সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাংলাদেশ এবং ভালোবাসা

এখনকার দিনে কি কেউ আর ছবির অ্যালবাম দেখে ? এমনকি পিসিতেও স্টোর করে বলে মনে হয় না। সব অ্যালবাম তো এখন "ফেসবুক অ্যালবাম" !
বাসায় কতগুলো অ্যালবাম আছে। সবচে' পুরনো অ্যালবামটা হলো ইরানি অ্যালবাম। কী আশ্চর্য ! আব্বু-আম্মু সেখানে আট বছর ছিলো, আমাদের ছ'জনের মাঝে চার ভাই বোনেরই জন্ম হলো সেখানটায়, কিন্তু ছবি মোটে শ' খানেক হবে কিনা সন্দেহ ! অথচ সেখানকার কত প্রভাব আমাদের উপর -- আমরা "সালাম" বলি, "আসসালামু আলাইকুম" বলি না, এবং আরো অনেক কিছু। এই নিয়ে কতবার নানাজীর কাছে শুনতে হয়েছে -- "তোমাদের ইরানি কায়দা...।"

বাংলাদেশ যখন কঠিন সময় পার করে, তখন উদ্বিগ্ন হই, কাগজে-কলমে, পত্রিকায় কিংবা কিবোর্ডে চিন্তার ঝড় তুলে ফেলি। আবার যখন আমেরিকার মুখের উপর কঠোর জবাব দিয়ে ইরান প্রযুক্তিতে এগিয়ে যায়, তখন ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা অনুভব করি। ইউটিউবে হঠাৎ-ই ইরানি ঘুমপাড়ানি গান আবিষ্কার করে থ্রিলড হই। সেজাপু-মেজাপুকে ডেকে শুনাই। কিংবা সেজাপু যখন ইরানি মুভি ডাউনলোড করে -- Song of Sparrows -- তখন মুভি না দেখা আমিও মুভি দেখতে বসি।

কিন্তু সেই ইরানের শ' খানেক ছবিও নেই। সেখানের গল্পগুলো ছবিতে নেই। লেখাতেও নেই। সেগুলো আছে এখানে -- হার্ট, না ব্রেনে ? কোনো একটা হবে।

সে যাক। টেকনোলজিতে ডুবে থাকা আমাদের ভবিষ্যত সন্তানেরা কেমন হবে ? কী করবে তারা ? তাদের আবেগ অনুভুতিগুলো কেমন হবে ?
আমার বাচ্চা হিসেবে নিশ্চয়ই দুনিয়ার অসংখ্য টেক গেজেটের মাঝে দিন যাপন করবে তারা। কিন্তু তারা যখন ব্লগ লিখবে, তখন কি এমন কিছু লিখতে পারবে ? যেভাবে আমি লিখছি ? তাদেরকে কি এমন কোনো লেখার উপাদান দিতে পারবো আমি ?

কে জানে ! বাংলাদেশে আসার পিছনে অনেকগুলো যুক্তির মাঝে আব্বুর একটা যুক্তি ছিলো -- "বাচ্চারা বাংলা শিখছে না, বাংলায় কথা বললে ফার্সিতে উত্তর দেয়।"
হা হা হা... ওখানে থেকে গেলে হয়তো বাংলা বুঝতাম, বলতেও পারতাম। কিন্তু অনুভব করতে পারতাম কি ?
এখন তো আমরা বাংলা শিখে গেছি। এখন তো আমরা বাংলার প্রেমে পড়ে গিয়েছি। তাই এখন যদি চিন্তা করি যে বাংলা ভাষার এই ঐশ্বর্যের সন্ধানই হয়তো পেতাম না সেখানে থাকলে, তখন একটু ব্যথা লাগে !
সেখানে থাকলে হয়তো রবীন্দ্রনাথ পড়া হতো না, নজরুলের গান এসে হৃদয়কে ছিন্ন করে দিয়ে যেতো না, জীবনানন্দ পড়ে বিষণ্ণ হওয়া হতো না, শরতের সর্বংসহা নারীর কথা জানা হতো না, জানা হতো না আরো অনেক কিছু...।
এই যে এত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, টিচার, পরিচিতজন -- এত অম্ল-মধুর সব সম্পর্ক -- এই মানুষগুলোকে তো পেতাম না !

কিন্তু তখন তো আর এর স্বাদই জানতাম না, তাই আফসোসও হতো না !
এখন বড় হয়েছি, বুড়ো হয়েছি -- এখন এই বাংলা ছাড়ার দুঃখ আছে। এই বাংলার অনেক ভুল, অনেক যন্ত্রণা, অনেক ঘৃণা -- তবুও এযে বাংলা ! আমার অনুভুতিগুলো যে সব বাংলা হয়ে গিয়েছে ! আমার চিন্তা যে এই বাংলাকে ঘিরেই হয়েছে ! এখন সহসাই বাংলা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ভিনদেশে যদি যাই-ও কখনো, তবে বড়জোর কেবল শরীরটাকে পাঠাতে পারবো, এর বেশি না। আর সব পড়ে থাকবে এখানে।
কে জানে, আব্বু-আম্মুর কেমন লাগতো ঐ ভিনদেশে থাকতে !

