ছিলো: আত্মার চাহিদানুযায়ী দেহ পরিচালিত হবে, নিয়ন্ত্রিত হবে চারিপাশের পরিবেশ। যাহোক, তাকে এখন এই শেকল ছিন্ন করতে হবে।

দুনিয়া যে তাকে কতকিছুর ছদ্মবেশেই না দাস করে রেখেছে! দুনিয়া ও দেহ -- উভয়েই নিজের চাহিদা পূরণ করে চলে, আত্মাকে হয়রান করে মারে। আর যখনই আত্মা জেগে উঠতে চায়, শেকল ছিন্ন করে একটিবার বিশুদ্ধ অন্তরে নিঃশ্বাস নিতে চায়, তখনই দুনিয়া তাকে নানান বুঝ দেয়। এই বুঝ, এই ছলনা যে কতভাবে কত দিক দিয়ে আসতে পারে, পথিকের কোনো ধারণাই নেই! আহা, কতই না চমৎকার হতো, যদি এই পথ পার করে আসা একজন ওস্তাদ/গুরু/পীর/ইনসানে কামেল তার সামনে এই ছলনাগুলি উন্মোচন করে দিত! কতই না সহজ হতো পথিকের পথচলা!

কিন্তু তা একটি ব্যবহারিক বিষয়। এছাড়াও, দুনিয়া ও দেহের এসকল নানারূপী ছলনার সমাধানের আলোচনাও মুখে বা লিখিত আকারে করা সঙ্গত নয়। কেননা, হয়ত অপর এক ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ঐ প্রতারণার কথাটি জানতই না, সেটি সে জানলো, এবং তার দেহ সেই কৌশলটি জেনে তাকেই হয়রান করলো। একারণে যুগে যুগে ইনসানে কামেলগণ মানুষকে আত্মশুদ্ধির সাধারণ বিষয়গুলি প্রকাশ্যে বলেছেন। আর শিষ্য যখন গুরুর কাছে গিয়েছে তার ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে, তখন সেটির সমাধান করেছেন।

তাহলে, দুনিয়া ও দেহের দাস এই কলুষিত হৃদয়কে আল্লাহর দাস বানানোর উপায় কী? প্রথম ধাপ হলো বিচ্ছিন্নকরণ। (খোদার সাথে) সংযুক্ত হতে হলে প্রথমে বিচ্ছিন্ন হতে হবে (দুনিয়া ও দেহ থেকে)। আল্লাহ এমন কোনো হৃদয়কে তাঁর প্রেম দেবেন না, যে হৃদয় দু-মিনিট পরই ছুট দেবে দুনিয়াপ্রেমে মশগুল হতে। আল্লাহ সে হৃদয়কে বড়জোর করুণা দেবেন, কিন্তু প্রেম নয়। পরম করুণাময়ের সেই করুণা-ই অবশ্য আমাকে আত্মশুদ্ধি করতে সাহায্য করবে, দুনিয়া ও দেহের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই বিচ্ছিন্নকরণই হলো আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি। দুনিয়া ও দেহের শৃঙ্খলগুলি থেকে মুক্ত হয়ে গেলেই ইনশাআল্লাহ সম্ভব হবে আধ্যাত্মিক যাত্রার পথে প্রথম পদক্ষেপ নেয়া। আর শরীয়তের বিধিবিধানের মধ্যদিয়ে দুনিয়া ও দেহের এই লালসা থেকে নিজেকে কিভাবে মুক্ত করা যায়, তার-ই কয়েকটি বিষয় আমরা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। প্রথমেই এই আলোচনাটি পেশ করার উদ্দেশ্য এই যে, পথিক যেন বিচ্ছিন্নকরণের প্রতিটা কাজকে প্রাথমিক লক্ষ্য তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধির সাথে relate (সম্পর্কিত) করতে পারে। তার কাছে যেন পূর্বপ্রস্তুতিমূলক এসব কাজের কোনোটিকেই উদ্দেশ্যহীন মনে না হয়।

যাহোক, আজকের আলোচনার শেষে অন্ততঃ এতটুকু স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রকৃত প্রেম বিশুদ্ধ অন্তরের কাজ। এর বাইরের সমস্ত প্রেমই লালসা। লালসা মানুষের আত্মাকে দাস বানিয়ে ফেলে। আর আল্লাহ তায়ালা শিরক পছন্দ করেন না। এটা কিভাবে সম্ভব যে, আমি একইসাথে দুনিয়া, দেহ, প্রবৃত্তির দাস হবো, আবার আল্লাহরও দাস হবো? আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দা হতে হলে, প্রকৃত ইবাদত করতে হলে, খাঁটি মুসলিম (আত্মসমর্পনকারী) হতে হলে আর সকল দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতেই হবে। দুনিয়া, দেহ ও প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতেই হবে। আত্মশুদ্ধির এই প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জিত না হলে আমরা এমনি শিরক-মুক্তও হতে পারব না। অতএব, আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত তাযকিয়ায়ে নফস, বা আত্মশুদ্ধি। সেই আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ হলো বিচ্ছিন্নকরণ। দুনিয়া আমাদেরকে কোথায় কোথায় বন্দী করে ফেলেছে ও তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার উপায় কী, সে প্রসঙ্গে পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।

“নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি) করে,
এবং তার রবের প্রশংসা করে, অতঃপর নামাজ আদায় করে।” (সূরা আলা, ৮৭:১৪-১৫)

অধ্যায় - ৫ (দেহের দাসত্ব)

