সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)

সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়ায় সহিংসতা চালিয়ে আসছে। এরমাঝে সিরীয় আর্মির কিছু অংশ বিদ্রোহ করে "ফ্রি সিরিয়ান আর্মি" বা FSA নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়াও আন-নূসরা, আনসার-খিলাফাহ, আল-মুহাজিরিন ইত্যাদি বেশকিছু গ্রুপ আছে। এর মাঝে FSA ও আন-নূসরা-ই উল্লেখযোগ্য এবং তাদের কার্যক্রমও লক্ষ্যনীয়। তারা বলছে যে তারা আসাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে সিরিয়ায় ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবে। এবং এজন্যে তারা আমেরিকা ও তার বন্ধুদের কাছ থেকে অস্ত্র, ট্রেনিং ইত্যাদি সহায়তা নিচ্ছে। যাহোক, এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আসাদ সরকারের আর্মি প্রথম থেকেই লড়ে আসছে। আমেরিকা-ই ইস্যু সৃষ্টির জন্য তাদের বিদ্রোহীদের মাধ্যমে কেমিকাল ওয়েপন প্রয়োগ করিয়েছে সাধারণ জনগণের উপর, আর সেটা চমৎকারভাবে ইস্যুও হয়ে দাঁড়িয়েছে !

ইরান প্রকাশ্যে আসাদ সরকারের পক্ষ সমর্থন করছে এবং আসাদের মতই দাবী করে আসছে যে, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আমেরিকার মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী ছাড়া অন্য কিছু নয়। লেবাননের ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ-ও প্রকাশ্যে আসাদ সরকারের পক্ষ নিয়েছে এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছে সিরীয় সেনাবাহিনীকে।

আমাকে লিখতে হচ্ছে কয়েকটা কারণে :
১. বিদ্রোহী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মনেপ্রাণে সমর্থন করছেন ইসলামপন্থীদের অনেকে।
২. আসাদ সাধারণ জনগণের উপর "গণহত্যা" চালাচ্ছে বলে আসাদকে সাহায্য-সমর্থন দেয়া হিজবুল্লাহ ও ইরানকেও গণহত্যার অংশীদার সাব্যস্ত করা হচ্ছে।
৩. কেউ কেউ ইরানকে আমেরিকার গোপন বন্ধু বলছেন, অর্থৎ ইরানের ধর্মীয় নেতাগণকে মুনাফিক সাব্যস্ত করছেন।
৪. অনেকের কাছেই মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি পরিষ্কার নয়, তাদের জানা প্রয়োজন।
৫.ইসলামপন্থীদের মাধ্যমে ভুল তথ্যে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, তাদেরকে সত্য জানানো দায়িত্ব।

আমি সংক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে লিখছি, আশা করি ওটুকু পর্যন্ত পড়বেন। এরপর যুক্তিতর্কের অংশ শুধু তাদের জন্য, যারা ইরান-হিজবুল্লাহ-আসাদের ধ্বংস কামনা করেন এবং বিদ্রোহীদের সমর্থন করেন।