আমি এই বাংলাদেশে নিতান্তই আগাছার মত থেকেছি। জন্মের এক বছর পর ইরান থেকে বাংলাদেশে চলে আসা। তারপর এই বিশটা বছর এই ঢাকা। এখনও এখানেই। একে তো শেকড়হীন থাকা-ই বলে, তাই না ? ভুঁইফোড়, নাকি আগাছা ? সে যা-ই হোক না কেনো, শেকড় ছাড়া।
না না, উদ্বাস্তু না, আমারও গ্রামের বাড়ি আছে। দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি -- সবই আছে। কিন্তু সেসব জায়গায় যাওয়া হয় না। তেমন হয়ও নাই। আমি তো এই বাংলার কিছুই দেখি নাই, কিছুই শুনি নাই, কিছু খাই-ও নাই -- তবুও কিভাবে এর প্রেমে পড়ে গেলাম ?
ভার্সিটিতে ফাঁকা কম্পিউটার ল্যাবে বসে যখন বন্ধুদের মুখে শুনি -- পুকুরে ডুবে আছি। পানির উপরে কিছুটা মাথা উঠিয়ে রেখেছি। চোখটা পানির লেভেলে। আর সেই পানিতে বৃষ্টি পড়ছে... অসাম (awesome) !
তখন আমি ভাবি -- তাই তো, আমি তো কিছুই দেখি নি ! আমি তো কিছু শুনিও নি ! কে জানে বৃষ্টির সময় পুকুরে ডুবে থেকে বৃষ্টির শব্দ শুনতে কেমন লাগে ? কাদা মাটি, কাশফুল, মাটির চুলায় আগুন, টিনের চাল, ফসলের ক্ষেত কিংবা -- কিংবা আমার কল্পনার বাইরে যেগুলো -- সেগুলো কেমন, কে জানে !

এসব কিছুই আমার নেই, তা-ও কিভাবে এর প্রেমে পড়লাম ? তাও কিভাবে বাংলাকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে ডায়রিতে কিংবা ড্রয়িংরুমে কথার ঝড় তুলে ফেললাম বছরের পর বছর ?

*          *          *          *          *

মানুষের ছবি বয়সকে থামিয়ে রাখে। যখন পুরনো একটা ছবি দেখি, তখন মনেই হয় না যে এই মানুষটার জীবনে আরো অনেকগুলো বছর পার হয়েছে ! মানুষের ছবির মাঝে সবচে' সিগনিফিক্যান্ট হলো তার চোখ। মন সারাক্ষণ কথা বলে কিনা কে জানে, তবে চোখ বলে। আর এক একটা মুহুর্তের ছবি, ঐসময়ের কথাগুলো সংরক্ষণ করে রাখে। চোখ পড়তে জানলে সেই গল্পগুলো তখন জানা হয়ে যায়। হয়তো পুরনো গল্প, কিন্তু আবার শুনতে ভালো লাগে। কাগজের গল্প বারবার পড়তে ভালো লাগে না, ভালো লাগে না একই গল্প বারবার শুনতেও, কিন্তু মানুষের চোখ যে গল্পগুলো বলে, সেগুলো জানতে ভালো লাগে। এতে ক্লান্তি আসে না। সেই গল্পগুলো পুরনো হয় না।

যাকগে, কী বলতে কী বলছি। বলছিলাম যে বাংলাদেশটা তো সবার জন্যই। যার রাস্তা কেবল স্কুল থেকে বাসা, বাসা থেকে কলেজ, আর বাসা থেকে ইউনিভার্সিটি, তার জন্যেও বাংলাদেশ। যার বৃষ্টির শব্দগুলো কেবল রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায়, তার জন্যেও বাংলাদেশ। যে আরেক দেশে জন্ম নিয়ে, নিজ গ্রামকে অচেনা রেখে, দুই দেশকে ভালোবেসে শহুরে আগাছা হয়ে ওঠে, তার জন্যেও এই বাংলাদেশ ! এই দেশটা তো আর শুধু সেইসব ধনীদের জন্য নয়, যারা পুকুরের নিচে থেকে বৃষ্টির শব্দ শুনেছে, মাটির চুলায় আগুন ধরিয়েছে আর শীতকালে ভোর হলে খেজুরের রস পেড়ে তাতে পায়েস রেঁধেছে। এই দেশ আমার মত নিতান্তই গরিবদের জন্যও। আজ সেই অধিকারটা এখানে রেখে গেলাম।




নূরে আলম
নভেম্বর ৪, ২০১২।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা আমি এক সপ্তাহ আগে অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম
যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। আগে যেই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেওয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডি…

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস

রুহুল্লাহর গল্প
বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ইরান

(মিশরের আলোচনা একটু থিতিয়ে পড়তেই সিরিয়ায় উত্তেজনা শুরু হলো। আমি হয়তো লিখতাম না, কিন্তু সিরিয়া ইস্যুতে লেখাটা এখন কর্তব্য হয়ে পড়েছে। এই কারণে নয় যে সিরিয়া-কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিক্সের স্বচ্ছ ধারণা এদেশীয় মুসলমানদের নেই, বরং লেখা কর্তব্য এই কারণে যে ছোট-বড় ইসলামপন্থীদের চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কার্যত বিভক্তি উস্কে দিচ্ছে।)
সম্প্রতি সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু (অনলাইনে এসব ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে)। আমেরিকা ও তার বন্ধুরা তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে দায়ী করেছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে খুব শীঘ্রই তারা (সম্ভবত) হামলা চালাতে যাচ্ছে।

সিরিয়ায় বিদেশী মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে ২১ অগাস্ট রাজধানী দামাস্কাসের অদূরে সিরীয় সেনাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয় বিদ্রোহী গ্রুপের। যুদ্ধের কথা জানানোর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীরা ফেইসবুক পেইজে দাবী করে যে সিরীয় সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এরপরের ঘটনা সবার জানা।

২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীরা সিরিয়া…