আল্লাহ তায়ালা এই দেহের মাঝে আমাদেরকে থাকতে দিয়েছেন কিছুদিনের জন্য। দেহটাকে তাই এমনভাবে যত্ন করে রাখতে হবে, যেন তাতে আত্মার কোনো কষ্ট না হয়। ঠিক যেভাবে আমরা মেহমানকে একটি ঘরে থাকতে দিই, এবং ঘরটিকে পরিপাটি করে রাখি। কিন্তু যদি মেহমানকে বলি ঘর পরিষ্কার করতে, ঘর রঙ করতে, ঘর মেরামত করতে, ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে, ঘরের আসবাবপত্র নতুন করে সাজাতে...। তাহলে সেটা হবে মেহমানকে কষ্ট দেয়া, মেহমানের অপমান। আর এমনটা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ঐ ব্যক্তি একসময় ভুলেই যাবে সে সে এ বাড়ির মেহমান ছিলো। একসময় সে নিজেকে গৃহকর্মী / দাস মনে করতে শুরু করবে, এবং ঐসব কাজকেই কর্তব্যের ন্যায় পালন করতে থাকবে। অথচ মেহমানের সুবিধা-অসুবিধা অনুযায়ী ঘরের দরজা-জানালা খুলবে, আসবাবপত্র আসবে-যাবে, খাদ্য-পানীয় আসবে যাবে -- এটাই কি হওয়া উচিত ছিল না?

আমাদের দেহের সাথে আত্মার সম্পর্ক একইরূপ। দেহের মাঝে আত্মার বাস। আত্মা হলো মেহমান, দেহ হলো ঘর। আত্মার প্রয়োজন মোতাবেক দেহ পরিচালিত হবে, সেটাই হওয়া উচিত। অথচ আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, আত্মা বলে যে একটা কিছু আছে, তা-ই ভুলতে বসেছি, আত্মার প্রয়োজন তো দূরের কথা। আমাদের আত্মা কী চায়? সে কোথা থেকে এসেছে? কোথায়ই বা যাবে? কিসে আত্মার ভালো লাগে? কিসে লাগে কষ্ট?
নাহ, কিছুই জানি না আমরা তার। অথচ সেটাই “আমি”। মাওলানা রুমি যেমনটা বলেছেন:
I am not this hair, not this skin
But the soul, that lives within.

ট্যুরিস্ট যদি সমুদ্র দেখতে এসে একটি হোটেলে রাত্রিযাপন করে, আর পরদিন সেই সমুদ্রের কথা ভুলে যায়, তো কেমন হলো? তারপর থেকে সে দিনরাত ঐ হোটেল রুমে বন্দী হয়ে থাকলো। তো কেমন হলো? তেমনি হয়েছে আমাদের অবস্থা। আল্লাহপাক দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এই দেহের মাঝে, ঠিক যেন সমুদ্রতীরের হোটেলরুম; আর প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার মত আমাদের আত্মার কাজ হলো দিনরাত নানারূপে খোদার প্রেমে ডুবে থাকা, খোদাপ্রেম সন্ধান করা, প্রেম-ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া। অথচ আমরা তা বেমালুম ভুলে গিয়ে দেহের চাহিদা মোতাবেক চলছি। আত্মার চাহিদা খোদাপ্রেম, তাই দেহ মাঝরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে ঘুম ভেঙে উঠে পড়বে -- এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিলো! কিন্তু তা না হয়ে যদি এমনটা হয়, দেহের ক্লান্তির কারণে নামাজ মিস হয়ে গেল, হোক সেটা তাহাজ্জুদ কি ফজর -- তো কেমন হলো?

যেই দেহ ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে -- একদিন কেনো, হয়ত আর একটি মুহুর্ত পরেই চলে যেতে হবে, সেই দেহের চাহিদা মিটাতে গিয়ে আত্মাকে ভুলে গিয়েছি। দেহত্যাগের পর এই আত্মা খোদার কাছে গিয়ে কী জবাব দেবে?

হ্যাঁ, দেহটাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার যত্ন-আত্তি প্রয়োজন। কিন্তু এই দেহ আমাদেরকে এমনই দাস বানিয়ে ফেলেছে যে, সেই যত্ন-আত্তির আর কোনো সীমা রাখছে না। কিছু হলেই দেহ আমাদের মস্তিষ্ককে বলছে: খাদ্য দাও, খাদ্য দাও। এই খাবো, ওই খাবো, এখানে খাবো, ওখানে খাবো। এই কাপড়ে চলছে না, নতুন কাপড় কেনো। দেহের আরাম আয়েসের জন্য এই বস্তু কেনো, সেই বস্তু কেনো। আর এতসব কিছু করার জন্য এত এত টাকা কামাই করো। আর সেই টাকা কামাই করতে দিনরাত ছুটে মরো।
এ-ই তো দেহের আদেশ, তাই না?
এরপর যখন কেউ এসে আত্মার মুক্তির কথা বলে, বুঝাতে চেষ্টা করে যে দেহ নানান ছলনা করে তোমাকে দাস বানিয়ে ফেলেছে, তখন আমরা নিজেরাই দেহের পক্ষ হয়ে যুক্তি খাড়া করি: “আরে ভাই, দুনিয়াতে তো চলতে হবে, চলতে হলে টাকা লাগবে, বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস, খোদাপ্রেমের কথা বললে তো আর খাবারের প্লেট সামনে এসে হাজির হবে না…” ইত্যাদি।