নিচের ম্যাপটা ওপেন করে ভালোভাবে দেখুন। দেশগুলো নিয়ে দু-চারটা কথা বলা যাক।

মধ্যপ্রাচ্য
ইরান : মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগলিক কেন্দ্রে ইরানের অবস্থান। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণকেন্দ্র-ও বটে। মাত্র ৩৪ বছর আগের কোনো একদিনে আমেরিকার বন্ধু, ইরানের রেজা শাহ পাহলভী বলেছিলো, "যাই, ক'দিন আমেরিকা থেকে একটু বেড়িয়ে আসি।" তারপর আর তার দেশে ফেরা হয়নি -- ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানের আলেমগণ ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামি ইরান প্রতিষ্ঠা করেন। সেসময়ে ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের একটি দল গিয়ে আমেরিকান দূতাবাস ঘেরাও করেন এবং তাদের সমস্ত গোপন দলিল উদ্ধার করেন (যদিও ঘেরাও হবার পরপর তারা ডকুমেন্টগুলো পুড়াতে শুরু করে)। পরবর্তীতে "মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তির দলিল" নামে তা ধারাবাহিকভাবে মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়। ঐ থেকেই আমেরিকার সাথে ইরানের সম্পর্ক শেষ। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার খুব ভালো বন্ধু ছিলো ইরান (অবশ্য জনগণ ছিলো না, ছিলো তাদের শাহ)। পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী ইরানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগ তেল পরিবহন হয়, বর্তমানে দৈনিক ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল, যা দিয়ে বিশ্বের অনেক দেশের কলকারখানার চাকা ঘোরে (এমনকি আমেরিকারও)। হরমুজ প্রণালী নিয়ে পরে কথা বলবো।
সৌদি আরব : প্রায় তিনশত বছর আগে ব্রিটিশ মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সৌদি রাজবংশের পত্তন ঘটে। ৩৪ বছর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই সৌদি আরব ইরানকে তাদের এক নম্বর শত্রু হিসেবে গণ্য করে আসছে। (প্রসঙ্গত এই ব্লগটি দেখতে পারেন।) উইকিলিকস যখন প্রথম আলোড়ন তুললো, তখন প্রকাশ পেয়েছিলো সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে আমেরিকা সরকারে কাছে পাঠানো এই তারবার্তাটি : "সাপের (ইরানের) মাথা কেটে ফেলাই ভালো।" ২০১১-১২ সালে ইয়েমেনে আমেরিকার ড্রোন হামলায় প্রচুর পরিমাণে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক মিশর ইস্যুতে সৌদি আরবের মুনাফেকি আরো প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে, যেটা আপনারা জানেন। এই সৌদি আরবই বর্তমানে সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে।
আমেরিকার নেতৃত্বাধীন "ফ্রেন্ডস অব সিরিয়া" গ্রুপের সদস্য।
ইরাক : সেক্যুলার সাদ্দাম হোসেন ছিলো আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্র। বিপ্লবের মাধ্যমে আমেরিকাসহ ইসলামের শত্রুদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলো ইরান, যার প্রতিশোধ আমেরিকা নেয় সাদ্দামের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া প্রক্সি ওয়ার এর মাধ্যমে। বিপ্লবের পরপরই সাদ্দাম হোসেন ইরানের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, এবং সেখানে আমেরিকার সরবরাহ করা রাসায়নিক অস্ত্র পর্যন্ত ব্যবহার করে। পরবর্তীতে এই সাদ্দাম হোসেনকে "ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র" আছে বলে বুশ প্রশাসন ট্র্যাক ডাউন করে ২০০৬ সালে "বিচার" করে ফাঁসি দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই তেলসমৃদ্ধ দেশে এখনও মার্কিন সেনা আছে।
ইরানের সাথে সরাসরি সীমান্ত রয়েছে (ম্যাপ দেখুন)।
আফগানিস্তান : ইরাক আক্রমণের দুই বছর আগে ২০০১ সালে তাদেরই তৈরী দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল কায়েদা নেতা লাদেনকে "খুঁজতে" সারা আফগানিস্তানকে ধ্বংস করে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশ। এখনও আফগানিস্তানে মার্কিন (ও ন্যাটো জোটভুক্ত কিছু) সেনা আছে।
বর্তমানে হামিদ কারজাই এর পুতুল সরকার আফগানিস্তান শাসন করছে।
পাকিস্তান : পাকিস্তান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আমেরিকান দালাল পারভেজ মোশাররফ দীর্ঘদিন শাসন করেছে সেখানে, এবং এর আগে-পরেও পাকিস্তানে কোনো ইসলামপন্থী শাসক আসেনি, যা "ইরানের" জন্য সহায়ক হবে। আমেরিকা নিয়মিত ড্রোন হামলা করে, আর পাকিস্তান "যাহ দুষ্টু" টাইপের কমেন্ট করে দায় সারে।
তুরস্ক : ইরানের উপরে, মাথার দিকে আছে তুরস্ক (ম্যাপ দেখুন)। যারা একটু খোঁজ-খবর রাখেন, তাদের কাছে কামাল আতাতুর্ক এর চাপিয়ে দেয়া সেক্যুলার তুরস্ককে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। (স্যামুয়েল হান্টিংটনের মতে তুরস্ক একটি torn country, এবং সেটা এই সেক্যুলারিজমকে চাপিয়ে দেবার কারণেই। এ নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা থাকলো।) সাম্প্রতিক (বাহ্যিকভাবে কিছুটা) ইসলামপন্থী এরদোগানের সরকার এলেও তুরস্কের সেনাবাহিনী মিশরের মতই USA-backed, USA-controlled, এবং সেখানে NATO এর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন করা আছে -- যেকোনো মুহুর্তে মার্কিন স্বার্থে তা সিরিয়া কিংবা ইরানে আক্রমণ করতে প্রস্তুত।
মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে তুরস্কে।
ফ্রেন্ডস অব সিরিয়া গ্রুপের সদস্য, বিদ্রোহীদের exile governmentকে আশ্রয়-প্রশয় দিচ্ছে।
(মিশরের আসমা বেলতাগির মৃত্যুতে এরদোগানের কান্নার ভিডিও দেখে ভুলে যাবেন না আবার !)
সাইপ্রাস : ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি আছে, যেখানে গত কয়েকদিনে শক্তি ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে (ম্যাপে সিরিয়ার বামে দেখুন)।
ইজিপ্ট : ত্রিশ বছর এখানে আমেরিকার চাকর হোসনি মোবারক শাসন করেছে। "তাহরির স্কয়ার বিপ্লবের" পর USA-backed আর্মির সাথে আপোষ করে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় মুরসিকে আবার বন্দী করেছে USA-backed আর্মি। এখন সেখানে আবার-ও কার্যত সেনাশাসন চলছে। মুরসি যদিও কুরানিক সংবিধানের কথা বলেছিলেন, কিন্তু মুসলিম বিশ্বের ঈমানী পরীক্ষার ক্ষেত্র ফিলিস্তিনিদের জন্য তিনি মোবারকের চেয়েও কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অসহায় গাজাবাসীরা আশা করেছিলো যে, মুরসির সরকার আসার পর তাদের আর ভূগর্ভস্থ টানেল দিয়ে খাদ্য-ওষুধ ইত্যাদি আনা-নেয়া করতে হবে না, বরং রাফাহ ক্রসিং দিয়েই তা করতে পারবে (ম্যাপে দেখুন)। কিন্তু মুরসি সরকার উপরন্তু টানেলগুলো পর্যন্ত বন্ধ করার ব্যবস্থা নিলেন। বিপরীতে ইসরাইলের সাথে মিশরের ওপেন-বর্ডার এখনও বিদ্যমান। (জর্ডানেরও ইসরাইলের সাথে ওপেন বর্ডার, ফ্রেন্ডস অব সিরিয়ার সদস্য।) এছাড়াও মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের করা ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, যার মাধ্যমে মুসলিম ভুখণ্ডে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিলো; এক বছর "কুরআন-ভিত্তিক সংবিধানের" অধীনে দেশ চালিয়েও সেই চুক্তি মুরসি সরকার বাতিল করেননি।
মিশরের বর্তমান সরকার সম্পূর্ণই আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন।
মুরসি সরকারের আমল থেকেই আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ফ্রেন্ডস অব সিরিয়ার সদস্য।
লেবানন : সিরিয়ার সাথে সীমান্ত রয়েছে লেবাননের। এখানের হিজবুল্লাহ-রা ইরান সমর্থিত। একভাবে বলতে গেলে, সিরিয়ায় বর্তমানে আমেরিকা ও ইরানের যুদ্ধ চলছে, আমেরিকা চালাচ্ছে বিদ্রোহী জঙ্গি গ্রুপগুলোর মাধ্যমে, আর ইরান চালাচ্ছে হিজবুল্লাহর মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত এই হিজবুল্লাহর সাথে ৩৩ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল হেরে গিয়েছিলো ২০০৬ সালে, যা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শক্তি ও কৌশলের সুপ্রিমেসির ধারণা দেয়।
ইসরাাইল : ৮০ লক্ষ জনসংখ্যার এই দেশটি ফিলিস্তিনের অধিকাংশকে গ্রাস করে আছে। ১৯৪৮ সালে মার্কিন সহায়তায় এই অবৈধ রাষ্ট্রটির জন্ম হয়। (ম্যাপে ইসরাইল আছে, কিন্তু খেয়াল করুন ফিলিস্তিন নামটা নেই !) বর্তমানে সারা দুনিয়ার যেখানে যত অপকর্ম ঘটে, তার মূল নিয়ন্ত্রণ এখান থেকেই হয়। এমনকি আমেরিকার বারাক ওবামা পর্যন্ত ইসরাইলের অনুমতির বাইরে কিছু করতে সাহস করে না। (আমেরিকান সরকার ও প্রশাসনের সর্বস্তরে ইহুদি চর প্রবেশ করিয়ে রেখেছে ইসরাইল।)
সিরিয়া বলছে যে আক্রান্ত হলে তারা ইসরাইলে হামলা করবে। ইরানেরও মূল লক্ষ্য ইসরাইল : তারা যেকোনো মূল্যে মুসলিম বিশ্বের এই "বিষ-ফোঁড়ার" উচ্ছেদ চায়। আক্রান্ত হওয়ামাত্র ইসরাইলকে মাটিতে মিশিয়ে দেবার জন্য ইরান প্রস্তুত। (হিজবুল্লাহর হাতেই যদি ইসরাইল যুদ্ধে পরাজিত হয়, তবে তাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তাদানকারী ইরানের সামর্থ্য সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারবেন আশা করি।)

মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণকেন্দ্র : ইরান।
অন্যান্য দেশগুলো নিয়ে আলোচনা করে পোস্ট দীর্ঘায়িত করবো না। ম্যাপটা আরেকবার একটু দেখুন। ধারণা করতে পারেন, গত ত্রিশ বছরে ইরানকে বাদ দিয়ে চারপাশের দেশগুলোতে কেনো আক্রমণ চালালো আমেরিকা ?
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরপরই তারা প্রক্সি ওয়ার চাপিয়ে দিয়েছিলো ইরানের উপর, কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া বিপ্লবের তাজা চেতনা যে সাহস যুগিয়েছিলো, তার উপর ভর করেই ইরানি জনগণ যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে ইরানের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে সেই যুদ্ধ শেষ হয়। জর্জ বুশের বাবা সিনিয়র বুশের উক্তি ছিলো : "পারস্য উপসাগরে আমাদের প্রাণশক্তি নিহিত আছে"। আর বুশ ক্ষমতায় এসে বিদ্রোহ করা সেই প্রাণশক্তির চারিদিক থেকে জাল গুটানো শুরু করেছে। প্রথমে আফগানিস্তান। তারপর ইরাক। সাম্প্রতিক পাকিস্তান। আর সৌদি আরব তো বহু আগে থেকেই তাদের বশংবদ। সেইসাথে UAE, কাতার, কুয়েত-ও (UAE ও কাতার FOS এর সদস্য)। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কখনোই ইরানের বন্ধু ছিলো না, কিন্তু সেখানে সরাসরি নিজেদের আর্মস অ্যান্ড ট্রুপস নিয়ে অবস্থান করাটা প্রয়োজন ছিলো। অনুরূপ আফগানিস্তানেও। সৌদি আরব "চাহিবামাত্র সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য থাকিবে" - টাইপের রাষ্ট্র। তুরস্কও মোটেই বন্ধুরাষ্ট্র নয়, বরং ইরানে আক্রমণ হলে সেখান থেকে মিসাইল হামলা হবে আগে।