এটা প্রত্যেক ব্যক্তির নিজেকেই উপলব্ধি করতে হবে। যেহেতু সে নিজে গাফিলতি করে দেহের দাসে পরিণত হয়েছে, এখন তাকে নিজেই নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে এই দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। দেহের অসীম চাহিদাকে তৃপ্ত করা বন্ধ করতে হবে। এই কাজটি পথিকের নিজেকেই করতে হবে। ওস্তাদ/গুরু/ইনসানে কামেল কেবল স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন, পথ দেখাতে পারেন মাত্র।
“অতএব, স্মরণ করিয়ে দিন, যদি স্মরণ করানো তাদের জন্য উপকারী হয়...” (সূরা আ’লা, ৮৭:৯)

তো, এই হলো সংক্ষেপে দেহের দাসত্ব। আল্লাহ তায়ালা শিরক পছন্দ করেন না। এটা কিভাবে সম্ভব যে আমরা একইসাথে আল্লাহর দাসত্ব করবো, আবার দেহেরও দাসত্ব করব? অতএব, দেহের দাসত্ব অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। সমাজের কথা, লোকের কথা, কোনো কথাতেই আর কান দেওয়া যাবে না। উপলব্ধি হওয়ামাত্র দেহের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে হবে। দেহ তখন আরো বেশি বেশি চাইবে। কিন্তু না, তাকে কিচ্ছু দেয়া যাবে না। আরাম আয়েসের সবকিছু ত্যাগ করতে হবে। খাদ্যের ক্ষুধা, যৌন ক্ষুধা, দেহের আরাম -- এই তিনটা কলুষ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত না দেহের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, ততদিনের জন্যে এমনকি সবকিছু ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়াই উত্তম! দেহের দাসত্বের চেয়ে বরং সেটা উত্তম। কেননা, এই দেহই আমাদেরকে আমাদের লক্ষ্য ভুলিয়ে দিয়েছে। আমরা যে খোদামুখী মহান আধ্যাত্মিক যাত্রার পথিক, সেকথা আমরা ভুলতে বসেছি। খোদাপ্রেমের সেই চূড়ান্ত লক্ষ্য যখন আবারো জানতে পেরেছি, প্রথম কাজই হলো তখন দেহের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসা। তবেই না যাত্রা শুরু হবে!

মে ১৫, ২০১৬।

অধ্যায় - ৬ (কুরবানি)

আগের অধ্যায়ের শেষে লিখেছিলাম যে দেহের দাসত্বের চেয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়াটাই উত্তম। এই কথায় যদি আপনার মনে খটকা লেগে থাকে (যে সন্ন্যাসবাদ তো ইসলামে নেই), তাহলে জেনে নিন যে, আত্মশুদ্ধির প্রবল আবেগ আপনার ভিতরে জাগেনি, কোনো ঢেউ নেউ সেখানে। কেননা, দুনিয়ার দাসত্বে যার দম বন্ধ হয়ে আসছে, সেই পথিক যখন মুক্তির উপায় হিসেবে জানবে আত্মশুদ্ধিকে, আর জানবে যে আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ বিচ্ছিন্নকরণ, তখন কি আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষা করবে সে? ডুবন্ত মানুষ কি সাঁতার-কৌশলের লেকচার শোনার অপেক্ষা করে? সে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচার চেষ্টা করে। দুনিয়া যদি সত্যিই আপনার দম বন্ধ করে ফেলত, তবে নিশ্চয়ই এই দুনিয়াকে ত্যাগ করে ছুটে বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করতেন। খাদ্যের ক্ষুধা, যৌন ক্ষুধা, আরাম আয়েস -- সবগুলিকে খাদ্য দেয়া বন্ধ করে দিতেন সাথে সাথে। কিন্তু না, আপনি এখনো সতর্ক। আপনি হৃদয়ের  জগতে প্রবেশ করেননি।

কেননা সতর্কতা হলো মস্তিষ্কের (intellectual mind এর) কাজ। আর আবেগ, প্রেম ইত্যাদি হলো হৃদয়ের কাজ। যে ব্যক্তি খোদাকে পাবার জন্যে অস্থির হয়ে গেছে, আর দেহের দাসত্বকে সেই পথের বাধা হিসেবে দেখছে, সেতো মুহুর্তেই এগুলি ত্যাগ করবে। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে খোদার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, আয় খোদা! আমি তোমার জন্যে সব ছেড়ে এসেছি, আমি দেহের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছি, এখন তুমি আমাকে কবুল করে নাও!

কিন্তু যদি তা না হয়ে থাকে, বরং “খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়ে, স্ত্রী-সংসার ত্যাগ করে জঙ্গলে গিয়ে সন্ন্যাসী হবো -- এটাই কি নবীর পথ নাকি” এজাতীয় চিন্তা আপনার মাথায় এসে থাকে, তাহলে আপনি খুবই দুঃখজনক অবস্থায় আছেন। আপনার ভিতরে আত্মশুদ্ধির কোনো আবেগ সৃষ্টি হয়নি। হৃদয়ে ঢেউ জাগেনি। এমন হৃদয় “আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতিমূলক আলোচনা” পড়ে কী করবে? এ আলোচনাতো হৃদয়ের ঢেউ জাগায়নি, এ আলোচনা গিয়েছে মস্তিষ্কে (intellectual mind-এ), আর সেখানেই বসে রয়েছে ভয়ানক দানব: দুনিয়া-দেহ-প্রবৃত্তি। তাই সে আপনাকে চিন্তা করাচ্ছে, ভাবাচ্ছে: “সন্ন্যাসবাদ তো ইসলামে নেই, এসব তো নবীর পথ নয়!” ইসলামী যুক্তির আড়ালে আপনার প্রবৃত্তি বাঁচতে চাইছে। এখন দেখছেন, দুনিয়ার ছলনা কত রূপে আসে!

অথচ আপনি যদি অন্ততঃ আবেগের একটি মুহুর্তে শুধুমাত্র খোদার উপর ভরসা করে সবকিছু ছেড়ে দিতেন, বাহ্যিকভাবে না হোক, অন্ততঃ আত্মিক-মানসিকভাবে ত্যাগ করতেন দুনিয়া-দেহ-প্রবৃত্তি-আরাম-আয়েশকে, তাহলে কি আল্লাহ তায়ালাই আপনাকে বলতেন না যে, “তুমি ফিরে যাও, জগত সংসার ত্যাগ কোরো না, এটা হাবীব মুহাম্মদ (সা.) এর পথ নয়” ? বরং আমরাতো আল্লাহর উপর ভরসাই রাখি না! আল্লাহকে রব (পালনকর্তা) মানি না। যদি আল্লাহকে পালনকর্তা-ই মানতাম, তবেতো কেবলমাত্র তাঁর উপর ভরসা করেই সব ছেড়ে দিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে বলতাম, “মা’বুদ, আমি সব ছেড়ে দিয়েছি, তুমি আমার রব, তুমি আমাকে কবুল করো!”

ইবরাহীম (আ.) কি সন্তানকে কুরবানি করার নির্দেশ স্বপ্নে পেয়ে একবারের জন্যও ভেবেছেন, আমিতো নবী, নবীর কাজ মানুষকে হেদায়েত দেয়া, নিজ সন্তানকে কুরবানি করার সাথে হেদায়েতের সম্পর্ক কী?
“আমার আল্লাহ, আমি যার ইবাদত করি, আমি যার দাস, আমি যার প্রেমিক, সেই আল্লাহ চেয়েছেন আমি প্রিয়বস্তু কুরবানি করব -- ব্যস আমি সেটা করব, আমার কি আর কোনো ভাবনার সময় আছে?” এ-ই হলো প্রকৃত প্রেম। অথচ আমরা নিজেদের প্রবৃত্তিকে কুরবানি করতে গিয়ে ভাবনার কাছে ঠেকে যাই। ভাবনা আমাদের ঘুরিয়ে মারে, হয়রান করে ছাড়ে। একারণেই, সময় থাকতেই, বুঝার সাথে সাথেই চিন্তাঘোড়ার মুখে লাগাম পড়াতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তি বা intellectual mind কে সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে দূরে রাখতে হবে। তাকে বলতে হবে, হে মন, তুমি আমার হৃদয়ের সাহায্যকারী মাত্র, তুমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা নও।

কুরবানি কি এতই সহজ? একটা পশু কিনে বছর বছর জবাই করলেই কি কুরবানি হয়ে যায়? ইবরাহীমের (আ.) ধর্মের অনুসারী হওয়া কি এতই সহজ? ইবরাহীমের (আ.) নামাজস্থলের চারিদিকে বছর বছর তাওয়াফ করি, অথচ বুঝি না, ইবরাহীম (আ.) খোদার কত বড় প্রেমিক ছিলেন যে, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য ইবরাহীমের নামাজস্থলকে কেবলা করে দিয়েছেন! ইবরাহীমের (আ.) সেই নামাজই বা কেমন ছিল? আর তার চারিদিকে তাওয়াফ-ই বা আমরা কেন করি? এই তাওয়াফে আমাদের ফায়দা কী, আমাদের হৃদয়ের জগতে কী পরিবর্তন ঘটে?

“এগুলোর রক্ত ও মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং যা পৌঁছায় তা হলো তোমাদের তাক্বওয়া…” (সূরা হজ্জ্ব, ২২:৩৭)
তাক্বওয়া অর্জন কি এতই সহজ? তাক্বওয়া কী? তা-ই কি আমরা আসলে জানি? তাক্বওয়া হলো হৃদয়ে আবেগের সেই ঢেউ, যা খোদার জন্যে সবকিছু ছেড়ে দিতে উদ্যত হয়।
“You know you have received the invitation when you are ready to risk everything for the sake of God.” -- Rumi

হায়, কী করলে পথিকের হৃদয়ে সেই ঢেউ জাগবে! তাক্বওয়া অর্জিত হবে! না, এই ঢেউ কেউ এসে জাগিয়ে দেবে না। এখানেই আমাদের ঈমান আনার প্রশ্ন, তাক্বওয়া “অর্জন” করার প্রশ্ন। অতএব, এই পথে পথিকের নিজেকেই হাঁটতে হবে। অন্যরা সাথে হাঁটতে পারে বটে, পথও দেখাতে পারে, কিন্তু কষ্ট করে পথিকের নিজেকেই হাঁটতে হবে। মেহনত করতেই হবে। আর সেই মেহনতেরই কিছু কর্ম নিয়ে আমাদের এই আলোচনা, আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি।

মে ১৪, ২০১৬।

অধ্যায় - ৭ (মনের কলুষ)