প্রশ্ন হতে পারে, ইরান-ই যদি তাদের টার্গেট হয়, যাকে দুর্বল করার জন্য আশেপাশের রাষ্ট্রগুলোকে আক্রমণ করে দুর্বল করা হয়েছে, তবে এতদিনে কেনো ইরানকে আক্রমণ করা হয়নি ?

এর উত্তর দেবার আগে ইসরাইলের পরিস্থিতি একটু বিবেচনা করি।
ম্যাপে দেখুন ইসরাইলের সাথে সীমান্ত রাষ্ট্র হলো মিশর ও জর্ডান। উভয় রাষ্ট্র-ই বহু বছর ধরে ইসরাইলের মিত্র। এছাড়া আরব মোড়ল সৌদি আরব তো আছেই। মাথার উপরে তুরস্ক-ও বন্ধু রাষ্ট্র, যদিও মাঝে মাঝে সম্পর্ক একটু আপ-ডাউন করে। ইসরাইলের নিরপত্তার জন্য হুমকি হলো লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং লেবাননের সীমান্ত-রাষ্ট্র সিরিয়া। সিরিয়ার আসাদ সরকার সেক্যুলার হলেও সে আমেরিকা-ইসরাইলের মোড়লগিরি মানতে নারাজ। দুই বছর ধরে অস্ত্রশস্ত্র সহ সন্ত্রাসীদের বাইরে থেকে ঢুকিয়ে দিয়ে ও ভিতর থেকে তৈরী করেও সুবিধা করতে পারেনি ইসরাইল। বরং আরব-বসন্ত চলাকালীন সময় থেকে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপ সর্বাত্মক ইহুদি-মার্কিন সহায়তা নিয়ে কাজ করে যাওয়া সত্ত্বেও সাধারণ জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে মিশরের মত রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারেনি; যা এটাই প্রমাণ করে যে, to some extent দেশে আসাদের জনপ্রিয়তা আছে, এবং জনগণ আসাদ উৎখাতে ডেসপারেট নয়।

গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবার জন্য ইসরাইল ও আমেরিকা উভয়েরই দরকার লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার আসাদ ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণ সাপের মাথা কেটে দেয়া (অর্থাৎ ইরান, সৌদি আরবের ভাষায়)। ইরান-সিরিয়া-লেবানন (সেইসাথে মোটামুটিভাবে ফিলিস্তিনের হামাস-ও) হলো বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি-মার্কিন স্বার্থের প্রধান অন্তরায়।

তবে তাদের প্রধান শত্রু ইরানকে আক্রমণ করছে না কেনো ?
আগেই বলেছি, বিপ্লবের পরপরই সাদ্দামের মাধ্যমে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো, কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয় আমেরিকা। বিপ্লবের পরপর নিঃস্বার্থ আলেমগণের নেতৃত্বে ইরান বছর বছর অভূতপূর্ব উন্নতি করতে থাকে, বিশেষত সামরিক ক্ষেত্রে, যা সত্যিকার ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব হতো না। একারণেই যত সময় গিয়েছে, ততই ইরানের সামরিক সক্ষমতা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে। সেইসাথে ইরান তাদের সিকিউরিটি বেল্টের দিকে নজর দিয়েছে (হরমুজ প্রণালী, সিরিয়া, লেবানন)। সময়ের সাথে সাথে শুধু একা নয়, বরং নিজের নিরাপত্তার খাতিরে সিরিয়াকে শক্তিশালী করা, প্রক্সি ওয়ার চালানোর জন্য লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের দিকে মনোযোগ দিয়ে হামাসকে সাহায্য করেছে। ইরানের বিপ্লবের পরের মাত্র ৩৪ বছরের দৃশ্য এটি।

সিরিয়ায় কী ঘটতে যাচ্ছে ?
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওয়ার গেইম MC02 তে হেরে গিয়ে (সামনে বিস্তারিত বলছি) আমেরিকা সর্বশেষ উপায়ে এখন চেষ্টা করতে যাচ্ছে : সিরিয়ার সরকার পতন। সিরিয়ায় আসাদকে সরাতে পারলেই ইরানের প্রতিরক্ষা বেল্ট ভেঙে যাবে। যদিও ইরান যেকোনো মূল্যে আসাদের পতন ঠেকানোর চেষ্টা করবে, এটা তারা জানে। সেইসাথে নিজ অস্তিত্বের স্বার্থে হিজবুল্লাহরও প্রয়োজন আমেরিকা-বিহীন সিরিয়া। সুতরাং, তারাও সর্বোতভাবে যুদ্ধ করবে। একারণেই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার প্ল্যান ছিলো তিন দিনের আক্রমণ, আসাদ সরকারকে একটা মেসেজ দেয়ার জন্য, কিংবা তার ভিত্তি কতটুকু শক্ত, তা আরেকটু পরীক্ষা করার জন্য। ইসরাইল এজন্যে ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম মোতায়েন করেছে, সেইসাথে অল্প পরিমাণে আক্রান্ত হলে যা যা করতে হবে, সেই ব্যবস্থাও নিয়েছে (প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন)। সম্ভবত তারা পুরোপুরি দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে নামবে না, কারণ সেজন্যে দরকার ইরানের হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ। এখন আমেরিকা যদি হরমুজ প্রণালীকে উপেক্ষা করে কেবলমাত্র ভূমধ্যসাগর দিয়েই যুদ্ধ পরিচালনা করার চিন্তা করে, তবে তারা ভুল করবে, কারণ এই যুদ্ধে প্রথমেই ইসরাইল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর সেইসাথে আরব বিশ্বের মুনাফিক শাসকদের থেকেও যে সরাসরি সামরিক সহায়তা পাবে, সেই নিশ্চয়তা নেই, কারণ সেই দিকেও ইরান তার সমরাস্ত্র প্রস্তুত রেখেছে।
তবে তারা সিরিয়ায় পূর্ণাঙ্গ হামলাও করতে পারে। কারণ নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আগুন ধরে যাবে এবং চলমান তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রকাশ্য রূপ লাভ করবে।