দেহের দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙা তুলনামূলক সহজ। কেননা, দেহের কলুষ মাত্র তিনটি। আর তা হলো: খাদ্যের ক্ষুধা, যৌন ক্ষুধা, দেহের আরাম। আধ্যাত্মিক যাত্রার পথিকের জন্য এগুলি ছোট কলুষ। যদিও অনেকের কাছেই এই তিনটাকে অতিক্রম করা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার বলে মনে হতে পারে, বিশেষতঃ খাদ্যের লোভকে অতিক্রম করলেও যৌনতাকে সুনিয়ন্ত্রিত করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে হতে পারে। তবুও আমরা বলছি, দেহের কলুষ হলো ছোট কলুষ, এবং দেহের দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙা তুলনামূলক সহজ। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আলাদাভাবে কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ, যেখানে জৈবিক চাহিদগুলিকে সুনিয়ন্ত্রিত করে আনার কিছু পদ্ধতি তুলে ধরা হবে।

কিন্তু মনের কলুষই হলো বড় কলুষ। দেহকে সুনিয়ন্ত্রিত করে, দেহের কলুষ দূর করে আমরা যদি মনের কলুষও দূর করতে পারি, তবেই কেবল আত্মা মুক্তি পাবে। দেহের কলুষ নানান ছলনায় আমাদের মধ্যে বাস করতে চায়, তবে সেগুলি দুর্বল ছলনা, সহজেই ধরা পড়ে। কিন্তু মনের ছলনা ধরা সহজ নয়। একজন উপযুক্ত ওস্তাদ ছাড়া এই ছলনাগুলি ধরা খুবই কঠিন। এর কারণ হলো, দেহ ও আত্মার মাঝখানে মনের অবস্থান। মন দেহকে শুদ্ধ করে, আবার মনই “আত্মার চাহিদা খোদাপ্রেম” -- একথা অনুধাবন করে। কিন্তু যখন মনের কলুষ দূর করার প্রসঙ্গ আসে, তখন সেই মনের নিজেকেই নিজের সংশোধন করতে হয়। আত্মশুদ্ধির এই ধাপে তাই সারাজীবনই প্রচেষ্টা করতে হয়। নফসের সাথে সার্বক্ষণিক যুদ্ধ। দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, খোদামুখী লক্ষ্যে অটুট থেকে মনকে শুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালাতে হয়।

মনের কলুষ কেমন? এই যেমন যশ-খ্যাতি, ক্ষমতা, সম্মান ইত্যাদির প্রতি লোভ। হ্যাঁ, এগুলিকে যে কেউ-ই মনের কলুষ হিসেবে স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু জ্ঞান অর্জন? সেটাও কি কলুষ হতে পারে? কিংবা ভালোবাসা?
হ্যাঁ, এগুলিও কলুষিত হয়ে যায়, যখন তা খোদার তরে না হয়। “Any thought other than God is a veil...” আল্লাহ ছাড়া আর যেকোনো ভাবনাই হলো খোদা ও মানবাত্মার মাঝে পর্দা। যে জ্ঞান মানুষের আত্মাকে সাহায্য করে না, মানুষে-মানুষে যে ভালোবাসা মানবাত্মাকে খোদার নিকটবর্তী করে না -- সেগুলি শরীয়তের দৃষ্টিতে না হলেও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণে পাপ, পরিত্যাজ্য।
আবার, মানব মন নিজেকেই প্রতারিত করে, নিজের সাথেই ছলনা করে। অথচ তার বোঝা উচিত, মনের যেসব কর্মকাণ্ড মৃত্যুর পর ওপারের জীবনের সাহায্যকারী হচ্ছে না, তার সবই ছলনা, কলুষ। আর কলুষিত হৃদয় প্রেম করতে পারে না। অতএব, আধ্যাত্মিক যাত্রার পথিকের প্রতি মুহুর্তে চিন্তা করে দেখা উচিত যে, আমি এই মুহুর্তে যা ভাবছি, যা নিয়ে মানসিকভাবে ব্যস্ত আছি, তা কী আমার মৃত্যুপারের জীবনের জন্য কোনোদিক দিয়ে সাহায্যকারী হবে? যদি তা না হয়, তবে সেটাকে পরিত্যাগ করতে হবে।

মনের ছলনা ও মনের কলুষ নিয়ে একটি অধ্যায়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। পথিক শরীয়তের নানান বিধিবিধানের উপযুক্ত চর্চা করতে করতে এবং একইসাথে মনের নানান ছলনা সম্পর্কে সচেতন হতে হতে ধীরে ধীরে এই কলুষ দূর করবে। তারই কিছু উপায় আমরা আলোচনা করব মাত্র, কেননা “আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি” শিরোনামে বেশি কিছু আলোচনার অবকাশ নেই। আজকের আলোচনার উদ্দেশ্যে কেবল এটুকু যে, দেহ-মন-আত্মা -- মানব সত্ত্বার এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে পথিক যেন সদা সচেতন থাকে, এবং তার প্রতিটা চাহিদা ও কর্মকে এই ফিল্টার দিয়ে চিন্তা করে দেখে যে : আমার এই চাহিদা কি দেহের, মনের, না আত্মার? এবং আমার এই কর্ম কি দেহের তরে, মনের জন্যে, নাকি স্রষ্টার উদ্দেশ্যে? এ বিষয়ে অনুক্ষণ সচেতন থাকলে ইনশাআল্লাহ পরবর্তী আলোচনাগুলো উপকারী হবে।

অধ্যায় - ৮ (বিচ্ছিন্নকরণ, মানব সম্পর্ক)

এখন আমরা “চর্চার” মধ্যে প্রবেশ করবো। এ পর্যন্ত যা হয়েছে, তা হলো পূর্ব আলোচনা। কিন্তু চর্চা শুরু করবার জন্যে এ আলোচনা দরকারী ছিল। যাহোক, বিচ্ছিন্নকরণের প্রথম বিষয় দেহ (দেহের তিনটি কলুষ), দ্বিতীয় বিষয় মন (মনের কলুষ অসংখ্য)। মনকে ত্যাগ করতে পারলে মে’রাজ হয়। প্রকৃত নামাজের মূহুর্তে মানুষ মনকে ত্যাগ করতে পারে। তাই সালাতকে মুমিনের মেরাজ বলা হয়। কিন্তু এসবকিছু চর্চা শুরু করার পূর্বে, অর্থাৎ দেহ ও মনকে ত্যাগ করার জন্য আমল শুরু করার পূর্বে আমাদেরকে এমন পরিবেশ তৈরী করে নিতে হবে, যেন আমাদের এই চর্চা কখনো ব্যাহত না হয়। সেজন্যে নিজেকে একটি বিশেষ পরিবেশের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে।

এইযে বিচ্ছিন্নকরণ, কিংবা আত্মশুদ্ধি, কিংবা দেহ-মন ত্যাগ করা -- যা-ই বলি না কেন, এইসকল ধর্মচর্চা কখন ব্যাহত হয়? কিভাবে ব্যাহত হয়? এর বড় একটি কারণ মানুষ। আমার ভিতরে যখন আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক যাত্রার বাসনা জেগে উঠেছে, ঠিক তখনই নানান মানুষ আমাকে প্রভাবিত করছে। এর মাঝে অনেকে না জেনে না বুঝে দুনিয়ার দিকে টানছে, অনেকের মাঝে আবার শয়তান লুকিয়ে থেকে বন্ধুরূপে প্রতারিত করছে। অথচ এসব মানুষকে পথিক কিভাবে চিনবে? সেই চিনতে পারার যোগ্যতা অর্জন করার পথেই তো তারা বাধা হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এ এক গোলকধাঁধার মত অবস্থা। অতএব, সতর্কতার নীতি অনুসারে সকল মানব সম্পর্ক থেকে নিজেকে (বাহ্যিকভাবে নয়, আত্মিক-মানসিকভাবে) বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর জন্যেও হৃদয়ে যে ভালোবাসা আছে, তা শূন্য করে ফেলতে হবে। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন -- যেকোনো মানুষ, যেকোনো মানুষের প্রতি যে ভালোবাসা রয়েছে, যতরকম ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, সবকিছু থেকে নির্লিপ্ত হয়ে যেতে হবে (মানসিকভাবে)। হ্যাঁ, বাইরে বাহ্যিকভাবে সকলের সাথেই স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে বটে, কিন্তু তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে।

দুনিয়ার সকল মানুষের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে দুটি দিক লক্ষ্যণীয়। প্রথমতঃ, স্মরণ রাখতে হবে যে, আমার আত্মা এখনো শুদ্ধ নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এই অনুপ্রেরণাটুকু ছাড়া বাকি সবটাই কলুষ। আর কলুষিত হৃদয় প্রেম করতে পারে না। সে যা করে তা হলো লালসা, দুনিয়াবী লোভের নানান ছদ্মরূপ। সেটা এমনকি পিতা-মাতা-সন্তানের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার হৃদয় স্পষ্টভাবে এটা অনুভব না করছে যে, চারিদিকের এই মানুষগুলির সাথে আমার সম্পর্ক কেবলমাত্র খোদার তরে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই সম্পর্ককে ন্যুনতম পর্যায়ে সীমিত করে আনতে হবে। বাহ্যিকভাবে সম্পর্ককে স্বাভাবিক রেখেই মানসিকভাবে তাদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। এটাকে প্রাথমিক কুরবানীও বলা যেতে পারে। কেননা, আমি যত মানুষের ভালোবাসা পেতাম, ও যত মানুষকে ভালোবাসতাম, তার সবকিছু আমি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করছি। এটা নিজের সাথেই যুদ্ধ, নিজের হৃদয়ের সাথে যুদ্ধ। সবচে’ ভালোবাসার বন্ধুটিকে, কিংবা প্রিয়তমা/প্রিয়তমকে -- তাকে পর্যন্ত ত্যাগ করা! এ-ও কি সম্ভব! যদি মনে করেন সম্ভব নয়, কিংবা “খোদাকে ভালোবাসতে হলে সৃষ্টিকে ত্যাগ করতে হবে কেন” -- এজাতীয় ছলনামূলক বাক্য আপনাকে এসে প্রতারিত করে, তবে আমরা অসহায়। আপনাকে কোনোরকম আশা রাখা ছাড়াই এগুলিকে ত্যাগ করতে হবে। নিজের দিকে তাকান। চিন্তা করে দেখুন, লালসার অন্তর দিয়ে কাদের আপনি ভালোবাসছেন? এটা কি প্রকৃতই ভালোবাসা? নাকি অন্যের উপর জুলুম? সেই মানুষটি যখন আবিষ্কার করবে যে, আপনি তাকে প্রকৃতরূপে ভালোবাসেননি, বরং ভালোবেসেছেন নিজের কলুষিত হৃদয়ের লালসা চরিতার্থ করতে, সে কতটা ব্যথিত হবে তখন! আপনি যদিওবা আল্লাহর রহমতে সেই কলুষিত ভালোবাসা থেকে উঠে আসতে পারেন, কিন্তু সেই ব্যক্তি / ব্যক্তিগণ, যাদেরকে আপনি কলুষিত ভালোবাসার মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন, তারা কি তখন উঠে আসতে পারবে? আপনি কি বুঝতে পারছেন, তখন আপনাকে কতটা কষ্ট করতে হবে! কেননা তখন আপনি শুদ্ধ হৃদয়ে দুনিয়ার সকলকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন, অথচ আপনারই প্রিয়জনেরা আপনার কাছ থেকে শুদ্ধ ভালোবাসা চায় না, তারা কামনা করে কলুষিত ভালোবাসা, কেননা সেই ভালোবাসা দিয়ে আপনি এতদিন তাদেরকে অভ্যস্ত করে ফেলেছেন!