Strait of Hormuz (হরমুজ প্রণালী) : যেকারণে এতদিনেও ইরানে হামলা হয়নি।
বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন্স দ্বীপে আমেরিকা কেনো সৈন্য বসাতে চেয়েছিলো, বলতে পারেন ? যুদ্ধ নিয়ে আগে ভেবে না দেখলে এখন চিন্তা করে দেখতে পারেন যে, কেনো আমেরিকা বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে সামরিক ঘাঁটি করে লক্ষাধিক সৈন্য বসিয়ে রেখেছে। যেকোনো যুদ্ধে সমুদ্রের গুরুত্ব অনেক, যা এখানে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই (এইজ অব এমপায়ার গেইমটা খেললে হয়তো একটু ধারণা হবে !)। এবার সেন্টমার্টিন্স দ্বীপে আমেরিকান ঘাঁটি কল্পনা করুন নিচের ম্যাপে। তারপর আমরা হরমুজ প্রণালীতে যাই।
সেন্টমার্টিন্স দ্বীপ : মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্য লোভনীয় স্থান
Strait of Hormuz :

ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের সবচে' কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অয়েল ট্রানজিট।
প্রথম ম্যাপটিতে হরমুজ প্রণালী চিহ্ণিত করেছিলাম, এই চিত্রে বিস্তারিত দেখুন।

US Navy এর শক্তিমত্তা সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। গোটা বিশ্বের আর সব দেশের সামরিক বাজেটের যোগফলের চেয়ে বেশি সামরিক বাজেট কেবল আমেরিকার একারই, একটা কারণ তো থাকতে হবে ! কিন্তু ইরানকে আক্রমণের জন্য বিমানবাহী, মিসাইলবাহীসহ সবধরনের আমেরিকান যুদ্ধজাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরে (Persian Gulf) প্রবেশ করতে হবে। আর সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর আগে এখানেই ইরানের প্রধান নিরাপত্তা। মাত্র ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই পথটুকুতে ইরান সার্বক্ষণিক যুদ্ধপ্রস্তুতিতে থাকে। এবং উত্তরোত্তর এই অঞ্চলে সামরিক কৌশল ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে চলেছে।
পারস্য উপসাগরে অবস্থান না নিয়ে ইরানকে সম্মুখ সমরে কুপোকাত করা প্রায় অসম্ভব, আর সেজন্যে হরমুজ প্রণালী পার হতে হবে।

আমেরিকা ইরানে হামলা চালাতে পারছে না মূলত দুটি কারণে :
১. হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট ২০% তেল যাতায়াত করে। যা কিনা সমুদ্রের মাধ্যমে যাতায়াত করা মোট তেলের ৩৫%। প্রতিদিন ১৭ মিলিয়ন (১ কোটি ৭০ লাখ) ব্যারেল তেল (crude oil and petroleum products) এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেলবেচা উপার্জন এবং আমেরিকাসহ পূর্বের অনেক দেশের বহু কারখানার চাকা বন্ধ হয়ে যাবে যদি এই হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দেয়। (জাতিসঙ্ঘে বর্ণিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র অধিকার অনুসারে ইরান এই প্রণালীতে অন্যদের অ্যাক্সেস দিতে বাধ্য নয়।)
২. হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ নিয়ে অবস্থান করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এমনকি সবচে' বড় ওয়ার গেইম MC02-ও এতে ফেইল করেছে। আর এখানে ইরান তাদের কৌশল ও শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলেছে। হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের ট্যাকটিকস বিশাল আলোচনার বিষয়, তাই বিস্তারিত লিখলাম না।

(আপডেট : ব্লগ লিখতে লিখতে এইমাত্র নিউজ ওপেন করে দেখলাম যে "সিরিয়ায় একতরফা হামলার পরিকল্পনা বাতিল করলো আমেরিকা"। যেটা একটু আগেই আমি লিখেছি : "সম্ভবত তারা পুরোপুরি দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে নামবে না, কারণ সেজন্যে দরকার ইরানের হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ।")

হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমাতে আমেরিকার দালাল আরব দেশগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সমস্যা হলো, বেশিরভাগ তেলকূপ পারস্য উপসাগরকে ঘিরে, আর তাই তেল উত্তোলন করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ছাড়লেই সবচে' কম খরচে কাজ সারা যায়। হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমাতে হলে স্থলপথে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করতে হবে, যা একইসাথে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ; এতে তেলের দামও বেড়ে যাবে। তবুও তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে, এবং এক্ষেত্রে বাধ সেধেছে সিরিয়া। পাইপালাইনের মাধ্যমে কোনোভাবে তেলকে ভূমধ্যসাগরে নিয়ে ফেললে হয়, ওখান থেকে বিনা বাধায় প্রয়োজনে ব্রিটিশ এসকোর্টে তেল পরিবহন হবে (ম্যাপে দেখুন ওখানে সাইপ্রাস আছে, যেখানে ব্রিটিশ ঘাঁটি)। লেখা বড় না করে নিচে একটা ম্যাপ দিলাম। জুম করে দেখুন।
মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন


MC02 কী ?
[এডিট : কোনো কোনো পাঠক এভাবে ভুল বুঝতে পারেন যে সামরিক মহড়া হয়েছে ইরান ও আমেরিকার মাঝে। লেখা সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে অধিক ক্ল্যারিটি আনতে পারিনি। (এই সামরিক মহড়ায় ইরানের অংশগ্রহণের তো প্রশ্নই আসে না --) এটি ছিল একটি অভ্যন্তরীন সামরিক মহড়া, যাতে নিজেদেরই একটি দল শত্রুর ভূমিকা নিয়ে অংশগ্রহণ করে।]
Millennium Challenge 2002 বা সংক্ষেপে MC02 হলো আমেরিকার (এবং গোটা বিশ্বের) সামরিক মহড়ার ইতিহাসে সবচে' বড় সামরিক মহড়া (war game)। ইরানের স্ট্রেইট অব হরমুজে তারা যুদ্ধ করে টিকতে পারবে কিনা, এটা ছিল তারই মহড়া। ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে Red এবং Blue - এই দুটি দলের যুদ্ধের মহড়া করেছিলো, যাতে ইরান (codename : Red) জয়ী হয়। এজাতীয় সামরিক মহড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এক একটা দেশের সামরিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা হয়ে এসবের ফলাফল দিয়ে। এখানে হেরে যাবার পর তারা বুঝেছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ঢুকে ইরানের সাথে যুদ্ধ করা যাবে না। এই উপলব্ধি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্ট্র্যাটেজি ও কর্মকাণ্ডকে পরিবর্তিত করেছে। একারণেই আফগানিস্তান ও ইরাকের পরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতে তারা ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। স্মরণ করুন আহমাদিনেজাদের দ্বিতীয় টার্মের ইলেকশানে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, যার পিছনে আমেরিকা ৪০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলো। প্রসঙ্গত, লিবিয়া ও মিশর পরিস্থিতিও এই আলোকে বিবেচনা করা উচিত, যা অনুধাবন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। USA-backed আর্মিকে সাথে নিয়ে একটি "স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র" হতে পারে না, হোসনি মোবারকের চরদের সাথে নিয়ে "কুরআন-ভিত্তিক সংবিধানের" দেশ পরিচালনা করা যেতে পারে না।

মনে রাখবেন, যেই মাটি ও পানির উপরে আমরা বাস করি, সেই ভূমি ও সাগর-মহাসাগর-নদীর রাজনীতি না বুঝে আর যা-ই হোক, অন্তত যুদ্ধের রাজনীতি বোঝা যায় না। (তেমনিভাবে শিয়া-সুন্নি, হানাফি-মালেকি, সালাফি-ওহাবি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করার আগে এই প্রশ্নটার উত্তর শক্তভাবে জানতে হয় : Does God exist ?)