অতএব সাবধান হোন! বিচ্ছিন্ন করুন নিজেকে সকল মানব সম্পর্ক থেকে। কারণ আপনি এখনো ফুলের মত নন। “ফুলের মত হও, যে তার দলনকারীকেও সুঘ্রাণ বিলিয়ে যায়...” -- ইমাম আলী (আ.)
কিন্তু আমিতো এখনো সে ফুলের মত হইনি। তবে কোন সাহসে আমি মানুষকে allow করছি আমার ঘনিষ্ঠ হবার? বাইরের কিছুটা সুঘ্রাণে মানুষ আমার ঘনিষ্ঠ হবে, ঘনিষ্ঠ হতে হতে অনেকটা কাছে এসে আমার কলুষগুলি দেখে ফেলবে, আমার কলুষগুলি দ্বারা আমি তাদেরকে স্পর্শ করে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলব, কলুষিত করে ফেলব, দুনিয়ার মোহে / ছলনায় আরো বেশি করে বেঁধে ফেলব -- এ-ই কি আমি চাই?

অতএব, নিজেকে এই প্রশ্ন করতেই হবে। কলুষিত হৃদয় নিয়ে দুনিয়ার বুকে বড়জোর মাটির উপর হেঁটে বেড়ানো যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর বান্দাহদের সাথে মেশা নয়। কারণ পথিক কিছুতেই এই ভরসা পাচ্ছে না যে, তার কলুষিত হৃদয়ের ঘনিষ্ঠতা দ্বারা সে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। অতএব, নিজের আত্মশুদ্ধির জন্যে না হলেও, কেবলমাত্র অন্যের উপর যেন জুলুম না করি, এই চিন্তা থেকেই সকল সম্পর্ক, সকল ঘনিষ্ঠতাকে ন্যুনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। এ ব্যাপারে পথিকের নিজেকেই প্রচেষ্টা করতে হবে। নানান উপায়-পদ্ধতি চিন্তা করতে হবে, যা ব্যক্তিভেদে নানারকম হতে পারে। এ ব্যাপারে আধ্যাত্মিক যাত্রার কোনো অগ্রপথিকের সাহায্য নেয়া যেতে পারে, যে নফসের সাথে এই যুদ্ধগুলি পার করে এসেছে।

অধ্যায় - ৯ (দেহের কলুষ: খাদ্যের ক্ষুধা)

মানুষের দেহঘরে আত্মা হলো মেহমান, অতএব, আত্মার চাহিদা মোতাবেক দেহ পরিচালিত হবে, এটাই খোদাতায়ালার ইচ্ছা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ করে এর বিপরীত। দেহের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মন ও আত্মা হয়ে পড়েছে দেহের দাস, এমনকি আত্মা যে এই দেহঘরের মেহমান, তা-ই সে ভুলতে বসেছে। এমতাবস্থায় জৈবিক ক্ষুধার বিশেষ সংযম চর্চা করা প্রয়োজন।

জৈবিক ক্ষুধা বা দেহের কলুষ তিনটি: খাদ্যের ক্ষুধা, যৌন ক্ষুধা ও দেহের আরাম। আধ্যাত্মিক সাধককে প্রথম যে বিষয়টি অর্জন করতে হবে তা হলো, খাদ্যের লোভ থেকে মুক্তি। অনেকের কাছে এটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই বাস্তব যে, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের খাদ্যের লোভ বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটা শিশু সর্বদা মনের আনন্দে খেলাধুলায় মেতে থাকে, বরং তাকে জোর করে ডেকে এনে খাওয়াতে হয়; খাবার সময়টুকুও সে পারলে খেলাধুলায় ব্যয় করে। কিন্তু বড় হতে হতে মানুষ তার মন ও আত্মাকে এতটাই জুলুম করে যে, দেহটাই তার সব হয়ে উঠে, দেহের চাহিদাই সারাক্ষণ মিটাতে ব্যস্ত থাকে সে, এবং খাদ্যের লোভ পেয়ে বসে তাকে। একারণেই দেখবেন নানান খাদ্য, তার স্বাদ, কোথায় পাওয়া যায় ইত্যাদি প্রসঙ্গে যত কথা বড়রাই বলে থাকে, শিশুরা নয়। মনের অজান্তেই নিজেদের ভিতরে খাদ্যলোভী এক সত্ত্বা বেড়ে উঠতে থাকে। অনুধাবন করামাত্র এই সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক।

খাদ্যের লোভকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে? বুদ্ধিমান পথিকের জন্যে এতটুকু ইঙ্গিতই যথেষ্ট যে, উপযুক্ত আদব সহকারে রোজা রাখো। তবে সাধারণের জন্য ব্যাখ্যা করতে গেলে খাদ্যের সংযম সাধনা এইরূপ:

এক পদের খাবারই যে সর্বদা খেতে হবে তা নয়, বরং প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যই খেতে হবে, তবে -- দিনের পর দিন এক পদের খাবার খেয়েও মনের ভিতর থেকে তৃপ্তিসহকারে আলহামদুলিল্লাহ বলতে পারার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। কেননা, এই খাদ্য আপনি নিজে তৈরী করেননি, বরং আল্লাহ তায়ালা আপনাকে প্রতিপালক করেন বলেই, তিনি রব্বুল আলামিন বলেই আপনাকে এই খাদ্য দিয়েছেন যা দ্বারা আপনি দেহঘরকে তাজা রাখতে পারছেন। অতএব, শুকরিয়া আদায় করুন। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় প্রতি মুহুর্তে আপনি তাঁর কাছেই ফিরে যাচ্ছেন। আধ্যাত্মিক যাত্রার পথিক আপনি কিসে বিরক্ত হচ্ছেন? এক পদের খাদ্য, কমদামী, কম স্বাদের খাদ্য -- এসবের বিরক্ত হচ্ছেন? যেই দেহ ছেড়ে একদিন চলে যাবেন, সেই দেহের জন্য? শুকরিয়া ভুলে গিয়ে বিরক্তি প্রকাশ? মনোকষ্ট?

জৈবিক ইন্দ্রিয় একমুখী। সে কেবল মনের কাছে (মস্তিষ্কে) তথ্য প্রেরণ করে। যখন আপনি দিনের পর দিন এক পদের খাবার খেতে থাকবেন, তখন প্রতিদিন প্রতি বেলাতেই আপনার চোখ মস্তিষ্কের কাছে একই খাদ্যের চিত্র প্রেরণ করবে, জিহবা একই স্বাদের তথ্য প্রেরণ করবে, নাক একই রকম ঘ্রাণের তথ্য প্রেরণ করবে। এরপর এটা আপনার মনের (অর্থাৎ মস্তিষ্কের বা ব্রেইনের) কাজ যে আপনি কোন সিদ্ধান্তে আসবেন। আপনি কি এই সিদ্ধান্তে আসবেন যে, “ধুর, প্রতিদিনই একই বিরক্তিকর খাবার আর ভালো লাগছে না”, নাকি আপনি প্রতিদিনই এই সিদ্ধান্তে আসবেন যে, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহপাক কতই না মেহেরবান যে আমাকে প্রতিবেলা খাদ্য দান করছেন।” আধ্যাত্মিক যাত্রার পথিক হিসেবে আপনাকে নিজের মনের উপর এই কর্তৃত্ব অর্জন করতেই হবে। মনে রাখবেন, বনী ইসরাইল এই কাজটি করতে পারেনি। আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য মান্না সালওয়া দান করেছিলেন, কিন্তু তারা ডাল, রসুন ইত্যাদিসহ নানা পদের খাবার খেতে চেয়েছিল। এভাবে তারা আল্লাহপাকের অসন্তুষ্টি খরিদ করেছিলো। রহমাতুল্লিল আলামিন মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত বলে আমরা কত কিছু করেই না পার পেয়ে যাচ্ছি, নতুবা আমরা ক’জন মুসলমান খাদ্যের সংযমের ব্যাপারে সচেতন! ক’জন একপদের খাবার দিনের পর দিন খাই আর মন থেকে আলহামদুলিল্লাহ বলি?

খাবার খাওয়ার সময় খাদ্যের দিকে মনোযোগ রাখবেন এবং প্রতি গ্রাস খাবারের শুরুতে আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করবেন (বিসমিল্লাহ)। কৃতজ্ঞতা সহকারে দেহ-মন-আত্মাকে আল্লাহর দিকে রুজু করবেন এবং শুকরিয়া আদায় করবেন। মাঝে মাঝেই স্মরণ করবেন যে, এই দেহঘর টিকে না থাকলে আল্লাহর অন্যান্য অনেক রহমত আমরা পেতাম না, আর দেহটাকে তাজা রাখবার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে খাদ্য দান করছেন। এই কথা স্মরণ করার সাথে সাথে আলহামদুলিল্লাহ যিকর করার চেষ্টা করবেন। মনে মনে কেবল “আল্লাহ, আল্লাহ” যিকরও করতে পারেন।

লোভনীয় খাদ্যের চিত্র, ঘ্রাণ ইত্যাদি দ্বারা প্রথমতঃ মানসিকভাবে বিচলিত হওয়া থেকে নিজেকে বের করে আনতে হবে। এরপর জৈবিকভাবে, অর্থাৎ সুস্বাদু খাবার দেখলে, নাম শুনলে বা ঘ্রাণ নাকে এলে যেমন জিভে জল আসে, ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি অসম্ভব কিছু নয়, কেননা রমজান মাসে আমরা এই কাজটি সহজেই করতে পারি, এমনকি সুস্বাদু ইফতার তৈরী করার সময়ও রোজাদারের জিভে জল আসে না। রমজানের এই সংযমটিকে নিজের মাঝে চিরস্থায়ীভাবে জারি রাখতে হবে। মুহাম্মদ (সা.) এর পথ অনুসরণ করে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখলে তা খাদ্যের ক্ষুধাসহ সামগ্রিকভাবে জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণে খুবই সহায়ক হবে।

কিছুটা ক্ষুধা থাকতেই খাওয়া শেষ করে উঠবেন এবং যতদিন খাদ্যের লোভ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারছেন, ততদিন যথাসম্ভব কম খাওয়া ও কম পদের খাদ্যের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবেন। লোভনীয়, সুস্বাদু ও দামী খাদ্য পরিহার করুন, পরিবর্তে প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে দুই-একদিন দরিদ্রকে খাদ্য দিন। এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য আসবে, যা দ্বারা জৈবিকতাকে আরো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…