সংক্ষিপ্ত রাখতে চাইলেও লেখা অনেক বড় হয়ে গেলো। আসলে এবিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা যথেষ্ট হয় না। যাদের কাছে অস্পষ্ট ছিলো, আশা করি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির চিত্র কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন। পুরো আলোচনার একটা জায়গায় অধিকাংশ ইসলামপন্থীর অনাস্থা আছে, সেটা হলো ইরান। আর গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এই ইসলামি ইরানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ইরানের বিপ্লবের ইতিহাস যারা জানেন, তারা অন্তত ইরানের নিয়ত নিয়ে বোকার মত কথা বলবেন না। এনিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা থাকলো।
শিয়া অধ্যুষিত এলাকা বলে ইরানকে প্রকাশ্যে কাফির বলতে না পারলেও মুনাফিক আখ্যা দিয়ে থাকেন অনেকে। এবং "শিয়ারা অমুসলিম" কিংবা "বাতিল ফেরকা" ইত্যাদি ভিত্তিহীন ধারণার কারণে তখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ব্যাখ্যা দিতে কল্পনার রাজ্যে প্রবেশ করেন, হালকা সব সুইপিং স্টেটমেন্ট দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন।
যারা ইরানকে অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের সাথে এক কাতারে ফেলতে চান, কিংবা তাদেরকে মুনাফিক ডিক্লেয়ার করেন কিংবা একথা বলেন যে ইরান আসাদের সাথে মিলে সিরিয়ার জনগণের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে, তাদেরকে কেবল কুরআনের ভাষায় প্রশ্ন করবো : Produce your proof ! প্রমাণ উপস্থাপন করুন !

মূল লেখা এখানেই শেষ।

কয়েকটা প্রাথমিক প্রশ্ন :
১. "আসাদ লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করেছে।"
এবার বলুনতো, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে কতজন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে ? ত্রিশ লাখ, ১০ লাখ, ৫ লাখ, ২ লাখ নাকি শর্মিলা বোসের ৫০ হাজার ? নাকি আপনার পরিচিত দুই-চারজন ?
কুরআনে বিশ্বাসী হিসেবে কি আপনিও এই সুইপিং স্টেটমেন্ট দেবেন যে আসাদ লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করেছে? তথ্য-প্রমাণ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতগুলো স্মরণ করুন।
২. Apart from religious explanations, আসাদ কি জানতো না যে কেমিকাল ওয়েপন ব্যবহার করলে এই ছুতায় আমেরিকা হামলা চালাবে ? তবুও কেনো (যদি করে থাকে) সে ব্যবহার করলো ? (এখন আবার বলবেন না যে আন-নূসরার ভয়ে আমেরিকা বিরত হয়েছি কিংবা আসাদ আগে থেকেই জানতো যে আমেরিকা হামলা করবে না, তাই সে ব্যবহার করেছে।)
৩. যারা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে, তারা কী করে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের থেকে সাহায্য গ্রহণ করে ? What is the answer to this fundamental question : Can you take help from anti-Islamic forces in the cause of Islam ?

কমেন্ট করার আগে লক্ষ্য করুন :
Audience : সন্দেহ নেই, আমি এটা লিখছি দু'ধরণের মানুষের উদ্দেশ্যে :
১. সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যাদের কাছে অস্পষ্ট
২. সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যারা একটি অব্স্থান নিয়েছেন, কিন্তু তাদের সাথে আমার মত মিলছে না।

Setting the ground : কমন ও স্বীকৃত বিষয়গুলোকে আমি প্রশ্ন করবো না, আশা করি পাঠকও (অযথা) করবেন না।
সর্বজনীন গ্রাউন্ড থেকে যুক্তি দেবেন। এভাবে বলবেন না যে : "শিয়ারা তো কাফির, সুতরাং ইরান হলো আমেরিকার বন্ধু।" কারণ, "শিয়ারা কাফির" - এটা সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত নয়। বিরোধিতা করে যেকোনো যুক্তি-প্রমাণ-ই সর্বজনীন গ্রাউন্ড থেকে উপস্থাপন করবেন।
যুক্তিকে নিতান্তই নিজস্ব যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করবেন। জাকির নায়েক বলেছেন কিংবা ওমুক শাইখ বলেছেন কিংবা ওমুক বইয়ে আছে -- এভাবে রিডাইরেক্ট করবেন না।

অর্থাৎ, আশা করি আলোচনায় ফ্যালাসি এড়িয়ে চলবেন সবাই।

নূরে আলম
অগাস্ট ২৯, ২০১৩।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?